নাটোরের সিংগাইর উপজেলার বাস্তা গ্রামের মেয়ে আঁখি আক্তার (১৮)। বয়স সবে আঠারো পেরোতেই একই উপজেলার ভূমদক্ষিণ গ্রামের মান্নান বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। কিন্তু এই নতুন জীবন সুখের বদলে নেমে আসে চরম ট্র্যাজেডি। বিয়ের পর থেকেই স্বামী ও তাঁর পরিবার আঁখির পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে আসছিল। দরিদ্র পরিবারের পক্ষে এই টাকা দেওয়া অসম্ভব হওয়ায় প্রায়ই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া লেগে থাকত। যৌতুকের এই দাবির কেন্দ্র করেই একদিন আঁখিকে শারীরিক নির্যাতন করেন তাঁর স্বামী।
মেয়ে নির্যাতনের খবর পেয়ে আঁখিকে দেখতে আসেন তাঁর মা। কিন্তু সেখানে তাঁকে ও আঁখিকে নানাভাবে অপমান করেন শাশুড়ি ও দেবরসহ স্বামীর পরিবারের লোকজন। মায়ের অপমান সহ্য করতে না পেরে এবং যৌতুকের কারণে অমানবিক অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ওই দিন রাতেই বাথরুমে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন আঁখি। এভাবেই বিয়ের মাত্র তিন বছরের মাথায় যৌতুকের বলি হতে হলো তরুণী আঁখিকে।
একজন গৃহবধূর ওপর এমন নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে আমরা সাধারণত এককভাবে স্বামী কিংবা শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে দায়ী করি। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের অপরাধ বা দায়ই সবচেয়ে বেশি। কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিয়ের আগে থেকে শুরু করে পরবর্তী সময় পর্যন্ত দুই পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি, সিদ্ধান্ত এবং মনস্তাত্ত্বিক আচরণও এ ধরনের সামাজিক সমস্যাকে ত্বরান্বিত করে। তাই এ বিষয়ে কেবল আবেগপ্রবণ না হয়ে আত্মসমালোচনা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি।
সাধারণত মেয়ে বিয়ে দেওয়ার সময় পাত্রপক্ষের আর্থিক সচ্ছলতার ওপর অতিরিক্ত জোর দেওয়া হয়। পাত্রের চাকরি আছে কি না, মাসিক বেতন কত, নিজস্ব বাড়ি বা গাড়ি আছে কি না কিংবা পারিবারিক আর্থিক অবস্থান কেমন—এসব বিষয়কে সবার ওপরে স্থান দেওয়া হয়। প্রত্যেক অভিভাবকই চান তাঁদের মেয়ে নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে থাকুক। তবে এত হিসাব-নিকাশের ভিড়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়, তা হলো ছেলেটির চরিত্র, আচরণ ও মানসিকতা। সে নারীদের সম্মান করতে জানে কি না, রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে কি না কিংবা স্ত্রীর মতামতকে মূল্য দেয় কি না—তা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
বড় বাড়ি, দামি গাড়ি বা ভালো চাকরি মানুষকে আর্থিকভাবে সচ্ছল করতে পারে, কিন্তু ভালো মানুষ হওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। অনেক সময় উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত যুবকের ব্যক্তিগত আচরণে দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার অভাব দেখা যায়। বিপরীতে, সচ্ছলতা কম থাকলেও একজন মানুষ সৎ, পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল হতে পারেন, যিনি স্ত্রীকে যথাযথ সম্মান দিয়ে জীবন কাটাতে পারেন। কিন্তু বিয়ের বাজারে যোগ্যতার চেয়ে আর্থিক অবস্থাকে প্রধান মাপকাঠি করায় ভালো মানুষের প্রকৃত গুণাবলি আড়ালে পড়ে যায়।
অন্যদিকে, বিয়েতে উপহার দেওয়া বা নেওয়া নিয়ে সমাজের দ্বৈতনীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। সমাজে স্বর্ণালংকার, আসবাবপত্র, নগদ টাকা বা মোটরসাইকেল দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। উপহার যদি স্বেচ্ছায় ও সামর্থ্য অনুযায়ী হয়, তবে তা দোষের নয়। কিন্তু যখন তা দাবিতে পরিণত হয় এবং দাবি পূরণ না হলে গৃহবধূর ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়, তখন তা অপরাধের শামিল হয়। ধনী পরিবারের উপহারকে ‘ভালোবাসা’ হিসেবে দেখা হলেও দরিদ্র পরিবার একই জিনিস দিতে না পারলে তাদের ছোট করা ও অপমান করা হয়, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বিয়ে ও কাবিন নিয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা দুই পরিবারের ওপর মানসিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। দেনমোহর স্ত্রীর আইনি ও ধর্মীয় অধিকার, যা কোনো লোকদেখানোর বিষয় নয়। বিয়ের আগে দুই পরিবার যদি পারস্পরিক বোঝাপড়া ও বাস্তবতার ভিত্তিতে খোলামেলা আলোচনা করে, তবে বহু ভুল বোঝাবুঝি এড়ানো সম্ভব।
যৌতুক দাবি করা বা নির্যাতন চালানোর দায় কোনোভাবেই নির্যাতিত নারী বা তাঁর পরিবারের ওপর বর্তায় না; এর সম্পূর্ণ দায় নির্যাতনকারীর। তবে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অন্ধভাবে অর্থসম্পদ ও সামাজিক মর্যাদার পেছনে ছোটার মানসিকতা থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। বিয়ে কোনো ব্যবসায়িক লেনদেন নয়। পুত্রবধূ কোনো উপার্জনের মাধ্যম নন, বরং তিনি স্বতন্ত্র মর্যাদার একজন মানুষ। তাই দুই পরিবারকেই সম্পদ বা সামাজিক অবস্থানের মাপকাঠিতে না মেপে, মানুষ হিসেবে একে অপরের সম্মান ও অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে হবে।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;