০৩:২৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যেভাবে চট্টগ্রাম হয়ে উঠল “জুলুসের শহর”, জশনে জুলুসের পাঁচ দশকের ইতিহাস

চট্টগ্রাম নিজের চেনা চেহারা হারিয়ে ফেলে রবিউল আউয়ালের বারো তারিখ এলে। বন্দরনগরীর যে রাস্তাগুলো সারাবছর ট্রাক আর রিকশার ঠেলাঠেলিতে হাঁপিয়ে ওঠে, সেই রাস্তাই একদিনের জন্য হয়ে ওঠে এক অথই মানুষের নদী। সবুজ আর সাদা নিশান হাওয়ায় দোলে, দরুদের সুর মাথার ওপর দিয়ে ঢেউয়ের মতো ভেসে যায় এক গলি থেকে আরেক গলিতে, আর পথের দুপাশে দাঁড়ানো মানুষ চোখ ভিজিয়ে তাকিয়ে থাকে সেই স্রোতের দিকে, যেন শহরটা নিজেই একবার নবীজিকে স্মরণ করার জন্য শ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে গেছে। এই দৃশ্য একদিনের নয়, একটা মিছিলেরও নয়, এটা পাঁচ দশক ধরে গড়ে ওঠা এক ভালোবাসার ঐতিহ্য, যা একটা ছোট্ট খানকা থেকে শুরু হয়ে আজ নিজেকে দাবি করে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় শোভাযাত্রা বলে।

এই ভালোবাসা প্রকাশের রীতিটা অবশ্য চট্টগ্রামের নিজস্ব আবিষ্কার নয়, এর শেকড় অনেক দূরে, বহু শতাব্দী আগের মেসোপটেমিয়ার মাটিতে। ইরাকের এরবিল অঞ্চলে এক সময় শাসন করতেন মুজাফফরুদ্দীন কুকুবুরী, বীর সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর আত্মীয়, যাঁর হৃদয়ে নবীপ্রেম এমন গভীর ছিল যে তিনি প্রতিবছর গোটা এক মাস ধরে আনন্দোৎসব সাজাতেন কেবল নবীজির জন্মদিন উপলক্ষে। মশাল হাতে মিছিল বেরোত রাতের অন্ধকার চিরে, কোরবানির পশু জবাই হতো, মানুষ ভুলে যেত দৈনন্দিন জীবনের ক্লান্তি, আর শাসক নিজেই নেমে আসতেন প্রজাদের কাতারে দাঁড়িয়ে সেই আনন্দে শামিল হতে। সেই আগুনের শিখা থেকেই যেন ছড়িয়ে পড়েছিল এক প্রেমের ভাষা, সুফি সাধকদের হাত ধরে যা পাড়ি দিয়েছিল মরুভূমি, পাহাড়, নদী পেরিয়ে গোটা মুসলিম দুনিয়ায়। যদিও এই পথ কখনো নিষ্কণ্টক ছিল না, কিছু আলেম একে বিদআত বলে আপত্তি তুলেছেন বরাবর, কারণ নবীজি নিজে বা তাঁর সাহাবিরা এভাবে দিনটি উদযাপন করেননি, আর অন্যপক্ষ বলেছেন ভালোবাসার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম হয় না, হৃদয় যেভাবে প্রকাশ চায় সেভাবেই তা প্রকাশ পাওয়া উচিত। এই বিতর্ক আজও থামেনি, তবে বাংলাদেশের মাটিতে এসে এই ভালোবাসা এক অন্যরকম রূপ নিয়েছে, রাষ্ট্র নিজেই যাকে ছুটির দিন ঘোষণা করে সম্মান জানিয়েছে।

