বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে টানা চার দিনের অতি ভারী বর্ষণে জলমগ্ন হয়ে পড়েছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা। বিভিন্ন ইউনিয়নের নিচু এলাকা, বসতবাড়ি ও গ্রামীণ সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাজার হাজার মানুষ। ঘরে পানি ঢুকে রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারকে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে।
সীতাকুণ্ড আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার সূত্রে জানা গেছে, গত চার দিন ধরে এখানে একটানা বৃষ্টি চলছে। এর মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে আজ বুধবার (৮ জুলাই) সকাল ৬টা পর্যন্ত মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ১৭০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা এই মৌসুমের সর্বোচ্চ। এর আগে গত রবি ও সোমবার যথাক্রমে ৫৯ ও ১০৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। চার দিনে মোট ৩৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের কারণে উপজেলার ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এই কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী শুক্রবারের আগে বৃষ্টির তীব্রতা কমার সম্ভাবনা কম।
টানা চার দিনের অবিরাম বর্ষণে সীতাকুণ্ডের যেসব এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের ভাটপাড়া ও বাদামতলসহ তিনটি গ্রামের নিচু এলাকার বাসিন্দারা এখন চরম জলজটের মুখোমুখি। চারপাশের মাঠ-ঘাট ছাড়িয়ে পাহাড়ি ঢলের পানি ঢুকে পড়েছে মানুষের শোবার ঘরেও। ফলে এসব গ্রামের শতাধিক পরিবার এখন কার্যত পানিবন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
বাদামতল এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা গোপাল কৃষ্ণ দাশ ঘরের ভেতরে জমে থাকা পানির দিকে তাকিয়ে আক্ষেপ করে বলেন, টানা বৃষ্টির পানি ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে এখন হাঁটুসমান হয়ে গেছে। ঘরের দামি সোফা, আলমারি থেকে শুরু করে সব আসবাবপত্রই পানিতে ভাসছে বা ডুবে নষ্ট হচ্ছে। উপায় না দেখে খাটের ওপর প্লাস্টিকের চেয়ার তুলে তার ওপর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও দরকারি কাগজপত্র কোনোমতে উঁচুতে রক্ষা করার চেষ্টা করেছি। সবচেয়ে বড় বিপদে পড়েছি খাওয়া-দাওয়া নিয়ে। রান্নাঘরের চুলাটি অনেক আগেই পানির নিচে তলিয়ে গেছে, ফলে ঘরে আগুন জ্বালানোর কোনো উপায় নেই। কিন্তু পেট তো আর লকডাউন মানে না! তাই বাধ্য হয়ে ঘরের ভেতর থেকে চাল-ডাল আর শুকনো কিছু জিনিসপত্র পলিথিনে মুড়িয়ে নিয়ে প্রতিবেশীর একটু উঁচু ঘরে গিয়ে রান্নার কাজ সারছি।
একই পাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ সালাউদ্দীন বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, গত কয়েক বছরের মধ্যে সীতাকুণ্ডে এমন একটানা এবং অঝোর ধারায় বৃষ্টিপাত আমরা আর দেখিনি। সাধারণত এর আগে ভারী বৃষ্টি হলেও এক-দুই ঘণ্টার একটা বিরতি পাওয়া যেত, আর বৃষ্টি থামলেই পানি দ্রুত নেমে যেত। কিন্তু এবার চার দিন ধরে আকাশ ভাঙা বৃষ্টিতে সেই সুযোগটাই মিলছে না। পানি নামার কোনো পথ নেই, উল্টো চারপাশ থেকে পানি বাড়ছে। এই জলজট আর জলাবদ্ধতার কারণে আমাদের ঘরের বাইরে বের হওয়ার সব রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা পরিবারের সবাইকে নিয়ে পুরোপুরি গৃহবন্দী ও অসহায় অবস্থায় দিন পার করছি। বৃষ্টি না কমলে এই দুর্ভোগ থেকে আমাদের মুক্তির কোনো আশা নেই।
ভারী বর্ষণের কারণে ভাটিয়ারী ইউনিয়নের জঙ্গল ভাটিয়ারী আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৫২টি পরিবারের মধ্যে ১২০টির ঘরেই পাহাড়ি ঢলের পানি ঢুকে পড়েছে। প্রবল স্রোতের কারণে নিচে নামতে না পেরে বাধ্য হয়ে পাহাড়ের চূড়ায় কৃষকদের টংঘরে আশ্রয় নিয়েছেন এই ছিন্নমূল মানুষগুলো। এছাড়া ঢলের তোড়ে জঙ্গল সলিমপুর এলাকার একটি চলাচলের রাস্তা ভেঙে বড় খাদের সৃষ্টি হয়েছে। সলিমপুরের লতিফপুর, সোনাইছড়ির তিনটি গ্রাম, কুমিরার পাঁচটি গ্রাম এবং সীতাকুণ্ড পৌরসভার প্রায় সবকটি ওয়ার্ডের সড়ক ও ঘরবাড়ি পানির নিচে রয়েছে। কুমিরার মগপুকুর এলাকার বাসিন্দা রুবেল নাথ জানান, ঘরে পানি ঢুকে আসবাবপত্র ও দরকারি সব কাগজপত্র নষ্ট হয়ে গেছে।
ভাটিয়ারী ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রহমত উল্লাহ জানান, আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা প্রতি বছরই এই মৌসুমে পাহাড় ভাঙা ঢলের শিকার হন। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ইতিমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুকনা খাবার পাঠানো হয়েছে এবং আশ্রয় নেওয়ার জন্য স্থানীয় একটি স্কুল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, টানা অতি ভারী বৃষ্টির কারণে সাময়িকভাবে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। বৃষ্টি এক-দুই ঘণ্টা কমলেই বেশিরভাগ জায়গার পানি নেমে যাবে। যেখানে স্থায়ীভাবে পানি আটকে থাকবে, সেখানে পানি নিষ্কাশনের জন্য আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের সরিয়ে নিতে মাইকিং ও সতর্কতামূলক কাজ চলমান রয়েছে।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;



















