রাজধানীর উত্তরার একটি বার ও টঙ্গীর বস্তি-সংলগ্ন মাঠের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তরুণ পাইলট বা ক্যাপ্টেন তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্যকর সব তথ্য প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। গত ২৭ অক্টোবর রাতের এই মর্মান্তিক ঘটনার পর নিহতের বন্ধু দীপ এবং তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। প্রেমিকার অন্য যুবকের সঙ্গে সম্পর্কের জেরে সৃষ্ট মানসিক অবসাদ এবং পরবর্তী সময়ে মাত্রাতিরিক্ত মাদক সেবনের পরই এই দুর্ঘটনা ঘটে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
মামলার বিবরণ ও দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৮ মিনিটে তাহসিফ, জারিকা তাসনিম দিশা ও দীপ উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের নেস্ট বারে যান। এর কিছুদিন আগে দিশা অন্য এক যুবকের বাসায় ইয়াবা সেবন এবং তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন বলে জানতে পারেন তাহসিফ। এই বিষয়টি নিয়ে তাহসিফের মনে তীব্র ক্ষোভ ও মন খারাপ ছিল। মূলত এই ক্ষোভ ও হতাশা থেকেই সেদিন দিশাকে সঙ্গে নিয়ে বারে যান তিনি।
বারে গিয়ে তাহসিফ কর্তৃপক্ষকে সাউন্ড সিস্টেমে বিষণ্ন বা দুঃখের গান বাজানোর অনুরোধ জানান। সেখানে তারা তিনজনই মদ্যপান করেন এবং রাত ১২টা পর্যন্ত পান করার সময় দিশার পূর্বের সম্পর্ক নিয়ে তাহসিফের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হয়। উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের একপর্যায়ে দিশাকে উদ্দেশ করে তাহসিফ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “তুমি তো ইয়াবা খেয়েছ, আমি এর চেয়েও বড় কিছু খাব। আমি হিরোইন খাব।”
রাত ১২টার দিকে বার থেকে বের হয়ে তাহসিফ নিজের মোটরসাইকেলে দিশাকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসায় পৌঁছে দেন। এ সময় দীপও নিজের আলাদা মোটরসাইকেলে তাদের সঙ্গে ছিলেন। এরপর দুজন মিলে টঙ্গী বাজার বস্তি-সংলগ্ন একটি খোলা মাঠের উদ্দেশে রওনা হন। জিজ্ঞাসাবাদে দীপ জানান যে, ওই মাঠে যাওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে তাহসিফ নিজেই নিয়েছিলেন।
দীপের দাবি অনুযায়ী, মাঠের পাশে বস্তির কাছে মোটরসাইকেল রেখে তারা হেঁটে মাঠের ভেতরে প্রবেশ করেন। ওই সময় সেখানে স্থানীয় মাদকসেবী ও কারবারিসহ বেশ কিছু মানুষের জটলা ছিল। মাঠে পৌঁছানোর পর তাহসিফ অত্যন্ত উচ্চস্বরে হিরোইন চাচ্ছেন বলে চিৎকার করেন এবং যত টাকাই লাগুক না কেন তা দেবেন বলে জানান। পরবর্তীতে সেখানে উপস্থিত কয়েকজন মাদক কারবারির কাছ থেকে হিরোইন কিনে সেবন করেন তিনি। বারে অতিরিক্ত মদ্যপানের পর হিরোইন সেবন করায় তাহসিফ নিজের শরীরের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন বলে দাবি করেন দীপ।
দীপ আরও জানান, তাহসিফ যখন মাদক সেবন করছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে পুলিশের একটি টহল দল উপস্থিত হয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে চারপাশের স্থানীয় মাদক কারবারিরা দ্রুত পালিয়ে যান। এ সময় ভয়ে দীপও দৌড়ে নদীর পাড়ের দিকে চলে যান এবং নদীর ২৯ নম্বর পিলারের পেছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়েন। যার ফলে ঘটনাস্থলেই তাহসিফের কাছ থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন হয়ে যান।
ঘটনার বর্ণনায় দীপ জানান, লুকিয়ে থাকার দুই থেকে তিন মিনিট পর পুলিশের দুই সদস্য তাকে ঘিরে ধরেন। পুলিশ সদস্যরা তার নাম, পরিচয় ও ঠিকানা জানতে চাইলে তিনি নিজেকে ক্যাপ্টেন তাহসিফের বন্ধু বলে পরিচয় দেন। তার বাসা মোহাম্মদপুরে শুনে পুলিশ সদস্যরা এত রাতে সেখানে আসার কারণ জানতে চান। জবাবে দীপ জানান যে, তারা একটি কাজে সেখানে এসেছেন। পুলিশ সদস্যরা তাকে দ্রুত বাসায় চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেও তিনি ভয়ে বস্তির সরু রাস্তা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েন।
বস্তির ভেতরে গিয়ে রাস্তা চিনতে না পেরে দীপ এক স্থানীয় মাদকসেবীর সহযোগিতায় মূল সড়কে ফিরে আসেন। এরপর নিজের মোটরসাইকেলে এসে তাহসিফকে একাধিকবার ফোন করেন, কিন্তু প্রতিবারই তার ফোন বন্ধ পান। তাহসিফ যেহেতু মাদক সেবন করতে এসেছিলেন, তাই মাদক শেষ না করে সহজে যাবেন না বলেই তিনি ভেবেছিলেন। এ ছাড়া তাহসিফ তার কাছ থেকে ফোন চার্জ দেওয়ার জন্য একটি পাওয়ার ব্যাংকও নিয়েছিলেন, তাই ফোনের চার্জ শেষ হয়ে ফোনটি বন্ধ হয়ে গেছে বলেও ধরে নেন দীপ। এরপর তিনি নিজেই মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়েন। তবে তাহসিফকে পানিতে পড়ে যেতে তিনি নিজের চোখে দেখেননি বলে দাবি করেন।
এদিকে তদন্তসংশ্লিষ্ট এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটনে বন্ধু দীপকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরিদর্শন করা হয়েছে এবং তার দেওয়া প্রতিটি বক্তব্য যাচাই করে দেখা হয়েছে। উদ্ধারকৃত তাহসিফের মরদেহে বাহ্যিক কোনো আঘাতের বা মারধরের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি তারা যে বারে গিয়েছিলেন সেখানকার বিভিন্ন বিষয়ও তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখেছেন। নিহতের মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড ও পারিপার্শ্বিক সমস্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে পুলিশ প্রাথমিকভাবে মনে করছে এটি কোনো পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড নয়, বরং একটি অনভিপ্রেত দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালানোর সময় অতিরিক্ত মাদকাসক্ত অবস্থায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাহসিফ পাশের পানিতে পড়ে ডুবে মারা যেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। News time
খালেদ / পোস্টকার্ড ;