বাংলায় এই শব্দটা, মিলাদ, এসেছে ফারসির হাত ধরে, আরবি থেকে সরাসরি নয়, অথচ দুই ভাষাতেই এর অর্থ একটাই, জন্মমুহূর্ত। কিন্তু বাংলার মুসলমানের কাছে এই দিনটা শুধু জন্মের নয়, এতে মিশে আছে বিদায়ের বেদনাও, কারণ কথিত আছে নবীজি একই তারিখে পৃথিবীতে এসেছিলেন আর একই তারিখে পৃথিবী ছেড়ে গিয়েছিলেন। তাই এই দিনের রঙে আনন্দ আর বিষাদ একসঙ্গে মিশে থাকে, রোজার ঈদ বা কোরবানির ঈদের নিখাদ উৎসবের চেয়ে অনেকটা আলাদা এক অনুভূতি। উপমহাদেশে সংগঠিত মিছিলের প্রথম স্মৃতি মেলে লাহোরের রাস্তায়, বিশ শতকের তিরিশের দশকে, কিন্তু বাংলাদেশে এই ভালোবাসা যে বিশাল জনসমুদ্রে রূপ নেবে, সেই ইতিহাস লেখা হবে ঢাকায় নয়, লেখা হবে চট্টগ্রামের মাটিতে।

সেই গল্পের শুরু ১৯৭৪ সালে, স্বাধীনতার ক্ষত তখনও শুকায়নি, দেশ তখনও যুদ্ধবিধ্বস্ত এক ভূখণ্ড থেকে নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টায়। ঠিক সেই সময়ে বালুয়ার দীঘি খানকা সংলগ্ন কাদেরিয়া সৈয়দিয়া তৈয়্যবিয়া থেকে আনজুমান-ই রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট বের করেছিল বাংলাদেশের প্রথম জশনে জুলুস, ছোট্ট এক মিছিল, মুষ্টিমেয় কিছু ভক্তের পায়ের ছাপ, যাদের কেউ তখন কল্পনাও করেনি এই পথচলা একদিন লাখো মানুষের ঢলে পরিণত হবে। পীর সৈয়দ মোহাম্মদ তৈয়্যব শাহ, পাকিস্তানের চিরিকোট দরবার শরীফ থেকে এসে, নিজের হাতে এই ছোট্ট শিখাটাকে বড় করে তুলেছিলেন এক দশক ধরে, তাঁর প্রয়াণের পর ছেলে সৈয়দ মুহাম্মদ তাহের শাহ সেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন ১৯৮৬ সাল থেকে, আজও যিনি সেই একই ভালোবাসার মশাল বয়ে বেড়াচ্ছেন। চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে একই পরিবারের হাতে এই আয়োজনের নেতৃত্ব থাকা যেন এক নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞার মতো, দেশে সরকার বদলেছে, রাজনীতির রং বদলেছে বারবার, কিন্তু এই মিছিলের হৃদয় বদলায়নি। আর কী আশ্চর্য, এই ভালোবাসার ভাষা এখানেই থেমে থাকেনি, চট্টগ্রামের এই আঙিনা থেকে যেন উপচে পড়ে ছড়িয়ে গেছে দেশের অন্য শহরেও, ঢাকা থেকে যা সচরাচর ঘটে তার উল্টো স্রোতে, রাজধানী নয়, বন্দরনগরীই এখানে দিয়েছে পথের দিশা।

এই মিছিলের পথটাও যেন নিজেই একটা তীর্থযাত্রা হয়ে উঠেছে বছরের পর বছর ধরে। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই শোলকবহরের আলমগীর খানকা শরীফের সামনে জমতে শুরু করে মানুষ, তারপর সকাল আটটায় সেই স্রোত এগিয়ে চলে বিবিরহাটের দিকে, মির্জাপুল, কাতালগঞ্জ, চকবাজারের সরু গলি পেরিয়ে, প্যারেড ময়দানের বিশাল খোলা মাঠ ছুঁয়ে, চট্টগ্রাম কলেজের সামনে দিয়ে, খাস্তগীর স্কুল, আসকার দীঘির পাড় ধরে, কাজীর দেউড়ি হয়ে জিইসি মোড়ের কোলাহলে মিশে গিয়ে থামে মুরাদপুরে, তারপর আবার সেই একই পথ ধরে ফিরে আসে যেখান থেকে শুরু হয়েছিল। এই পথ যেন এক সুতোয় বেঁধে দেয় পুরনো শহরের ঘুপচি গলি আর নতুন শহরের চওড়া সড়ককে, অতীত আর বর্তমানকে, যেন চট্টগ্রাম নিজের সমস্ত ইতিহাস এক লহমায় হেঁটে পার হয়ে যায়।

