০১:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৩৮৬ বছরের ঐতিহ্য:সীতাকুণ্ডের মুন্সি বাড়ি মসজিদে ১০ হাজার মানুষের রাজকীয় ‘ঈদ মেজবানি’

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক জানে উল্ল্যাহ মুন্সি বাড়ি জামে মসজিদ। কেবল ধর্মীয় উপাসনালয় হিসেবে নয়, এই মসজিদটি গত প্রায় চার শতাব্দী ধরে বহন করে চলেছে এক অনন্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য— ‘ঈদ মেজবানি’। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি; পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে রাজকীয় মেজবানি আপ্যায়নের মাধ্যমে অনন্য নজির স্থাপন করেছে এই প্রাচীন মসজিদ ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে সুদূর ইরাক থেকে জাহাজযোগে বঙ্গোপসাগর উপকূলের ছোঁয়াখালী খাল দিয়ে ভাটিয়ারীতে আসেন প্রখ্যাত সুফি সাধক জানে উল্ল্যাহ মুন্সি (রহ.)। তৎকালীন মগ ও হিন্দু অধ্যুষিত এই জনপদে তিনি বসতি স্থাপন করেন এবং তাঁর হাত ধরেই গড়ে ওঠে এই ঐতিহাসিক জামে মসজিদ, রাস্তাঘাট ও বিশাল দিঘি। সেই সময় থেকেই দূর-দূরান্তের মুসল্লিদের ঈদ পরবর্তী আপ্যায়নের যে প্রথা তিনি শুরু করেছিলেন, তা আজ ৩৮৬ বছর পেরিয়েও অমলিন।

প্রাচীনকালে সীতাকুণ্ডে হাতেগোনা কয়েকটি মসজিদ থাকায় ঈদের নামাজ পড়তে অনেক দূর থেকে মুসল্লিরা এখানে আসতেন। তখন ঈদের চাঁদ দেখা গেলেই মসজিদের পুকুর থেকে মাছ ধরা হতো এবং গরু-ছাগল জবাই করে মুসল্লিদের খাওয়ানো হতো। সময়ের পরিক্রমায় সেই আতিথেয়তা আজ বিশাল এক ‘মেজবানি’ উৎসবে রূপ নিয়েছে।

মুন্সি বাড়ির দিদারুল আলম জানান, বংশপরম্পরায় এই ঐতিহ্য বজায় রাখতে এবার ৬টি বড় গরু জবাই করা হয়েছে। প্রায় ৪০ মণ মাংস, ৭৫০ কেজি আলু এবং ৩০০ কেজি ছোলার ডাল দিয়ে রান্না করা ঐতিহ্যবাহী মেজবানি খেয়েছেন অন্তত ৮ হাজার স্থানীয় ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা মেহমান। পার্শ্ববর্তী নাছির মোহাম্মদ চৌধুরী বাড়িতেও একই দিনে আরও ২ হাজার মানুষের মেজবানি সম্পন্ন হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার মানুষ এই আপ্যায়নে শরিক হন।

মসজিদ কমিটির সভাপতি ও বিশিষ্ট শিল্পপতি মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন বলেন, “জানে উল্ল্যাহ মুন্সি (রহ.) আমাদের শিখিয়েছেন— মেজবানি শুধু খাবার নয়, এটি ভালোবাসা, সম্মান ও একতার প্রতীক। এই আয়োজন আজ শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো এলাকার ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।”

সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফরিদুল আলম আবেগপ্লুত হয়ে বলেন, “মেজবানিতে মানুষের আনন্দ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আতিথেয়তা মানে শুধু পেট ভরানো নয়, বরং হৃদয় ভরানো। শত বছরের এই প্রথা আমাদের পূর্বপুরুষদের আদর্শকে বাঁচিয়ে রেখেছে।”

এই মসজিদটি আজও তার প্রাচীন গাম্ভীর্য ধরে রেখেছে। একসময় যেখানে ‘ভাটি-গঞ্জ’ নামে বড় হাট বসত, সেই খালের প্রবাহ আজও মসজিদের স্মৃতি বয়ে নিয়ে চলেছে। স্থানীয়দের মতে, এই মেজবানি আয়োজন সীতাকুণ্ডের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক জীবন্ত উদাহরণ।

প্রতিবছর ঈদের দিন কেবল খাবারের লোভে নয়, বরং কয়েকশ বছরের পুরনো এই ঐতিহ্যের অংশ হতে সীতাকুণ্ড ছাড়িয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মেহমানরা ছুটে আসেন ভাটিয়ারীর এই মুন্সি বাড়িতে। ৩৮৬ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে আসা এই বিশাল মেজবানি উৎসব বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ঈদ উৎসবে পরিণত হয়েছে।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;

ট্যাগ
জনপ্রিয় সংবাদ

বিশ্বজুড়ে যথাযোগ্য ভাবগাম্ভীর্যে পালিত হচ্ছে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.)

