১১:১৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুবহানাল্লাহ: সৃষ্টির বিস্ময়ে স্রষ্টার পবিত্রতা ঘোষণা

  • ইসলাম ডেস্ক ।।
  • প্রকাশিত হয়েছে: ০৪:৫০:১৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
  • ২৩ শেয়ার

দৈনন্দিন কথাবার্তায় আমরা যে শব্দগুলো সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করি, তার মধ্যে অন্যতম একটি পরিভাষা হলো ‘সুবহানাল্লাহ’। অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর তাৎপর্যপূর্ণ এই জিকিরটি মুমিন বান্দার অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা বাড়িয়ে দেয়। তবে এর সঠিক অর্থ, ব্যবহারের ক্ষেত্র এবং অসামান্য ফজিলত সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রতিটি মুমিনের জন্য জরুরি।

সুবহানাল্লাহর আভিধানিক ও গূঢ় অর্থ
‘সুবহানাল্লাহ’ একটি পবিত্র আরবি শব্দগুচ্ছ। এর শাব্দিক অর্থ হলো—‘আল্লাহ পবিত্র ও সুমহান’। এর মাধ্যমে মুমিন স্বীকার করে যে, আল্লাহ তাআলা সব ধরনের অপূর্ণতা, মন্দ, দোষত্রুটি, ক্লান্তি বা সীমাবদ্ধতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র। মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে তিনি যাবতীয় ত্রুটির ঊর্ধ্বে—এই বিশ্বাসই এই শব্দটির মূল ভিত্তি। পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ৩২ নম্বর আয়াতে ফেরেশতাদের বক্তব্যেও এই তাসবিহর বাস্তব শিক্ষা ফুটে উঠেছে।

কখন ও কেন বলবেন?
দৈনন্দিন জীবনে বিস্ময় ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ‘সুবহানাল্লাহ’ পাঠ করা সুন্নাহসম্মত। প্রধানত দুটি ক্ষেত্রে এটি বহুল ব্যবহৃত:

বিস্ময়কর সৃষ্টি দেখলে: মহান আল্লাহ তাআলার কোনো নয়নাভিরাম সৃষ্টি বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখলে আমরা বিস্ময়াভিভূত হই। তখন ‘সুবহানাল্লাহ’ বলার মাধ্যমে ওই সৌন্দর্যের কারিগর হিসেবে আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করা হয়। যেমন—বিশাল সমুদ্র, পাহাড়-পর্বত বা প্রকৃতির কোনো দৃশ্য দেখে এই তাসবিহ পড়া।

বিপদ থেকে রক্ষা পেলে: বড় কোনো দুর্ঘটনা বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলে বিস্ময় ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশে এটি বলা হয়। আল্লাহর অসীম কুদরতের ওপর ভরসা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনই এর মূল উদ্দেশ্য।

সুবহানাল্লাহর অসামান্য ফজিলত
ইসলামি শরিয়তে সুবহানাল্লাহ পাঠের সওয়াব ও মর্যাদা অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন হাদিসে এর ফজিলত বর্ণনা করেছেন।

১. সহস্র নেকি অর্জনের সহজ উপায়:
হজরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) সাহাবিদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তোমাদের কেউ কি প্রতিদিন ১০০০ নেকি অর্জন করতে পারো?’ সাহাবিরা জানতে চাইলেন তা কীভাবে সম্ভব। নবীজি (সা.) বললেন, ‘১০০ বার সুবহানাল্লাহ বললে তার আমলনামায় ১০০০ নেকি লেখা হয় অথবা তার ১০০০ পাপ মোচন করা হয়।’ (সহিহ মুসলিম)

২. জান্নাতে বৃক্ষ রোপণ:
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, কেউ যদি একবার ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি’ পাঠ করে, তবে জান্নাতে তার জন্য একটি খেজুর গাছ রোপণ করা হয়। (তিরমিজি)

৩. পাল্লা ভারী করা:
রাসুল (সা.) বলেছেন, দুটি কালিমা (বাক্য) আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়, যা উচ্চারণে হালকা কিন্তু মিজানের পাল্লায় অনেক ভারী। তার মধ্যে একটি হলো ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আজিম’। (সহিহ বুখারি)

কেন এই জিকির আমাদের জীবনে জরুরি?
আমরা যখন কোনো সৌন্দর্য দেখে ‘সুবহানাল্লাহ’ বলি, তখন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে। আমরা কেবল সুন্দর বস্তুর দিকে না তাকিয়ে সেই বস্তুর স্রষ্টার মহিমা ও ক্ষমতার দিকে মনোনিবেশ করি। এটি আমাদের অহংকার থেকে মুক্তি দেয় এবং মনে করিয়ে দেয় যে, এই বিশাল মহাবিশ্বের সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ মহান আল্লাহর হাতে।

নিয়মিত ‘সুবহানাল্লাহ’ তাসবিহ পাঠের মাধ্যমে যেমন আমাদের আমলনামায় অগণিত নেকি জমা হয়, তেমনি এটি আমাদের হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও বিশ্বাসকে সুদৃঢ় করে। দৈনন্দিন ব্যস্ততার মাঝেও চলতে-ফিরতে এই তাসবিহ আমাদের আল্লহর স্মরণে রাখতে সাহায্য করে।

নিয়মিত জিকির ও তাসবিহ পাঠের মাধ্যমে নিজের জীবনকে আলোকিত করুন এবং মহান রবের সন্তুষ্টি অর্জন করুন।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;