এই ঢলের আকার নিয়ে বলা কথাগুলো এতটাই বিশাল যে সংখ্যায় বাঁধা কঠিন, লাখো মানুষের কথা বলা হয় প্রতিবার, আর ২০২২ সালে যখন এই মিছিল তার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করল, তখন আয়োজকরা স্বপ্ন দেখেছিলেন বিশ্ব রেকর্ডের খাতায় নাম তোলার, গিনেস কর্তৃপক্ষের দুয়ারে কড়া নেড়েছিলেন এই দাবি নিয়ে যে এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় জমায়েত। সেই স্বীকৃতি আনুষ্ঠানিকভাবে হাতে এসেছে কি না তার সদুত্তর নেই, কিন্তু চট্টগ্রামের মানুষের হৃদয়ে এই নিয়ে কোনো সংশয় নেই, প্রতিবার তারা নতুন করে বলে ওঠে, এই মিছিল পৃথিবীতে অতুলনীয়।

তবে এত বড় ভালোবাসার স্রোতকে বইয়ে নিয়ে যাওয়া সহজ কাজ নয়, আর চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক অতীত মনে করিয়ে দেয়, এই ভালোবাসার আগুন কখনো কখনো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারে। হাটহাজারীতে একটা সামান্য ফেসবুক পোস্ট থেকে দাউদাউ করে জ্বলে উঠেছিল সংঘাত, জশনে জুলুসের সমর্থক আর মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যে, শতাধিক মানুষ আহত হয়েছিলেন সেই রাতে, প্রশাসনকে জারি করতে হয়েছিল ১৪৪ ধারা। এই ঘটনা যেন এক তিক্ত মনে করিয়ে দেওয়া, ভালোবাসা আর উত্তেজনা একই শহরের বাতাসে পাশাপাশি বাস করে, আর যত বড় হয় এই জনস্রোত, ততই বাড়ে তার ভেতরের ঝুঁকি, ততই কঠিন হয় শহরের প্রশাসনের জন্য একে নিরাপদে পথ চলতে দেওয়া।

তবু, বছর ঘুরে এলে আবার সেই একই পথে জেগে ওঠে চট্টগ্রাম। খানকার এক ছোট্ট দরজা থেকে যাত্রা শুরু করা এই মিছিল আজ শহরের নিজের গল্প হয়ে উঠেছে, তার রক্তে মিশে গেছে, তার অলিগলির স্মৃতিতে খোদাই হয়ে আছে। প্রতিবছর এই একটা দিনে বন্দরনগরী তার সমস্ত ব্যস্ততা ভুলে গিয়ে হেঁটে চলে এক অদৃশ্য ভালোবাসার পিছু পিছু, আর হয়তো এখানেই লুকিয়ে আছে আসল উত্তর, কেন এই শহরই হয়ে উঠল জুলুসের শহর। সংখ্যা দিয়ে এই ভালোবাসা মাপা যায় না, কেবল অনুভব করা যায়, যেভাবে চট্টগ্রামের প্রতিটি রাস্তা প্রতিবছর একই দিনে নতুন করে অনুভব করে তার নবীপ্রেম।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;

