ভোরের আলো ফুটবার আগেই নিস্তব্ধতা ভেঙে জেগে ওঠে কর্ণফুলী নদী তীরবর্তী নগরীর ফিরিঙ্গিবাজারসংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী ফিশারিঘাট। গভীর রাত ৩টা থেকেই বঙ্গোপসাগর থেকে ফিশিং বোট ও ট্রলারগুলো ঘাটে নোঙর ফেলতে শুরু করে। ভোররাত থেকেই আবছা অন্ধকার চিরে চারপাশ থেকে ভেসে আসে পাইকার ও আড়তদারদের হাঁকডাক। চট্টগ্রাম বন্দর নগরীসহ আশেপাশের এলাকার বৃহত্তম এই মৎস্য বন্দরে প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগেই শেষ হয়ে যায় কোটি কোটি টাকার প্রকাশ্য নিলাম বা মাছ বেচাকেনা।
দেশে একই সঙ্গে মিঠা ও নোনা পানির মাছের এত বড় পাইকারি বাজার আর দ্বিতীয়টি নেই। ফিশারিঘাটে বর্তমানে ১০৩টি মূল আড়ত এবং প্যাকিং আড়তসহ মোট আড়তের সংখ্যা ১৫০টি। স্বাভাবিক সময়ে এখানে প্রতিদিন ৮০ থেকে ১২০ টন মাছ কেনাবেচা হয়, যা ভরা মৌসুমে ১৫০ থেকে ২০০ টনে উন্নীত হয়। সাধারণ সময়ে প্রতিদিন গড়ে ৫ কোটি টাকার বিকিকিনি হলেও ইলিশের ভরা মৌসুমে এই লেনদেন দৈনিক ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। সীতাকুণ্ডের উপকূলীয় এলাকা, কাজের দেউড়ি, রিয়াজউদ্দিন বাজার, চকবাজার ও বহদ্দারহাটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের খুচরা বিক্রেতা, রপ্তানিকারক ও অভিজাত হোটেল-রেস্তোরাঁর ব্যবসায়ীরা সূর্য ওঠার আগেই ছুটে আসেন তাজা মাছের খোঁজে।
ফিশারিঘাটের ইতিহাস শতবর্ষের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে পাথরঘাটা ও ফিরিঙ্গিবাজার সংলগ্ন কর্ণফুলীর তীরে স্থানীয় জেলেরা সাম্পানে করে সাগর ও নদী থেকে ধরা মাছ নিয়ে এসে বেচাকেনা শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে ষাটের দশকে পাথরঘাটার ইকবাল রোডে আনুষ্ঠানিকভাবে গড়ে ওঠে ‘পুরাতন ফিশারিঘাট’। সময় প্রবাহে ব্যবসার পরিধি ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০১৪ সালে সোনালী যান্ত্রিক মৎস্য শিল্প সমবায় সমিতির উদ্যোগে এটি চাক্তাই খালের মোহনায় রাজাখালী এলাকায় ‘নতুন ফিশারিঘাট’ হিসেবে স্থানান্তরিত হয়। স্থান বদল হলেও ঘাটের হাঁকডাক, কাজের চাঞ্চল্য ও শতবর্ষের ঐতিহ্যে কোনো চির ধরেনি।
সোনালী যান্ত্রিক মৎস্য শিল্প সমবায় সমিতির সহ-সভাপতি নুর হোসাইন জানান, আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে স্থানীয় গভীর সমুদ্রগামী ট্রলারগুলোতে এখনো সনাতন পদ্ধতিতে হাত দিয়ে জাল টানা হয়। যার কারণে আশানুরূপ মাছ শিকার সম্ভব হচ্ছে না। পক্ষান্তরে বাঁশখালী ও সাতক্ষীরার ট্রলারগুলোতে আধুনিক মোটর বসানোয় তারা ভালো মাছ সংগ্রহ করতে পারছেন। এ ছাড়া এ বছর স্থানীয় ইলিশের দাম ছিল কিছুটা চড়া; এক কেজির দেশি ইলিশ ২৪০০ থেকে ২৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বিপরীতে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম সীমান্ত পেরিয়ে বাজারটিতে প্রচুর পরিমাণে ভারতীয় ইলিশ ঢুকেছে, যা প্রতি কেজি ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। ইলিশ মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে অন্তত এক হাজার মণ ভারতীয় ইলিশ এ বাজারে সরবরাহ হয়েছে।
ভোর ৫টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত চলা প্রকাশ্য এ নিলামে সামুদ্রিক ও মিঠাপানির রকমারি মাছের দেখা মেলে। সাগরের ইলিশ, রূপচাঁদা (৮০০-১৫০০ টাকা কেজি), লাক্ষা ও বড় কোরাল (৮০০-১২০০ টাকা), কালোচাঁদা, লইট্টা ও পোয়া (১৫ ১৫০-৩৫০ টাকা), রাঙা চইক্কা, সুরমা, মাইট্টা ও সামুদ্রিক চিংড়ি (৭০০-১৪০০ টাকা) ছাড়াও শাপলাপাতা মাছ, অক্টোপাস ও স্কুইডের মতো বিরল সামুদ্রিক প্রজাতিও নিয়মিত ওঠে। পাশাপাশি কাপ্তাই হ্রদ, সাতক্ষীরা, বরিশাল ও স্থানীয় দিঘি থেকে আসা বড় রুই, কাতলা, চিতল, বোয়াল, আইড়, পাবদা, শিং ও পাঙাশ মাছের সরবরাহও থাকে চোখ পড়ার মতো।
কেবল বিশাল আর্থিক লেনদেনই নয়, এই ঐতিহ্যবাহী ফিশারিঘাটকে ঘিরে গড়ে উঠেছে চট্টগ্রাম অঞ্চলের অন্যতম প্রধান কর্মসংস্থান ব্যবস্থা। আড়তদার, ট্রলারের মাঝিমাল্লা, মাছ ওঠানো-নামানোর কুলি, বরফকল শ্রমিক, মাছ কাটার কারিগর (বটিওয়ালা), পরিবহন শ্রমিক ও স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মিলে প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষের রুটি-রুজির সংস্থান হয় এই ঘাটে। দুপুরের রোদের আলো ফোটার আগেই কোটি কোটি টাকার লেনদেন শেষ করে নীরব হয়ে যায় কর্ণফুলীর তীর, আবার পরদিন শেষ রাতে জেগে ওঠে নতুন স্বপ্নের আশায়।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;