আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (IIUC) মেধাবী শিক্ষার্থী মাইশার মর্মান্তিক সড়ক মৃত্যুর পর শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে মহাসড়কে নির্মিত সাময়িক স্পিডব্রেকারটি অবশেষে অপসারণ করেছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। কয়েকদিন আগে শিক্ষার্থীদের ন্যায়সংগত ও নিরাপদ পারাপারের দাবির মুখে সীতাকুণ্ডের কুমিরা এলাকায় মহাসড়কের ওপর দ্রুতগতির যানবাহন নিয়ন্ত্রণের জন্য এই উঁচু স্পিডব্রেকারটি স্থাপন করা হয়েছিল। একই সময়ে দুর্ঘটনাস্থলে প্রশাসন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ট্রাফিক আইন অমান্য করায় একাধিক যানবাহনকে জরিমানাও করে। তবে স্থায়ী পরিকল্পনা ও হাইওয়ে কোড না মেনে অপরিকল্পিতভাবে এটি নির্মিত হওয়ায় চালক ও পথচারীদের জন্য তা নতুন ভোগান্তি ও বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
দেশের অন্যতম ব্যস্ততম ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড অংশে দূরপাল্লার এক্সপ্রেস ও ভারী যানবাহনগুলো প্রতিনিয়ত প্রচণ্ড গতিতে চলাচল করে। উপযুক্ত সতর্কীকরণ সংকেত, পর্যাপ্ত আলো কিংবা রাতে চেনার জন্য প্রতিফলক (রিফ্লেক্টর) ছাড়া আকস্মিকভাবে বসানো এই স্পিডব্রেকারের কারণে দ্রুতগতির নৈশ কোচ, কাভার্ডভ্যান ও প্রাইভেটকারগুলো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রতিনিয়ত ছোট-বড় দুর্ঘটনার মুখে পড়ছিল। পাশাপাশি আকস্মিক গতি হ্রাসের ফলে মহাসড়কে তীব্র কৃত্রিম যানজট তৈরি হচ্ছিল, যা সীতাকুণ্ড ও কুমিরার আশেপাশের অঞ্চলের স্বাভাবিক যাতায়াত ব্যবস্থাকে প্রায় অচল করে ফেলে। সাধারণ পরিবহন চালক, যাত্রী ও সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে স্পিডব্রেকারটির নকশাগত ত্রুটি ও ঝুঁকি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টির পর সওজ ও হাইওয়ে পুলিশ যৌথভাবে এটি অপসারণের কার্যকর সিদ্ধান্ত নেয়।
গত মঙ্গলবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবীর দায়িত্ব পালন করতে যাওয়ার সময় কুমিরা এলাকায় রাস্তা পার হওয়ার উদ্দেশ্যে মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন শিক্ষার্থী মাইশা। ঠিক সেই মুহূর্তে দুটি লরি পাল্লা দিয়ে ছুটে চলার একপর্যায়ে হঠাৎ একটি প্রাইভেটকার গতি কমিয়ে বাঁক নিলে একটি লরি সজোরে ধাক্কা দেয় পাশে থেমে থাকা একটি মিনিবাসকে। বাসটি কাত হয়ে উল্টে গিয়ে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তিন ছাত্রীর ওপর পড়ে, যার নিচে চাপা পড়ে গুরুতর আহত হন মাইশা। দ্রুত উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। মেধাবী এই ছাত্রীর আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো ক্যাম্পাসে শোকের ছায়া নেমে আসে এবং সকল ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। পরে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে প্রথম জানাজা শেষে মাইশার মরদেহ তাঁর গ্রামের বাড়ি মীরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বড়তাকিয়া এলাকায় নেওয়া হয় এবং বাদ এশা দ্বিতীয় জানাজা শেষে মরহুম বাবা সাফায়াত হোসেনের কবরের পাশেই তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
মাইশার ব্যক্তিগত জীবনের ইতিহাস ছিল দীর্ঘ লড়াই ও সংগ্রামের। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি তাঁর বাবাকে হারালেও মায়ের বহু কষ্ট ও লড়াইয়ের ফসল হিসেবে তিনি উচ্চশিক্ষার আলোয় নিজেকে গড়ে তুলছিলেন। গত শুক্রবারই আত্মীয়স্বজনকে দাওয়াত খাইয়ে অত্যন্ত ঘটা করে মেয়ের জন্মদিন পালন করেছিলেন তাঁর মা সালমা আক্তার, অথচ সেই আনন্দের স্মৃতিগুলো আজ কেবলই অন্তহীন কান্নায় পর্যবসিত হয়েছে। মাইশার মুঠোফোনের কভারে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘স্ট্রে বার্ডস’ গ্রন্থের অমর বাণী—‘জীবন হোক গ্রীষ্মের ফুলের মতো সুন্দর, আর মৃত্যু হোক শরতের ঝরা পাতার মতো স্নিগ্ধ’ খোদাই করা ছিল, যা আজ তাঁর সহপাঠীদের হৃদয়ে গভীর বেদনার সৃষ্টি করেছে।
স্পিডব্রেকার অপসারণের উদ্যোগকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও স্থানীয় সচেতন মহল দুর্ঘটনার চিরস্থায়ী সমাধানে একমত পোষণ করেছেন। শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট জানান, মাইশার আত্মত্যাগের পর সড়কে কোনো সাময়িক বা জোড়াতালির ব্যবস্থা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পারাপারের জন্য দ্রুত একটি আধুনিক ও নিরাপদ ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ জরুরি। মহাসড়কের ব্যস্ততম এই স্পটটিকে ঝুঁকিমুক্ত রাখতে অবিলম্বে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ, ট্রাফিক পুলিশিং জোরদার এবং নিরাপদ পারাপারের স্থায়ী অবকাঠামো নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় এলাকাবাসী।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;