ট্যাগ
জনপ্রিয় সংবাদ

যেভাবে চট্টগ্রাম হয়ে উঠল “জুলুসের শহর”, জশনে জুলুসের পাঁচ দশকের ইতিহাস

যেভাবে চট্টগ্রাম হয়ে উঠল “জুলুসের শহর”, জশনে জুলুসের পাঁচ দশকের ইতিহাস

প্রকাশিত হয়েছে: ০৭:৫১:১৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬

চট্টগ্রাম নিজের চেনা চেহারা হারিয়ে ফেলে রবিউল আউয়ালের বারো তারিখ এলে। বন্দরনগরীর যে রাস্তাগুলো সারাবছর ট্রাক আর রিকশার ঠেলাঠেলিতে হাঁপিয়ে ওঠে, সেই রাস্তাই একদিনের জন্য হয়ে ওঠে এক অথই মানুষের নদী। সবুজ আর সাদা নিশান হাওয়ায় দোলে, দরুদের সুর মাথার ওপর দিয়ে ঢেউয়ের মতো ভেসে যায় এক গলি থেকে আরেক গলিতে, আর পথের দুপাশে দাঁড়ানো মানুষ চোখ ভিজিয়ে তাকিয়ে থাকে সেই স্রোতের দিকে, যেন শহরটা নিজেই একবার নবীজিকে স্মরণ করার জন্য শ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে গেছে। এই দৃশ্য একদিনের নয়, একটা মিছিলেরও নয়, এটা পাঁচ দশক ধরে গড়ে ওঠা এক ভালোবাসার ঐতিহ্য, যা একটা ছোট্ট খানকা থেকে শুরু হয়ে আজ নিজেকে দাবি করে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় শোভাযাত্রা বলে।

এই ভালোবাসা প্রকাশের রীতিটা অবশ্য চট্টগ্রামের নিজস্ব আবিষ্কার নয়, এর শেকড় অনেক দূরে, বহু শতাব্দী আগের মেসোপটেমিয়ার মাটিতে। ইরাকের এরবিল অঞ্চলে এক সময় শাসন করতেন মুজাফফরুদ্দীন কুকুবুরী, বীর সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর আত্মীয়, যাঁর হৃদয়ে নবীপ্রেম এমন গভীর ছিল যে তিনি প্রতিবছর গোটা এক মাস ধরে আনন্দোৎসব সাজাতেন কেবল নবীজির জন্মদিন উপলক্ষে। মশাল হাতে মিছিল বেরোত রাতের অন্ধকার চিরে, কোরবানির পশু জবাই হতো, মানুষ ভুলে যেত দৈনন্দিন জীবনের ক্লান্তি, আর শাসক নিজেই নেমে আসতেন প্রজাদের কাতারে দাঁড়িয়ে সেই আনন্দে শামিল হতে। সেই আগুনের শিখা থেকেই যেন ছড়িয়ে পড়েছিল এক প্রেমের ভাষা, সুফি সাধকদের হাত ধরে যা পাড়ি দিয়েছিল মরুভূমি, পাহাড়, নদী পেরিয়ে গোটা মুসলিম দুনিয়ায়। যদিও এই পথ কখনো নিষ্কণ্টক ছিল না, কিছু আলেম একে বিদআত বলে আপত্তি তুলেছেন বরাবর, কারণ নবীজি নিজে বা তাঁর সাহাবিরা এভাবে দিনটি উদযাপন করেননি, আর অন্যপক্ষ বলেছেন ভালোবাসার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম হয় না, হৃদয় যেভাবে প্রকাশ চায় সেভাবেই তা প্রকাশ পাওয়া উচিত। এই বিতর্ক আজও থামেনি, তবে বাংলাদেশের মাটিতে এসে এই ভালোবাসা এক অন্যরকম রূপ নিয়েছে, রাষ্ট্র নিজেই যাকে ছুটির দিন ঘোষণা করে সম্মান জানিয়েছে।

বাংলায় এই শব্দটা, মিলাদ, এসেছে ফারসির হাত ধরে, আরবি থেকে সরাসরি নয়, অথচ দুই ভাষাতেই এর অর্থ একটাই, জন্মমুহূর্ত। কিন্তু বাংলার মুসলমানের কাছে এই দিনটা শুধু জন্মের নয়, এতে মিশে আছে বিদায়ের বেদনাও, কারণ কথিত আছে নবীজি একই তারিখে পৃথিবীতে এসেছিলেন আর একই তারিখে পৃথিবী ছেড়ে গিয়েছিলেন। তাই এই দিনের রঙে আনন্দ আর বিষাদ একসঙ্গে মিশে থাকে, রোজার ঈদ বা কোরবানির ঈদের নিখাদ উৎসবের চেয়ে অনেকটা আলাদা এক অনুভূতি। উপমহাদেশে সংগঠিত মিছিলের প্রথম স্মৃতি মেলে লাহোরের রাস্তায়, বিশ শতকের তিরিশের দশকে, কিন্তু বাংলাদেশে এই ভালোবাসা যে বিশাল জনসমুদ্রে রূপ নেবে, সেই ইতিহাস লেখা হবে ঢাকায় নয়, লেখা হবে চট্টগ্রামের মাটিতে।

