১১:২৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মৃত্যুফাঁদে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড অংশ, ১৮ বাজারের দাপটে স্থবির জনজীবন

দেশের লাইফলাইন খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড অংশে এখন যাতায়াত মানেই যেন এক অনিশ্চিত যাত্রা। ৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কটিকে ঘিরে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা প্রায় ১৮টি হাটবাজার যানজট ও দুর্ঘটনার স্থায়ী কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রশাসন রাজস্ব আয়ের অজুহাতে বাজারগুলোকে বৈধতা দিলেও, এর ফলে সৃষ্ট চরম ভোগান্তি আর প্রাণহানির দায় এড়াতে পারছে না কেউ।

সরেজমিনে দেখা যায়, বড়দারোগারহাট, ছোটদারোগারহাট, ফকিরহাট, শুকলালহাট, বাড়বকুণ্ড, বাঁশবাড়িয়া, কৌট্টাবাজার, কুমিরা, বগুলাবাজার, মদনহাট, মাদামবিবিরহাট, ভাটিয়ারী, বানুরবাজার, জলিল গেট বাজার, ফৌজদারহাট ও পাক্কা রাস্তার মাথাসহ ১৮টি স্থানে মহাসড়কের কোল ঘেঁষে চলছে বাণিজ্য। নিয়ম অনুযায়ী মহাসড়কের নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে স্থায়ী স্থাপনা বা বাজার থাকার কথা না থাকলেও, এখানে তার উল্টো চিত্র।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ সাইদুল আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মহাসড়কের শোল্ডারটুকুও আজ দখলদারদের দখলে। জরুরি প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্স বা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি চলাচলের জন্য এক ইঞ্চি জায়গা খালি থাকে না। আমাদের জীবনের মূল্য কি ইজারাদারদের রাজস্বের চেয়ে কম?

মিনি বাসচালক ফকির আহম্মদ বলেন, ‘এই বাজারগুলোর কারণে আমাদের গাড়ির গতি যেমন কমে যায়, তেমনি যেকোনো সময় পথচারী চাপা পড়ার ভয় থাকে। মহাসড়ক কি বাজার করার জায়গা? কর্তৃপক্ষের দায়সারা সিদ্ধান্তে আমাদের প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে পোহাতে হচ্ছে।’

কুমিরা বাজারের ব্যবসায়ী সাজ্জাদ হোসেন যদিও ব্যবসায়িক সুবিধার কথা তুলে ধরেন, তবে অধিকাংশ ভুক্তভোগী মনে করেন, পরিকল্পিত অবকাঠামো ছাড়া এভাবে মহাসড়কের ওপর ব্যবসা চালানো আত্মঘাতী।

বাঁশবাড়িয়া এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ সালাউদ্দীন বলেন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং বাজারগুলোকে মহাসড়ক থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়াই এখন সময়ের দাবি। প্রশাসন যদি এখনই কঠোর না হয়, তবে দুর্ঘটনার মিছিল আরও দীর্ঘ হবে।

উপজেলা প্রশাসন বাজার ইজারা দিয়ে রাজস্ব আদায় করলেও যানজট নিয়ন্ত্রণে তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও সীতাকুণ্ডের ইউএনও মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম দাবি করেন, ‘ইজারাদারদের জনভোগান্তি না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’ অন্যদিকে, বারআউলিয়া হাইওয়ে পুলিশের ওসি আদিল মাহমুদ স্বীকার করেছেন যে, মহাসড়কসংলগ্ন এই বাজারগুলোই যানজট ও দুর্ঘটনার মূল হোতা। তবে কার্যকর মনিটরিং ও উচ্ছেদ অভিযানের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা স্পষ্ট।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধুমাত্র সতর্কবার্তা দিয়ে এই সংকট সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন মহাসড়কের শোল্ডারসহ পার্শ্ববর্তী সব অবৈধ দখল অবিলম্বে উচ্ছেদ করা এবং যতদ্রুত সম্ভব মহাসড়ক থেকে অন্তত কয়েকশ ফুট ভেতরে বাজারগুলো সরিয়ে নেওয়া এছাড়া মহাসড়কের পাশে সার্ভিস লেন ও যাত্রী পারাপারের জন্য পর্যাপ্ত ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণ করা তাছাড়া হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বাজার এলাকায় নিয়মিত টহল ও ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ।

স্থানীয়রা মনে করেন , দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়ককে সচল ও নিরাপদ রাখতে এখন দায়সারা প্রশাসনিক নির্দেশের চেয়ে প্রয়োজন কঠোর ও দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ। সীতাকুণ্ডের ৪২ কিলোমিটার এখন আর বাজারের দখলে থাকার সুযোগ নেই; বরং এটি হোক নিরাপদ যাতায়াতের একটি সুশৃঙ্খল পথ।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;

ট্যাগ
জনপ্রিয় সংবাদ

আইয়্যামে জাহেলিয়তের অন্ধকার থেকে মুক্তির পথ দেখিয়েছেন প্রিয় নবী (দ.): কাগতিয়া দরবারে ৭৩তম জশ্‌নে জুলুছ মাহফিলে বক্তারা

