১২:৩৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সীতাকুণ্ডে পাহাড়ের চূড়ায় ধ্বংস হচ্ছে ব্রিটিশ ঐতিহ্যের ‘টিবি হাসপাতাল’, এখন জুয়াড়ি ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের আস্তানা

সীতাকুণ্ডের কুমিরা রেলস্টেশনের পাশে দুর্গম পাহাড়ের চূড়ায় লতাপাতায় ঢাকা অবস্থায় যেন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছে এক টুকরো সোনালী ইতিহাস। ব্রিটিশদের পরিকল্পনা ও অনুপম প্রকৌশলগত শৈলীতে নির্মিত এই ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন রেলওয়ে বক্ষব্যাধি হাসপাতাল (টিবি হাসপাতাল) ও স্যানিটোরিয়াম (স্বাস্থ্যনিবাস) আজ চরম অবহেলায় বিলুপ্তির পথে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব আর প্রশাসনের উদাসীনতায় ঐতিহাসিক এই নিদর্শনটি বর্তমানে জুয়াড়ি ও মাদকসেবীদের নিরাপদ অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তৎকালীন আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের যক্ষ্মা রোগের সুচিকিৎসার জন্য সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত ও মনোরম পাহাড়ি পরিবেশে এই স্বাস্থ্যনিবাসটি নির্মাণ করা হয়েছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী যক্ষ্মা রোগীদের জন্য উন্মুক্ত ও নির্মল বাতাস অত্যন্ত জরুরি হওয়ায় কুমিরা পাহাড়ের এই চূড়াকে বেছে নেয় তৎকালীন ব্রিটিশ প্রকৌশলীরা।

তিনটি প্রধান দ্বিতল ভবন এবং চিকিৎসকদের আবাসিক কোয়ার্টারসহ হাসপাতালটি প্রায় ৩৯ একর পাহাড়ি জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। ব্রিটিশ আমলে এর নির্মাণকাজ শুরু হলেও পূর্ণাঙ্গভাবে হাসপাতালটির চিকিৎসা কার্যক্রম চালু হয় মূলত ১৯৫৫ সালে। পরবর্তীতে দেশজুড়ে যক্ষ্মার প্রকোপ কমে আসায় ১৯৯২ সালে এই হাসপাতালের সব ধরনের সরঞ্জাম ও কার্যক্রম চট্টগ্রাম সিআরবি (CRB) রেলওয়ে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। আর তখন থেকেই দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে এটি সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত ও বেওয়ারিশ অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, গৌরবময় এই চিকিৎসাকেন্দ্রটি এখন একটি ঐতিহাসিক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কোনো নিরাপত্তা প্রহরী বা সীমানা প্রাচীর না থাকায় পুরো এলাকা জঙ্গল, গাছপালা ও লতাপাতায় ঢেকে গেছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ভবনগুলোর ছাদ, দেয়াল এবং মেঝে ধসে পড়ছে। এই সুযোগে স্থানীয় চোরচক্র ভবনের মূল্যবান ইট, লোহার রড, দরজা-জানালার কপাটসহ সব ধরনের লোহালক্কড় ও মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে গেছে। এখন শুধু দাঁড়িয়ে আছে ভবনের কঙ্কালসার কাঠামো।

গা ছমছম করা দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশ এবং জরাজীর্ণ কঙ্কালসার কাঠামোর কারণে বর্তমানে এই পরিত্যক্ত এলাকাটি স্থানীয় তরুণ ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের কাছে একটি “অ্যাডভেঞ্চার হান্টেড প্লেস” বা ভৌতিক স্থান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। রোমাঞ্চের খোঁজে প্রতিদিন অনেক পর্যটক এখানে ভিড় করছেন। এছাড়া বিভিন্ন ইউটিউবার এবং কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা প্রায়শই এখানে এসে ভৌতিক বা রহস্যময় ট্রাভেল ডকুমেন্টারি ও ভিডিও তৈরি করছেন।

সচেতন মহলের মতে, সীতাকুণ্ডের পাহাড়ের বুকে হারিয়ে যাওয়া এই ঐতিহাসিক স্থানটিকে সংস্কার করে কোনো পর্যটন কেন্দ্র বা বিশেষায়িত সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা যেত। কিন্তু তা না করায় এটি এখন যেমন অপরাধীদের আখড়ায় পরিণত হচ্ছে, তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে একটি ঐতিহাসিক স্থাপত্যশৈলী।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;

