চট্টগ্রামজুড়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতির আশঙ্কাজনক অবনতি ঘটছে। বিভাগীয় শহরের পাশাপাশি গ্রাম ও উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলার ১৫টি উপজেলার মধ্যে সীতাকুণ্ডে এডিস মশাবাহিত এই জ্বরের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি, যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ইতিমধ্যেই পাঁচশর কাছাকাছি পৌঁছেছে। অপরদিকে দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে আক্রান্তের হার অপেক্ষাকৃত অনেক কম। এদিকে নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নাজমা (৪৯) নামের এক নারীর মৃত্যু হওয়ায় চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে জেলায় মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩ জনে।
চলতি বছরের হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জেলায় এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৬৮৩ জন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধুমাত্র ১৫টি উপজেলাই রেকর্ড করেছে ১ হাজার ৬২৩ জন রোগী। উপজেলার আক্রান্তের পরিসংখ্যানে শীর্ষস্থানে থাকা সীতাকুণ্ডে সর্বোচ্চ ৪৯৭ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর পরপরই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে কর্ণফুলী (২৩৫ জন), বাঁশখালী (১১৯ জন) ও রাঙ্গুনিয়া (১১৫ জন)। অন্যান্য উপজেলার মধ্যে আনোয়ারায় ৮৬, রাউজানে ৮০, পটিয়ায় ৭৯, সাতকানিয়ায় ৭৭, বোয়ালখালীতে ৬০, লোহাগাড়ায় ৫৯, হাটহাজারীতে ৫৮, মীরসরাইয়ে ৫৭, চন্দনাইশে ৫০, ফটিকছড়িতে ৩৪ জন এবং দ্বীপ অঞ্চল সন্দ্বীপে সর্বনিম্ন ১৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছেন।
গত চব্বিশ ঘণ্টায় নতুন করে ৯৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) ৩৭ জন, ফৌজদারহাটের বিআইটিআইডি হাসপাতালে ১৪ জন, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ১২ জন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ১৩ জন এবং বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ১৮ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চলতি সেপ্টেম্বর মাসের শুরু থেকেই সংক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিগত মাসগুলোর তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। আগস্টে ১ হাজার ২০২ জন এবং জুলাইয়ে ৫৩৬ জন আক্রান্ত হলেও সেপ্টেম্বরের এই অল্প ক’দিনে আক্রান্ত ছাড়িয়েছে ১ হাজার ৬৪৭ জন।
চিকিৎসা ও কীটতত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে থেমে থেমে হওয়া মাঝারি বৃষ্টির কারণে জমে থাকা স্বচ্ছ পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ঘরের বারান্দায় বা ছাদে রাখা ফুলের টব, নারকেলের ডাবের খোসা, ড্রাম এবং পুরনো গাড়ির টায়ারে পানি জমে এডিস মশা বংশবৃদ্ধি করছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাসাবাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা, তিন দিনের বেশি জমে থাকা পানি ফেলে দেওয়া এবং দিনে ও রাতে মশারি ব্যবহার করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো. সাজেদুর রহমান জানান, উপজেলাগুলোতে সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আলাদা ডেঙ্গু ইউনিট বা ব্লক চালু করা হয়েছে। এর পাশাপাশি জেলা শহরের বড় সরকারি হাসপাতালসহ বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা ও ওষুধের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, ফলে চিকিৎসায় কোনো ধরনের ঘাটতি দেখা দেবে না। তথ্যমতে, ২০২৩ সালে জেলায় সর্বোচ্চ ১৪,০৮৭ জন আক্রান্তের মধ্যে ১০৭ জন মারা যান। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে ৪,৩২৩ জন আক্রান্তের মধ্যে ৪৫ জন এবং ২০২৫ সালে ৪,৮৬৪ জন আক্রান্তের মধ্যে ২৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল।
খালেদ । পোস্টকার্ড ;