চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে ব্যস্ত ও বড় নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং এর ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড (ওসিওয়াই) দীর্ঘ ১৫ বছরের জন্য পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’কে দেওয়ার চুক্তি চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর ২০২৬) বিকেল ৩টায় ঢাকার ইনভেস্ট বাংলাদেশ মিলনায়তনে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় বহুল আলোচিত এ ইজারা চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে। এতে ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ঈসা কাজিমের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। তবে জাতীয় স্বার্থবিরোধী আখ্যা দিয়ে এই চুক্তি অবিলম্বে বাতিল না করলে চট্টগ্রাম বন্দর অচলসহ সর্বাত্মক ধর্মঘটের চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শ্রমিক-কর্মচারী ও আন্দোলনরত বিভিন্ন রাজনৈতিক দল।
অভিন্ন দাবিতে আন্দোলনে বিএনপি-জামায়াত ও শ্রমিক সংগঠন: এনসিটি ও সিসিটি বিদেশি অপারেটরের কাছে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগের বিরোধিতায় রাজপথে নেমেছে বিএনপিপন্থি ‘চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল’, জামায়াত সমর্থিত ‘চট্টগ্রাম বন্দর ইসলামী শ্রমিক সংঘ’, বাম ধারার ‘বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র’ (টিইউসি) এবং আওয়ামী লীগ সমর্থিত ‘বন্দর জাতীয় শ্রমিক লীগ’।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে আয়োজিত এসব কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে অবস্থান কর্মসূচি ও বুধবার রাতে বিশাল মশাল মিছিল পালিত হয়েছে। আন্দোলনকারীরা জানান, চুক্তি বাতিল করা না হলে আগামী ১৩ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দর ভবন ঘেরাও করা হবে।
দলীয় পরিচয়ের উর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থের দাবি: চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল নেতা হুমায়ুন কবির বলেন, “আমাদের কাছে দলের চেয়ে দেশের এবং বন্দরের স্বার্থ অনেক বড়। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে আমরা আন্দোলনের মাঠে আছি।”
একই সুর মিলিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র (টিইউসি) চট্টগ্রামের সভাপতি তপন দত্ত জানান, শ্রমিক স্বার্থ ও জাতীয় অর্থনীতি রক্ষায় তারা সবাই দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ। অন্যদিকে ইসলামী শ্রমিক সংঘের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইয়াছিন জানান, চুক্তি হলে তারা সংবাদ সম্মেলন ডেকে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।
প্রকল্প বিবরণী ও বিদেশি অপারেটর বিতর্ক: পিপিপি কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ‘অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স অব সিপিএ’স এনসিটি, ওসিওয়াই’ প্রকল্পটির নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল ২০২৩ সালের ২৩ মার্চ। ২০৫ মিলিয়ন ডলার সম্ভাব্য ব্যয়ের এই প্রকল্পের আওতায় এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশই হ্যান্ডলিং হয় স্বয়ংসম্পূর্ণ ও লাভজনক এই এনসিটি টার্মিনাল দিয়ে। আন্দোলনকারীদের দাবি—সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে বা ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালসের মতো একের পর এক টার্মিনাল বিদেশি সংস্থাকে হস্তান্তরের ফলে দেশের রাজস্ব, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব হুমকিতে পড়বে।
যদিও সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে—বন্দরের দক্ষতা, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা বাড়াতেই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অপারেটর যুক্ত করা হচ্ছে; তবে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে যেকোনো মূল্যে বন্দর স্থবির করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম বন্দর এলাকা।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;