সরকারি পোর্টালের হুবহু ক্লোন ডোমেইন খুলে ডিজিটাল ওয়ারিশ সনদ ও প্রশাসনিক সিল-স্বাক্ষর জাল করার এক অভিনব প্রতারণার জাল ধরা পড়েছে সীতাকুণ্ডে। সরকারি ছুটির দিনে ইস্যুকৃত ওই ভুয়া সনদের ভিত্তিতে ভূমি কার্যালয়ের অসাধু যোগসাজশে শিবপুর মৌজার আড়াই কোটি টাকার বেশি মূল্যের ৫৭.৪৫ শতক জমির নামজারি খতিয়ান বানিয়ে নেওয়ার পর প্রকৃত ওয়ারিশকে উচ্ছেদের চেষ্টায় এই জালিয়াতি উন্মোচিত হয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পৌর ও ভূমি প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে।
অগ্নিকাণ্ডের সুযোগ ও সিন্ডিকেটের শেকড়: ১৯৮২ সালে সীতাকুণ্ড সাব-রেজিস্ট্রারি অফিসে অগ্নিকাণ্ডের ফলে ১৯৬২ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২০ বছরের গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড ও দলিল পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এই ঐতিহাসিক ঐতিহাসিক দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক রেকর্ডশূন্যতার সুযোগটিকেই দীর্ঘ চার দশক ধরে কাজে লাগিয়ে আসছে একটি সংঘবদ্ধ ভূমিদস্যু চক্র। অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ম্যানেজ করে পুরোনো দলিলে ঘষামাজা কিংবা গায়েবি দলিল তৈরি করে শত শত কোটি টাকার জমি হাতিয়ে নেওয়ার এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে এখানে। সাম্প্রতিক ক্লোন ওয়েবসাইট কেলেঙ্কারির পেছনেও রয়েছে সেই পুরোনো ও গভীর সিন্ডিকেটের হাত।
ক্লোন ডোমেইন ও ডিজিটাল জালিয়াতির কৌশল: প্রতারক চক্রটি অত্যন্ত সুকৌশলে সীতাকুণ্ড পৌরসভার অনুমোদিত ও সুরক্ষিত ডিজিটাল সনদ পোর্টাল (sitakunda.prottoyon.net) হুবহু নকল করে sitakunda.prottoyon.com-web নামে একটি অননুমোদিত ক্লোন ডোমেইন খোলে। সাধারণ মানুষ বা ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা যাতে প্রথম নজরে পার্থক্য বুঝতে না পারেন, সে জন্য পোর্টালে একদম আসল লে-আউট ও ইন্টারফেস ব্যবহার করা হয়। এই ক্লোন সাইট থেকেই হাছিনা বেগম নামের এক নারী সংঘবদ্ধ কম্পিউটার অপারেটর চক্রের সহায়তায় ১০৪৪৪৬ নম্বরযুক্ত ডিজিটাল ওয়ারিশ সনদ তৈরি করান।
পহেলা বৈশাখের বন্ধে জালিয়াতির নমুনা: তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, জালিয়াতির ওই ওয়ারিশ সনদে তারিখ দেওয়া হয়েছিল ১৪ এপ্রিল (পহেলা বৈশাখ)। ওই দিনটি ছিল সরকারি সাধারণ ছুটি ও সাপ্তাহিক বন্ধের দিন। এ ছাড়া সোনাইছড়ি মৌজায় আমেরিকা প্রবাসী জীবিত মোহাম্মদ জামাল উদ্দিনকে ‘মৃত’ দেখিয়ে এর আগে এমন আরেকটি ভুয়া ওয়ারিশ সনদে নামজারি খতিয়ান করার চেষ্টা করা হয়েছিল, যা পরে ধরা পড়ে খারিজ হয়। তা সত্ত্বেও শিক্ষা না নিয়ে চক্রটি শিবপুর মৌজার ১০টি দাগের ৫৭.৪৫ শতক জমির (বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা এপিপি অ্যাডভোকেট সরোয়ার হোসাইন লাবলু নিশ্চিত করেছেন) নামজারি করতে একই ফাঁদ পাতে।
