আজ মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) পবিত্র শবেবরাত। হিজরি সনের শাবান মাসের ১৪ তারিখের এই রাতটি মুসলমানদের কাছে পরিচিত ‘লাইলাতুল বরাত’ বা সৌভাগ্য রজনী হিসেবে। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এ রাতে মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর অসীম রহমত ও ক্ষমার দরজা খুলে দেন এবং অসংখ্য বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তির সনদ দান করেন।
‘শবেবরাত’ শব্দটি ফারসি ভাষা থেকে এসেছে। ‘শব’ অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ অর্থ মুক্তি, নিষ্কৃতি বা সৌভাগ্য। আরবিতে একে বলা হয় ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শা‘বান’ বা মধ্য শাবানের রাত। এই রাতের ফজিলত সম্পর্কে কোরআন ও হাদিসে বিভিন্ন ইঙ্গিত ও বর্ণনা পাওয়া যায়।
হাদিসে শবে বরাতের মর্যাদা
হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে,
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
“মহান আল্লাহ মধ্য শাবানের রাতে তাঁর সৃষ্টিজগতের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন এবং শিরিককারী ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।”
(ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৫৬৬৫; মুসনাদে আহমদ)
অন্য এক হাদিসে এসেছে—
“মধ্য শাবানের রাতে আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন— আছে কি কেউ ক্ষমা প্রার্থনাকারী, যাকে আমি ক্ষমা করব? আছে কি কেউ রিজিক প্রার্থনাকারী, যাকে আমি রিজিক দান করব?”
(সুনানে ইবনে মাজাহ)
ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির রাত
এই মহিমান্বিত রাতে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা নফল নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার ও দরুদ শরিফ পাঠে মগ্ন থাকেন। অতীত জীবনের পাপ, অন্যায় ও গাফিলতির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য হেদায়েত ও কল্যাণ কামনা করেন।
এ রাতে বান্দারা শুধু নিজের জন্য নয়—মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, সমাজ, রাষ্ট্র এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহ ও মানবজাতির শান্তি, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির জন্য দোয়া করেন। কবর জিয়ারত করাও অনেকের মাঝে প্রচলিত, যেখানে তারা মৃত্যুর কথা স্মরণ করে আত্মশুদ্ধির চেষ্টা করেন।
শবে বরাত ও রোজার ফজিলত
হাদিস অনুযায়ী, শাবান মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত ছিল।
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন—
“আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে শাবান মাসের মতো অন্য কোনো মাসে এত বেশি রোজা রাখতে দেখিনি।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
এ কারণে অনেক আলেম শবেবরাতের আগের দিন বা পরের দিন নফল রোজা পালনের প্রতি উৎসাহিত করেছেন।
রমজানের প্রস্তুতির বার্তা
পবিত্র শবেবরাত মুসলমানদের জন্য শুধু ক্ষমা ও মুক্তির রাতই নয়, বরং এটি পবিত্র রমজান মাসের আগমনী বার্তাও বহন করে। শাবান মাসের পরেই শুরু হয় সিয়াম, কিয়াম ও কোরআনের মাস—রমজান। তাই শবেবরাত থেকেই কার্যত রমজানের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়—আত্মশুদ্ধি, ইবাদতে মনোযোগ এবং চরিত্র সংশোধনের মাধ্যমে।
সরকারি ছুটি
পবিত্র শবেবরাত উপলক্ষে বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সরকারিভাবে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে এদিন সব সরকারি অফিস, আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে।
আলেমদের আহ্বান
দেশের আলেম-ওলামারা শবেবরাতে সব ধরনের বিদআত, অপচয় ও অনৈতিক কাজ পরিহার করে কোরআন-সুন্নাহসম্মত ইবাদতের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা মুসলমানদের পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ ত্যাগ করে পরস্পরকে ক্ষমা করার মাধ্যমে এই রাতের প্রকৃত শিক্ষা ধারণ করার তাগিদ দিয়েছেন।
পবিত্র শবেবরাত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আল্লাহর রহমত সীমাহীন, তবে তা লাভের জন্য প্রয়োজন খাঁটি তাওবা, বিশুদ্ধ নিয়ত ও পরিশুদ্ধ হৃদয়।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;




