ট্যাগ
জনপ্রিয় সংবাদ

সিপিডিএলে ‘ট্রান্সফরমেশন থ্রু বিজনেস ইনোভেশন’ শীর্ষক সেশন অনুষ্ঠিত

সীতাকুণ্ডে পাহাড়ের চূড়ায় ধ্বংস হচ্ছে ব্রিটিশ ঐতিহ্যের ‘টিবি হাসপাতাল’, এখন জুয়াড়ি ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের আস্তানা

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩:৫১:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬

সীতাকুণ্ডের কুমিরা রেলস্টেশনের পাশে দুর্গম পাহাড়ের চূড়ায় লতাপাতায় ঢাকা অবস্থায় যেন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছে এক টুকরো সোনালী ইতিহাস। ব্রিটিশদের পরিকল্পনা ও অনুপম প্রকৌশলগত শৈলীতে নির্মিত এই ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন রেলওয়ে বক্ষব্যাধি হাসপাতাল (টিবি হাসপাতাল) ও স্যানিটোরিয়াম (স্বাস্থ্যনিবাস) আজ চরম অবহেলায় বিলুপ্তির পথে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব আর প্রশাসনের উদাসীনতায় ঐতিহাসিক এই নিদর্শনটি বর্তমানে জুয়াড়ি ও মাদকসেবীদের নিরাপদ অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তৎকালীন আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের যক্ষ্মা রোগের সুচিকিৎসার জন্য সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত ও মনোরম পাহাড়ি পরিবেশে এই স্বাস্থ্যনিবাসটি নির্মাণ করা হয়েছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী যক্ষ্মা রোগীদের জন্য উন্মুক্ত ও নির্মল বাতাস অত্যন্ত জরুরি হওয়ায় কুমিরা পাহাড়ের এই চূড়াকে বেছে নেয় তৎকালীন ব্রিটিশ প্রকৌশলীরা।

তিনটি প্রধান দ্বিতল ভবন এবং চিকিৎসকদের আবাসিক কোয়ার্টারসহ হাসপাতালটি প্রায় ৩৯ একর পাহাড়ি জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। ব্রিটিশ আমলে এর নির্মাণকাজ শুরু হলেও পূর্ণাঙ্গভাবে হাসপাতালটির চিকিৎসা কার্যক্রম চালু হয় মূলত ১৯৫৫ সালে। পরবর্তীতে দেশজুড়ে যক্ষ্মার প্রকোপ কমে আসায় ১৯৯২ সালে এই হাসপাতালের সব ধরনের সরঞ্জাম ও কার্যক্রম চট্টগ্রাম সিআরবি (CRB) রেলওয়ে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। আর তখন থেকেই দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে এটি সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত ও বেওয়ারিশ অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, গৌরবময় এই চিকিৎসাকেন্দ্রটি এখন একটি ঐতিহাসিক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কোনো নিরাপত্তা প্রহরী বা সীমানা প্রাচীর না থাকায় পুরো এলাকা জঙ্গল, গাছপালা ও লতাপাতায় ঢেকে গেছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ভবনগুলোর ছাদ, দেয়াল এবং মেঝে ধসে পড়ছে। এই সুযোগে স্থানীয় চোরচক্র ভবনের মূল্যবান ইট, লোহার রড, দরজা-জানালার কপাটসহ সব ধরনের লোহালক্কড় ও মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে গেছে। এখন শুধু দাঁড়িয়ে আছে ভবনের কঙ্কালসার কাঠামো।

গা ছমছম করা দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশ এবং জরাজীর্ণ কঙ্কালসার কাঠামোর কারণে বর্তমানে এই পরিত্যক্ত এলাকাটি স্থানীয় তরুণ ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের কাছে একটি “অ্যাডভেঞ্চার হান্টেড প্লেস” বা ভৌতিক স্থান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। রোমাঞ্চের খোঁজে প্রতিদিন অনেক পর্যটক এখানে ভিড় করছেন। এছাড়া বিভিন্ন ইউটিউবার এবং কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা প্রায়শই এখানে এসে ভৌতিক বা রহস্যময় ট্রাভেল ডকুমেন্টারি ও ভিডিও তৈরি করছেন।

সচেতন মহলের মতে, সীতাকুণ্ডের পাহাড়ের বুকে হারিয়ে যাওয়া এই ঐতিহাসিক স্থানটিকে সংস্কার করে কোনো পর্যটন কেন্দ্র বা বিশেষায়িত সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা যেত। কিন্তু তা না করায় এটি এখন যেমন অপরাধীদের আখড়ায় পরিণত হচ্ছে, তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে একটি ঐতিহাসিক স্থাপত্যশৈলী।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;