যাদের সিল-স্বাক্ষর স্ক্যান ও ব্যবহার করা হয়েছে: ১. সীতাকুণ্ডের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম। ২. পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম। ৩. সীতাকুণ্ড মডেল থানার ওসি মো. মহিনুল ইসলাম (যিনি তৎকালীন ওয়ার্ডের প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলেন)। ছুটির দিনে ইস্যুকৃত এই ভুয়া সনদে স্ক্যান করা স্বাক্ষর ও সিল বসিয়ে সেটিকে খাঁটি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
ভূমি অফিসের যোগসাজশ ও নামজারি অনুমোদন: অস্তিত্বহীন এই ডিজিটাল সনদটি আসল হিসেবে দেখিয়ে হাছিনা বেগম উপজেলা ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করতে সক্ষম হন। দীর্ঘ যাচাই-বাছাইয়ের কথা থাকলেও গত ১০ আগস্ট ভূমি কর্মকর্তারা রহস্যজনক কারণে মিউটেশন কেস নম্বর ২২সেন-(IX-I)/২০২৬-২৭ এর আওতায় শিবপুর মৌজার ওই জমির নামজারি অনুমোদন দিয়ে দেন। নামজারি পাওয়ার পরই প্রকৃত ওয়ারিশ হাছিনা বানুর পরিবারকে পৈতৃক ভিটা থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদের চেষ্টা চালানো হলে পুরো বিষয়টি জানাজানি হয়।
উন্মোচন, সার্ভার অডিট ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ: ভুক্তভোগী হাছিনা বানুর পুত্র মো. আলী আজম পৌর প্রশাসক ও ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ দিলে টনক নড়ে প্রশাসনের। পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে সরেজমিন তদন্ত ও ডিজিটাল সার্ভার অডিট করা হয়। অডিটে প্রমাণ মেলে যে উল্লিখিত তারিখে পৌরসভা থেকে এ ধরনের কোনো সনদ ইস্যুই করা হয়নি এবং সরকারি মূল সার্ভারে এটার কোনো ডেটাও নেই। ওসি মো. মহিনুল ইসলাম ও পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেন যে স্বাক্ষরগুলো সম্পূর্ণ জাল।
এরপর পৌরসভা থেকে এক অফিস আদেশে সনদটি অবৈধ ও অস্তিত্বহীন ঘোষণা করে বাতিল করা হয়। ভবিষ্যতে এই সনদের জোরে কেউ যাতে জমি রেজিস্ট্রি বা নামজারি করতে না পারে, সে জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে জরুরি সতর্কতামূলক চিঠি দেওয়া হয়। চক্রের মূল হোতা হাছিনা বেগম ৩ কার্যদিবসের নোটিশ পেয়েও হাজির না হয়ে আত্মগোপন করেছেন।
নিরাপত্তা সংকট ও আইনগত ফাঁকফোকর: পৌর প্রশাসক ও ইউএনও ফখরুল ইসলাম পুলিশকে অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দিলেও সীতাকুণ্ড মডেল থানার ওসি মো. মহিনুল ইসলাম গণমাধ্যমের সামনে অভিযুক্ত কম্পিউটার অপারেটর বা সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যদের সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করার বিষয়টি এড়িয়ে যান। ফলে রাঘববোয়াল ভূমিদস্যুরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও প্রকৃত জমির মালিকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে। ডিজিটাল পোর্টাল সুরক্ষিত না রাখলে এবং ভূমি অফিসের দুর্নীতি না ভাঙলে এ ধরনের জালিয়াতি রোধ করা অসম্ভব বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
খালেদ । পোস্টকার্ড ;