৩৮৬ বছরের ঐতিহ্য:সীতাকুণ্ডের মুন্সি বাড়ি মসজিদে ১০ হাজার মানুষের রাজকীয় ‘ঈদ মেজবানি’

প্রকাশিত হয়েছে: ০৮:৩৪:১৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক জানে উল্ল্যাহ মুন্সি বাড়ি জামে মসজিদ। কেবল ধর্মীয় উপাসনালয় হিসেবে নয়, এই মসজিদটি গত প্রায় চার শতাব্দী ধরে বহন করে চলেছে এক অনন্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য— ‘ঈদ মেজবানি’। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি; পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে রাজকীয় মেজবানি আপ্যায়নের মাধ্যমে অনন্য নজির স্থাপন করেছে এই প্রাচীন মসজিদ ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে সুদূর ইরাক থেকে জাহাজযোগে বঙ্গোপসাগর উপকূলের ছোঁয়াখালী খাল দিয়ে ভাটিয়ারীতে আসেন প্রখ্যাত সুফি সাধক জানে উল্ল্যাহ মুন্সি (রহ.)। তৎকালীন মগ ও হিন্দু অধ্যুষিত এই জনপদে তিনি বসতি স্থাপন করেন এবং তাঁর হাত ধরেই গড়ে ওঠে এই ঐতিহাসিক জামে মসজিদ, রাস্তাঘাট ও বিশাল দিঘি। সেই সময় থেকেই দূর-দূরান্তের মুসল্লিদের ঈদ পরবর্তী আপ্যায়নের যে প্রথা তিনি শুরু করেছিলেন, তা আজ ৩৮৬ বছর পেরিয়েও অমলিন।

প্রাচীনকালে সীতাকুণ্ডে হাতেগোনা কয়েকটি মসজিদ থাকায় ঈদের নামাজ পড়তে অনেক দূর থেকে মুসল্লিরা এখানে আসতেন। তখন ঈদের চাঁদ দেখা গেলেই মসজিদের পুকুর থেকে মাছ ধরা হতো এবং গরু-ছাগল জবাই করে মুসল্লিদের খাওয়ানো হতো। সময়ের পরিক্রমায় সেই আতিথেয়তা আজ বিশাল এক ‘মেজবানি’ উৎসবে রূপ নিয়েছে।

মুন্সি বাড়ির দিদারুল আলম জানান, বংশপরম্পরায় এই ঐতিহ্য বজায় রাখতে এবার ৬টি বড় গরু জবাই করা হয়েছে। প্রায় ৪০ মণ মাংস, ৭৫০ কেজি আলু এবং ৩০০ কেজি ছোলার ডাল দিয়ে রান্না করা ঐতিহ্যবাহী মেজবানি খেয়েছেন অন্তত ৮ হাজার স্থানীয় ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা মেহমান। পার্শ্ববর্তী নাছির মোহাম্মদ চৌধুরী বাড়িতেও একই দিনে আরও ২ হাজার মানুষের মেজবানি সম্পন্ন হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার মানুষ এই আপ্যায়নে শরিক হন।

মসজিদ কমিটির সভাপতি ও বিশিষ্ট শিল্পপতি মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন বলেন, “জানে উল্ল্যাহ মুন্সি (রহ.) আমাদের শিখিয়েছেন— মেজবানি শুধু খাবার নয়, এটি ভালোবাসা, সম্মান ও একতার প্রতীক। এই আয়োজন আজ শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো এলাকার ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।”

সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফরিদুল আলম আবেগপ্লুত হয়ে বলেন, “মেজবানিতে মানুষের আনন্দ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আতিথেয়তা মানে শুধু পেট ভরানো নয়, বরং হৃদয় ভরানো। শত বছরের এই প্রথা আমাদের পূর্বপুরুষদের আদর্শকে বাঁচিয়ে রেখেছে।”

এই মসজিদটি আজও তার প্রাচীন গাম্ভীর্য ধরে রেখেছে। একসময় যেখানে ‘ভাটি-গঞ্জ’ নামে বড় হাট বসত, সেই খালের প্রবাহ আজও মসজিদের স্মৃতি বয়ে নিয়ে চলেছে। স্থানীয়দের মতে, এই মেজবানি আয়োজন সীতাকুণ্ডের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক জীবন্ত উদাহরণ।

প্রতিবছর ঈদের দিন কেবল খাবারের লোভে নয়, বরং কয়েকশ বছরের পুরনো এই ঐতিহ্যের অংশ হতে সীতাকুণ্ড ছাড়িয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মেহমানরা ছুটে আসেন ভাটিয়ারীর এই মুন্সি বাড়িতে। ৩৮৬ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে আসা এই বিশাল মেজবানি উৎসব বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ঈদ উৎসবে পরিণত হয়েছে।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;