ভোরের আলো ফুটতেই হাতে লাঙল-জোয়াল কিংবা বীজের থালা নিয়ে মাঠে নেমে পড়েন কৃষক। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে মাটিতে বীজ বোনার মধ্য দিয়ে কেবল একটি পরিবারের স্বপ্ন নয়, পুরো জাতির খাদ্যের নিশ্চয়তা রচিত হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এই অসামান্য শ্রম ও ত্যাগ কেবলই জীবনধারনের জীবিকা বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়; বরং এটি মানবসেবা, পরিবেশ রক্ষা এবং অফুরন্ত সওয়াবের এক মহান ইবাদত।
ধর্মীয় গবেষক ও আলেমদের মতে, ইসলাম কৃষিকাজকে সদকা এবং ইবাদতের মর্যাদায় উন্নীত করেছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা সুরা আনআমে ইরশাদ করেন, “তিনিই সেই সত্তা, যিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন। অতঃপর আমি তা দিয়ে সব ধরনের উদ্ভিদ উৎপন্ন করি” (সুরা আনআম : ৯৯)। আয়াতের শিক্ষায় স্পষ্ট, কৃষক মাটিতে শ্রম দেন বটে, তবে তাতে জীবন ও প্রাচুর্য সঞ্চার করেন একমাত্র আল্লাহ।
কৃষিকাজ যে কত বড় সওয়াবের কাজ, তা প্রখ্যাত সাহাবি আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস থেকে জানা যায়। নবীজি (সা.) বলেছেন, “যেকোনো মুসলিম একটি ফলবান গাছ রোপণ করে কিংবা কোনো ফসল ফলায়, অতঃপর তা থেকে মানুষ, পাখি কিংবা কোনো পশু আহার করে, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়” (বুখারি : ২৩২০)। অর্থাৎ, কোনো কৃষক বা বাগান মালিকের উৎপাদিত ফসল যদি অনিচ্ছাসত্ত্বেও কোনো জীবজন্তু বা পাখি খেয়ে ফেলে, তাহলেও তার আমলনামায় সদকার সওয়াব লেখা হতে থাকে। এমনকি রোপণকারীর মৃত্যুর পরও যতদিন সেই বৃক্ষ মানুষকে ফল, পুষ্টি বা ছায়া দিয়ে যাবে, ততদিন এটি ‘সদকায়ে জারিয়া’ বা নিরবচ্ছিন্ন দান হিসেবে তার পরকালের খাতায় যুক্ত হতে থাকবে।
এমনকি কেয়ামতের মতো প্রলয়ঙ্করী মুহূর্তেও আশাবাদী হয়ে নির্মাণের বার্তা দিয়েছে ইসলাম। হাদিসে এসেছে, কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার ক্ষণেও যদি কারও হাতে একটি খেজুরের চারা থাকে এবং তা রোপণ করার সুযোগ থাকে, তবে যেন সে তা রোপণ করে (মুসনাদে আহমদ)।
বাংলাদেশে কৃষকরাই খাদ্যনিরাপত্তার মূল কারিগর। আধুনিক যুগে জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক খাদ্যসংকট ও বেকারত্ব মোকাবেলায় কৃষির গুরুত্ব এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কেবল সনাতনী কৃষকই নন, শিক্ষিত তরুণরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষিতে যুক্ত হলে হালাল উপার্জনের পাশাপাশি তা জাতীয় নিরাপত্তা ও মানবকল্যাণে বিরাট ভূমিকা রাখবে।
যে হাত মাটি প্রস্তুত করে বীজ বুনে বিশ্বকে অন্ন জোগায়, সেই হাত কেবল ফসল ফলায় না—মানবতার সেবা করে আল্লাহর সন্তুষ্টি কুড়ায়। তাই কৃষিকে অবহেলা না করে সম্মানিত পেশা ও সদকার উপায় হিসেবে দেখা এবং অনাবাদী জমি আবাদে মনযোগী হওয়া বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;