আজ বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েম চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) লেনদেন-সংক্রান্ত পরামর্শক (ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজর) হিসেবে এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পাদনে দায়িত্ব পালন করেছে।
যেভাবে চূড়ান্ত হলো চুক্তি:
এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দীর্ঘদিন যাবৎ স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ‘সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড’-এর কাছে ছিল। গত ২০২৫ সালের ৬ জুলাই তাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরদিন থেকেই টার্মিনালটির অন্তর্বর্তী পরিচালনায় ছিল বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত ‘চিটাগং ড্রাই ডক’।
এনসিটিতে আন্তর্জাতিক মানের অপারেটর নিয়োগের কার্যক্রম মূলত ২০১৯ সাল থেকে শুরু হলেও ২০২৩ সালের মার্চে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) নীতিগত অনুমোদন দেয় তত্কালীন অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার কার্যক্রমটি আবার গতিশীল করে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে চূড়ান্ত করে। যদিও শ্রমিক ধর্মঘট ও চরম বিরোধিতার মুখে চলতি বছরের শুরুতে এই প্রক্রিয়া থমকে গিয়েছিল, পরে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন করে আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়।
বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আশার আলো:
২০০৭ সালে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে মোট পাঁচটি জেটি রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের ১৮টি কুইসাইড গ্যান্ট্রি ক্রেনের ১৪টিই রয়েছে এনসিটিতে, যা বন্দরের মোট কনটেইনার ওঠা-নামার ৪০ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে।
সরকারের দাবি, ডিপি ওয়ার্ল্ড দায়িত্ব নেওয়ায় বন্দরে জাহাজের ‘টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম’ এবং কনটেইনারের ‘ডুয়েল টাইম’ বা অবস্থানের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। এর ফলে তৈরি পোশাক, কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত পণ্য এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিমুখী খাতের লজিস্টিকস খরচ কমে সেবার মান বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।
ইজারা বাতিলের দাবিতে ঢাকায় তোলপাড় ও সংঘর্ষ:
এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘমেয়াদে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত শুরু থেকেই মেনে নিতে পারছে না ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি’ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠন। চুক্তি স্বাক্ষরের দিন দুপুরে চুক্তিটি বাতিলের দাবিতে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোটের নেতাকর্মীরা।
বিকেল ২টা ৩০ মিনিটের দিকে বিক্ষোভকারীরা ব্যানার নিয়ে জড়ো হলে পুলিশ তাতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। বাধা উপেক্ষা করে আন্দোলনকারীরা অবস্থান ধরে রাখলে একপর্যায়ে পুলিশ লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
বিক্ষোভকালে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দর আমাদের সবচেয়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠান, যা প্রতিবছর ১ হাজার কোটি টাকার ওপরে লাভ করে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ড. ইউনূস বলেছিলেন চট্টগ্রাম বন্দর নাকি আমাদের হৃৎপিণ্ড। তবে দেশের হৃৎপিণ্ড কেন সংযুক্ত আরব আমিরাত বা অন্য কোনো বিদেশি কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে?”
পূর্ববর্তী সরকারের ধারাবাহিকতার কড়া সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, “শেখ হাসিনা সরকারের আমলে যে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে প্রক্রিয়া এগিয়েও শেষ করা যায়নি, অন্তর্বর্তী সরকার গণঅভ্যুত্থানের পর সেই চুক্তি সম্পন্ন করতে চাইছে। ১৯৭১ সালে যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল তারা ছিল যুদ্ধাপরাধী, আর আজকে যারা দেশের এই লাভজনক বন্দর ও সম্পদ বিদেশি কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করছে, তারা ‘বন্দর অপরাধী’। এই দেশের মানুষ একদিন তাদের বিচার করবে।”
খালেদ / পোস্টকার্ড ;