মৃত্যুফাঁদে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড অংশ, ১৮ বাজারের দাপটে স্থবির জনজীবন

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫:২৫:৩৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

দেশের লাইফলাইন খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড অংশে এখন যাতায়াত মানেই যেন এক অনিশ্চিত যাত্রা। ৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কটিকে ঘিরে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা প্রায় ১৮টি হাটবাজার যানজট ও দুর্ঘটনার স্থায়ী কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রশাসন রাজস্ব আয়ের অজুহাতে বাজারগুলোকে বৈধতা দিলেও, এর ফলে সৃষ্ট চরম ভোগান্তি আর প্রাণহানির দায় এড়াতে পারছে না কেউ।

সরেজমিনে দেখা যায়, বড়দারোগারহাট, ছোটদারোগারহাট, ফকিরহাট, শুকলালহাট, বাড়বকুণ্ড, বাঁশবাড়িয়া, কৌট্টাবাজার, কুমিরা, বগুলাবাজার, মদনহাট, মাদামবিবিরহাট, ভাটিয়ারী, বানুরবাজার, জলিল গেট বাজার, ফৌজদারহাট ও পাক্কা রাস্তার মাথাসহ ১৮টি স্থানে মহাসড়কের কোল ঘেঁষে চলছে বাণিজ্য। নিয়ম অনুযায়ী মহাসড়কের নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে স্থায়ী স্থাপনা বা বাজার থাকার কথা না থাকলেও, এখানে তার উল্টো চিত্র।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ সাইদুল আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মহাসড়কের শোল্ডারটুকুও আজ দখলদারদের দখলে। জরুরি প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্স বা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি চলাচলের জন্য এক ইঞ্চি জায়গা খালি থাকে না। আমাদের জীবনের মূল্য কি ইজারাদারদের রাজস্বের চেয়ে কম?

মিনি বাসচালক ফকির আহম্মদ বলেন, ‘এই বাজারগুলোর কারণে আমাদের গাড়ির গতি যেমন কমে যায়, তেমনি যেকোনো সময় পথচারী চাপা পড়ার ভয় থাকে। মহাসড়ক কি বাজার করার জায়গা? কর্তৃপক্ষের দায়সারা সিদ্ধান্তে আমাদের প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে পোহাতে হচ্ছে।’

কুমিরা বাজারের ব্যবসায়ী সাজ্জাদ হোসেন যদিও ব্যবসায়িক সুবিধার কথা তুলে ধরেন, তবে অধিকাংশ ভুক্তভোগী মনে করেন, পরিকল্পিত অবকাঠামো ছাড়া এভাবে মহাসড়কের ওপর ব্যবসা চালানো আত্মঘাতী।

বাঁশবাড়িয়া এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ সালাউদ্দীন বলেন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং বাজারগুলোকে মহাসড়ক থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়াই এখন সময়ের দাবি। প্রশাসন যদি এখনই কঠোর না হয়, তবে দুর্ঘটনার মিছিল আরও দীর্ঘ হবে।

উপজেলা প্রশাসন বাজার ইজারা দিয়ে রাজস্ব আদায় করলেও যানজট নিয়ন্ত্রণে তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও সীতাকুণ্ডের ইউএনও মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম দাবি করেন, ‘ইজারাদারদের জনভোগান্তি না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’ অন্যদিকে, বারআউলিয়া হাইওয়ে পুলিশের ওসি আদিল মাহমুদ স্বীকার করেছেন যে, মহাসড়কসংলগ্ন এই বাজারগুলোই যানজট ও দুর্ঘটনার মূল হোতা। তবে কার্যকর মনিটরিং ও উচ্ছেদ অভিযানের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা স্পষ্ট।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধুমাত্র সতর্কবার্তা দিয়ে এই সংকট সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন মহাসড়কের শোল্ডারসহ পার্শ্ববর্তী সব অবৈধ দখল অবিলম্বে উচ্ছেদ করা এবং যতদ্রুত সম্ভব মহাসড়ক থেকে অন্তত কয়েকশ ফুট ভেতরে বাজারগুলো সরিয়ে নেওয়া এছাড়া মহাসড়কের পাশে সার্ভিস লেন ও যাত্রী পারাপারের জন্য পর্যাপ্ত ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণ করা তাছাড়া হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বাজার এলাকায় নিয়মিত টহল ও ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ।

স্থানীয়রা মনে করেন , দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়ককে সচল ও নিরাপদ রাখতে এখন দায়সারা প্রশাসনিক নির্দেশের চেয়ে প্রয়োজন কঠোর ও দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ। সীতাকুণ্ডের ৪২ কিলোমিটার এখন আর বাজারের দখলে থাকার সুযোগ নেই; বরং এটি হোক নিরাপদ যাতায়াতের একটি সুশৃঙ্খল পথ।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;