ট্যাগ
জনপ্রিয় সংবাদ

আইয়্যামে জাহেলিয়তের অন্ধকার থেকে মুক্তির পথ দেখিয়েছেন প্রিয় নবী (দ.): কাগতিয়া দরবারে ৭৩তম জশ্‌নে জুলুছ মাহফিলে বক্তারা

সুবহানাল্লাহ: সৃষ্টির বিস্ময়ে স্রষ্টার পবিত্রতা ঘোষণা

প্রকাশিত হয়েছে: ০৪:৫০:১৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬

দৈনন্দিন কথাবার্তায় আমরা যে শব্দগুলো সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করি, তার মধ্যে অন্যতম একটি পরিভাষা হলো ‘সুবহানাল্লাহ’। অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর তাৎপর্যপূর্ণ এই জিকিরটি মুমিন বান্দার অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা বাড়িয়ে দেয়। তবে এর সঠিক অর্থ, ব্যবহারের ক্ষেত্র এবং অসামান্য ফজিলত সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রতিটি মুমিনের জন্য জরুরি।

সুবহানাল্লাহর আভিধানিক ও গূঢ় অর্থ
‘সুবহানাল্লাহ’ একটি পবিত্র আরবি শব্দগুচ্ছ। এর শাব্দিক অর্থ হলো—‘আল্লাহ পবিত্র ও সুমহান’। এর মাধ্যমে মুমিন স্বীকার করে যে, আল্লাহ তাআলা সব ধরনের অপূর্ণতা, মন্দ, দোষত্রুটি, ক্লান্তি বা সীমাবদ্ধতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র। মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে তিনি যাবতীয় ত্রুটির ঊর্ধ্বে—এই বিশ্বাসই এই শব্দটির মূল ভিত্তি। পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ৩২ নম্বর আয়াতে ফেরেশতাদের বক্তব্যেও এই তাসবিহর বাস্তব শিক্ষা ফুটে উঠেছে।

কখন ও কেন বলবেন?
দৈনন্দিন জীবনে বিস্ময় ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ‘সুবহানাল্লাহ’ পাঠ করা সুন্নাহসম্মত। প্রধানত দুটি ক্ষেত্রে এটি বহুল ব্যবহৃত:

বিস্ময়কর সৃষ্টি দেখলে: মহান আল্লাহ তাআলার কোনো নয়নাভিরাম সৃষ্টি বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখলে আমরা বিস্ময়াভিভূত হই। তখন ‘সুবহানাল্লাহ’ বলার মাধ্যমে ওই সৌন্দর্যের কারিগর হিসেবে আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করা হয়। যেমন—বিশাল সমুদ্র, পাহাড়-পর্বত বা প্রকৃতির কোনো দৃশ্য দেখে এই তাসবিহ পড়া।

বিপদ থেকে রক্ষা পেলে: বড় কোনো দুর্ঘটনা বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলে বিস্ময় ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশে এটি বলা হয়। আল্লাহর অসীম কুদরতের ওপর ভরসা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনই এর মূল উদ্দেশ্য।

সুবহানাল্লাহর অসামান্য ফজিলত
ইসলামি শরিয়তে সুবহানাল্লাহ পাঠের সওয়াব ও মর্যাদা অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন হাদিসে এর ফজিলত বর্ণনা করেছেন।

১. সহস্র নেকি অর্জনের সহজ উপায়:
হজরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) সাহাবিদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তোমাদের কেউ কি প্রতিদিন ১০০০ নেকি অর্জন করতে পারো?’ সাহাবিরা জানতে চাইলেন তা কীভাবে সম্ভব। নবীজি (সা.) বললেন, ‘১০০ বার সুবহানাল্লাহ বললে তার আমলনামায় ১০০০ নেকি লেখা হয় অথবা তার ১০০০ পাপ মোচন করা হয়।’ (সহিহ মুসলিম)

২. জান্নাতে বৃক্ষ রোপণ:
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, কেউ যদি একবার ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি’ পাঠ করে, তবে জান্নাতে তার জন্য একটি খেজুর গাছ রোপণ করা হয়। (তিরমিজি)

৩. পাল্লা ভারী করা:
রাসুল (সা.) বলেছেন, দুটি কালিমা (বাক্য) আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়, যা উচ্চারণে হালকা কিন্তু মিজানের পাল্লায় অনেক ভারী। তার মধ্যে একটি হলো ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আজিম’। (সহিহ বুখারি)

কেন এই জিকির আমাদের জীবনে জরুরি?
আমরা যখন কোনো সৌন্দর্য দেখে ‘সুবহানাল্লাহ’ বলি, তখন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে। আমরা কেবল সুন্দর বস্তুর দিকে না তাকিয়ে সেই বস্তুর স্রষ্টার মহিমা ও ক্ষমতার দিকে মনোনিবেশ করি। এটি আমাদের অহংকার থেকে মুক্তি দেয় এবং মনে করিয়ে দেয় যে, এই বিশাল মহাবিশ্বের সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ মহান আল্লাহর হাতে।

নিয়মিত ‘সুবহানাল্লাহ’ তাসবিহ পাঠের মাধ্যমে যেমন আমাদের আমলনামায় অগণিত নেকি জমা হয়, তেমনি এটি আমাদের হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও বিশ্বাসকে সুদৃঢ় করে। দৈনন্দিন ব্যস্ততার মাঝেও চলতে-ফিরতে এই তাসবিহ আমাদের আল্লহর স্মরণে রাখতে সাহায্য করে।

নিয়মিত জিকির ও তাসবিহ পাঠের মাধ্যমে নিজের জীবনকে আলোকিত করুন এবং মহান রবের সন্তুষ্টি অর্জন করুন।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;