সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারিতে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে ভাঙার জন্য আনা পুরোনো এলএনজি বাহক জাহাজ ‘এমটি রাসি’র ৩ নম্বর ব্যালাস্ট ট্যাংকের বিষাক্ত গ্যাসে ১০ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে শিল্পসংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘ দিন জমে থাকা স্থির পানির তলানি থেকে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এবং উদ্ধারত্রুটির ভয়াবহ চিত্র উন্মোচন করে এ খাতকে নিরাপদ করতে ৩৫ দফা সুপারিশ পেশ করেছে তদন্ত কমিটি। গত ১৪ আগস্ট সকালে ছিদ্র করে পানি বের করার সময় ৯ জন শ্রমিক ঘটনাস্থলে মারা যান এবং পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হয়। এর পর থেকেই শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড প্রতিষ্ঠানটির সব কার্যক্রম স্থগিত করে।
চট্টগ্রামের হোটেল আগ্রাবাদে শিল্প মন্ত্রণালয় ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ প্রকল্পের সহযোগিতায় আয়োজিত এক নিরাপত্তা সচেতনতামূলক কর্মশালায় এই দুর্ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেন তদন্ত দলের সদস্য ও বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইয়াসির আরাফাত খান। তিনি জানান, ১৭ ও ১৮ আগস্ট বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন, শ্রমিক-উদ্ধারকারীদের সাক্ষ্য গ্রহণ এবং পানি-তলানির নমুনা পরীক্ষা করে। দীর্ঘদিনের স্থির পানিতে অক্সিজেন কমে সালফাইড তৈরি হয়েছিল, যা পানি নিষ্কাশন বা প্লেট কাটার সময় বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। কাজ শুরুর আগে নিরাপদ পাওয়ার অর্থ এই নয় যে কাজের মাঝে পরিস্থিতি বদলাবে না।
শনিবার দুপুরে চট্টগ্রামের হোটেল আগ্রাবাদে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের নিরাপত্তা নিয়ে আয়োজিত এক কর্মশালায় এসব কথা বলেন দুর্ঘটনার তদন্তে গঠিত বিশেষজ্ঞ দলের সদস্য ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. ইয়াসির আরাফাত খান।
উদ্ধারপ্রক্রিয়ার চরম ত্রুটি নিয়েও কর্মশালায় কঠোর সমালোচনা করা হয়। প্রথমে দুজন অচেতন হওয়ার পর যথাযথ শ্বাসপ্রশ্বাসের সুরক্ষা ছাড়া উদ্ধারকারীরা ভেতরে প্রবেশ করায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ে। অধ্যাপক ইয়াসির আরাফাত খান জানান, শুধু উদ্ধার সরঞ্জাম নয়, প্রশিক্ষিত জনবল এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ শুরুর আগেই লিখিত উদ্ধার পরিকল্পনা থাকতে হবে। এছাড়া ফায়ার সার্ভিসকে দেরিতে খবর দেওয়ার বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে।
ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় এড়াতে ৩৫ দফা সুপারিশে প্রতি এক থেকে দুই ঘণ্টা পর পর গ্যাস পরীক্ষা ও লিখিত সংরক্ষণ, অক্সিজেনসহ বিষাক্ত-দাহ্য গ্যাস পরীক্ষা, প্রতিটি ব্যালাস্ট ট্যাংকের জন্য পৃথক বায়ু চলাচল পরিকল্পনা, মাসে অন্তত দুইবার জরুরি মহড়া, সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ কাজের লিখিত অনুমতি এবং হাতে-কলমে শ্রমিক প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তায় অবহেলার দায়ে ফেরদৌস স্টিলের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. রাশিদুল ইসলাম অভিজ্ঞতাকে নিরাপত্তাবিধির বিকল্প ভাবার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে দূর থেকে আধুনিক প্রযুক্তিতে নজরদারির পরামর্শ দেন। জাইকার প্রতিনিধি আকিরা ওকামোতো জানান, হংকং কনভেনশন অনুযায়ী সনদ পাওয়া মানেই শতভাগ নিরাপত্তা নয়; অবিরাম ব্যবস্থার উন্নয়ন ও মালিক-ম্যানেজার-শ্রমিকের যৌথ অঙ্গীকার জরুরি। চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন, বিএসবিআরএ সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন এবং বিএসআরবির মহাপরিচালক গাজী মো. আসাদুজ্জামান কবিরসহ সরকারি কর্মকর্তা ও শিল্পপ্রতিনিধিরা এসময় উপস্থিত থেকে নিরাপত্তা সংস্কৃতির রূপরেখা বাস্তবায়নের তাগিদ দেন।
খালেদ । পোস্টকার্ড ;