বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের মহানবমী আজ উদযাপন করা হচ্ছে। ঢাকের বাদ্য, কাঁসরের ঘণ্টা, ধূপের ধোঁয়া আর হাজারো ভক্তের প্রার্থনায় চট্টগ্রাম নগরের মণ্ডপগুলোতে বিরাজ করছে উৎসবের মুখর পরিবেশ। আলোকসজ্জায় সেজেছে নগরের প্রতিটি গলি ও পথ। আজ মঙ্গলবার মহানবমীর রাতে উৎসবের আনন্দ যেন তার চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে, কারণ আগামীকাল বুধবার বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে বিসর্জনের আবহ তৈরি হবে। দেবী দুর্গা মর্ত্যলোক থেকে ফিরে যাবেন কৈলাসে।
শ্রীশ্রী দুর্গাদেবীর নবমী বিহিত পূজা সকালে নির্ধারিত সময়েই মণ্ডপে মণ্ডপে সম্পন্ন হয়েছে। নবমী তিথি দিবা ৯টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত থাকায় পূর্বাহ্ন ৭টা ৩৪ মিটিনের মধ্যে এবং পুনঃ ৯টা ০১ মিনিটের মধ্যে দেবীর পূজা সমাপন করা হয়। এরপর ভক্তরা সারিবদ্ধভাবে দেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করেন এবং প্রসাদ বিতরণ করা হয়। নগরের টেরীবাজার রঘুনাথ বাড়ি মন্দির, জে এম সেন হল, হাজারী গলি, নন্দনকাননসহ ২৯৪টি প্রতিমা ও ঘট পূজামণ্ডপে হাজার হাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের ঢল নামে। দুপুরে বিভিন্ন মণ্ডপে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের মাঝে মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হয়।
চলতি বছর ১০ অক্টোবর শুভ মহালয়ার মাধ্যমে দেবীর আবাহন শুরু হয়েছিল এবং ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। সনাতন শাস্ত্র অনুযায়ী, এবার দেবী দুর্গা কৈলাস থেকে মর্ত্যলোকে আগমন করেছিলেন ঘোটকে (ঘোড়ায়) চড়ে, যার ফল হিসেবে ধরায় ছত্রভঙ্গের ইঙ্গিত থাকে। আর কাল বিজয়া দশমীতে দেবী কৈলাসে গমনাগমন করবেন নৌকায় চড়ে, যার ফল হিসেবে বসুন্ধরা শস্যশ্যামলা ও ধনধান্যে পূর্ণ হয়ে উঠবে বলে বিশ্বাস করা হয়।
আগামীকাল বিজয়া দশমীতে মহাদশমী পূর্বাহ্ন ৯টা ৩৩ মিনিটের মধ্যে এবং কুলিকবেলানুরোধে ৯টা ২২ মিনিটের মধ্যে শ্রীশ্রী দুর্গাদেবীর দশমী বিহিত পূজা সমাপন করা হবে। পূজা শেষে পুষ্পাঞ্জলি ও দর্পণ বিসর্জনের পর শুরু হবে বিসর্জনের মূল আয়োজন। প্রথা অনুযায়ী বিজয়ার সকালে বিবাহিত নারীরা দেবীকে পান, তেল, মিষ্টি ও সিঁদুর পরিয়ে বিদায় জানাবেন এবং ঐতিহ্যবাহী সিঁদুর খেলায় মেতে উঠবেন। এরপর ঘরে ঘরে শুরু হবে মিষ্টি মুখ ও বিজয়ার কোলাকুলি।
এদিকে বিজয়া দশমী উপলক্ষে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ চট্টগ্রাম মহানগরের উদ্যোগে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে বিশাল প্রতিমা বিসর্জন ও বিজয়া সম্মিলনীর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক অর্পণ কান্তি ব্যাণার্জি জানান, দশমীর দিন সকাল ৬টায় পূজা আরম্ভ, সাড়ে ৭টায় অঞ্জলি প্রদান, ৮টা ৫০ মিনিটে মাতৃ ঘট গৃহে প্রবেশ এবং ১০টায় সিঁদুর অর্পণ করা হবে। এরপর দুপুর ১২টা থেকে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে প্রতিমা নিরঞ্জন শুরু হবে। বিকেল ৩টায় আয়োজিত বিজয়া সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
শারদীয় দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলাজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত প্রতিটি মণ্ডপে ধর্মীয় সৌহার্দ্য ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব পালিত হয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি সমাজের সকল শ্রেনী-পেশা ও সম্প্রদায়ের মানুষ মণ্ডপগুলোতে এসে শুভেচ্ছা ও সম্প্রীতি বিনিময় করেছেন, যা চট্টগ্রামের আবহমান অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে আবারও ফুটিয়ে তুলেছে।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;