পেশাগত দায়িত্ব পালনের গণ্ডি পেরিয়ে আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে সম্পূর্ণ নিবেদিত করে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর নিবেদিতপ্রাণ সদস্য সরোয়ার উদ্দিন আনসারী। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার এই মানবিক কর্মী দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে নিজের সামর্থ্য ও ব্যক্তিগত সময় ব্যয় করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অসহায় ও বিপন্ন মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন। চাকরির পাশাপাশি তার এই নিরলস জনসেবা আজ সমাজের প্রতিটি স্তরে এক অনুকরণীয় উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।
জরুরি মুহূর্তে মুমূর্ষু রোগীদের জন্য রক্ত জোগাড় করার ক্ষেত্রে তার কার্যক্রম অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও জীবন রক্ষাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সহ রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের রক্তের সংকট দূর করতে তিনি নিয়মিত রক্তদাতা খুঁজে দেন। গত কয়েক মাসে তিনি এক হাজারেরও বেশি জরুরি রোগীর জন্য রক্তদাতার ব্যবস্থা করতে সহযোগিতা করেছেন এবং নিজেও একাধিকবার রক্তদান করেছেন। তার এই তাৎক্ষণিক সহযোগিতায় বহু সংকটাপন্ন রোগীর জীবন রক্ষা পেয়েছে, যা উপকৃত পরিবারগুলোর কাছে পরম স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রক্তদানের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসা অসহায় রোগী ও তাদের স্বজনদের হাসপাতাল সংক্রান্ত তথ্য, ভর্তি প্রক্রিয়া এবং প্রাথমিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও তিনি পরম আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। অনেক সময় নিজের কর্মঘণ্টার বাইরে গভীর রাতেও মানুষের ফোনে সাড়া দিয়ে তিনি হাসপাতালে দৌড়ে যান। একবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় এক অসুস্থ ও সহায়হীন পথচারীকে উদ্ধার করে নিজের ক্যাম্পে নিয়ে এসে গোসল, নতুন পোশাক, খাবার ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করার মাধ্যমে তিনি চরম মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন।
তার এই মানবিক কর্মকাণ্ডের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সুবিধাবঞ্চিত শিশু, এতিম ও দরিদ্র পরিবারের পাশে দাঁড়ানো। শিক্ষা, চিকিৎসা ও খাদ্যসামগ্রী দিয়ে নিয়মিত সহায়তার পাশাপাশি তিনি সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই এলাকায় পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তার সঙ্গে সম্পৃক্ত ‘আদর্শ ছাত্র ও যুব সমাজ’ নামের অরাজনৈতিক সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে এ পর্যন্ত সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই অঞ্চলে ৩৬টি এতিম মেয়ের বিয়ের আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। বিশেষ করে মিরসরাইয়ে দুই এতিম বোনের একসঙ্গে বিয়ের সমস্ত আয়োজন, বাজারসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে এক অসহায় মায়ের চরম দুশ্চিন্তা দূর করার ঘটনাটি এলাকায় গভীর প্রশংসার জন্ম দিয়েছে।
এই সংগঠনের ব্যানারে রক্তের গ্রুপ নির্ণয়, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা অভিযান, শিক্ষা উপকরণ বিতরণ এবং বন্যার্তদের সহায়তার মতো অসংখ্য জনকল্যাণমূলক কাজ পরিচালিত হয়ে আসছে। কোনো ধরনের প্রচার বা ব্যক্তিগত প্রাপ্তির আশা না করে কেবল মানুষের ভালোবাসা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় তিনি এই কাজ করে যান। উপকৃত মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে তিনি মনে করেন।
নিজের এই কাজের অনুভূতি প্রকাশ করে আনসার সদস্য সরোয়ার উদ্দিন আনসারী বলেন, মানুষের বিপদের সময় একটু পাশে দাঁড়াতে পারা এবং তাদের মুখে হাসি ফোটাতে পারার মধ্যে যে প্রশান্তি ও আনন্দ রয়েছে, পৃথিবীর অন্য কোনো কিছুর সাথেই তার তুলনা হয় না। কোনো প্রচার বা প্রাপ্তির আশায় নয়, মানুষের ভালোবাসা আর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই আমি এই কাজগুলো ভালোবেসে করে যাচ্ছি। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমি মানুষের কল্যাণে এভাবেই নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চাই।
তার এই নিঃস্বার্থ সমাজ সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায় থেকেও তাকে সম্মাননা ও প্রশংসা প্রদান করা হয়েছে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির চেয়েও বিপন্ন মানুষের দুরাবস্থায় পাশে দাঁড়ানোর সুযোগটাই তার কাছে বড় বলে জানান এই মানবিক যোদ্ধা। দেশের প্রতিটি মানুষ যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে একটু একটু করে এগিয়ে আসে, তবে সমাজের সকল কষ্ট ও বৈষম্য অনেকাংশেই দূর করা সম্ভব বলে তিনি বিশ্বাস করেন। সরোয়ার উদ্দিন আনসারীর মতো এমন নিবেদিতপ্রাণ মানুষের উপস্থিতি ও কর্মকাণ্ড আমাদের দেশের সামগ্রিক সমাজব্যবস্থার জন্য এক অনন্য ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;