সেই গল্পের শুরু ১৯৭৪ সালে, স্বাধীনতার ক্ষত তখনও শুকায়নি, দেশ তখনও যুদ্ধবিধ্বস্ত এক ভূখণ্ড থেকে নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টায়। ঠিক সেই সময়ে বালুয়ার দীঘি খানকা সংলগ্ন কাদেরিয়া সৈয়দিয়া তৈয়্যবিয়া থেকে আনজুমান-ই রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট বের করেছিল বাংলাদেশের প্রথম জশনে জুলুস, ছোট্ট এক মিছিল, মুষ্টিমেয় কিছু ভক্তের পায়ের ছাপ, যাদের কেউ তখন কল্পনাও করেনি এই পথচলা একদিন লাখো মানুষের ঢলে পরিণত হবে। পীর সৈয়দ মোহাম্মদ তৈয়্যব শাহ, পাকিস্তানের চিরিকোট দরবার শরীফ থেকে এসে, নিজের হাতে এই ছোট্ট শিখাটাকে বড় করে তুলেছিলেন এক দশক ধরে, তাঁর প্রয়াণের পর ছেলে সৈয়দ মুহাম্মদ তাহের শাহ সেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন ১৯৮৬ সাল থেকে, আজও যিনি সেই একই ভালোবাসার মশাল বয়ে বেড়াচ্ছেন। চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে একই পরিবারের হাতে এই আয়োজনের নেতৃত্ব থাকা যেন এক নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞার মতো, দেশে সরকার বদলেছে, রাজনীতির রং বদলেছে বারবার, কিন্তু এই মিছিলের হৃদয় বদলায়নি। আর কী আশ্চর্য, এই ভালোবাসার ভাষা এখানেই থেমে থাকেনি, চট্টগ্রামের এই আঙিনা থেকে যেন উপচে পড়ে ছড়িয়ে গেছে দেশের অন্য শহরেও, ঢাকা থেকে যা সচরাচর ঘটে তার উল্টো স্রোতে, রাজধানী নয়, বন্দরনগরীই এখানে দিয়েছে পথের দিশা।

এই মিছিলের পথটাও যেন নিজেই একটা তীর্থযাত্রা হয়ে উঠেছে বছরের পর বছর ধরে। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই শোলকবহরের আলমগীর খানকা শরীফের সামনে জমতে শুরু করে মানুষ, তারপর সকাল আটটায় সেই স্রোত এগিয়ে চলে বিবিরহাটের দিকে, মির্জাপুল, কাতালগঞ্জ, চকবাজারের সরু গলি পেরিয়ে, প্যারেড ময়দানের বিশাল খোলা মাঠ ছুঁয়ে, চট্টগ্রাম কলেজের সামনে দিয়ে, খাস্তগীর স্কুল, আসকার দীঘির পাড় ধরে, কাজীর দেউড়ি হয়ে জিইসি মোড়ের কোলাহলে মিশে গিয়ে থামে মুরাদপুরে, তারপর আবার সেই একই পথ ধরে ফিরে আসে যেখান থেকে শুরু হয়েছিল। এই পথ যেন এক সুতোয় বেঁধে দেয় পুরনো শহরের ঘুপচি গলি আর নতুন শহরের চওড়া সড়ককে, অতীত আর বর্তমানকে, যেন চট্টগ্রাম নিজের সমস্ত ইতিহাস এক লহমায় হেঁটে পার হয়ে যায়।

এই ঢলের আকার নিয়ে বলা কথাগুলো এতটাই বিশাল যে সংখ্যায় বাঁধা কঠিন, লাখো মানুষের কথা বলা হয় প্রতিবার, আর ২০২২ সালে যখন এই মিছিল তার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করল, তখন আয়োজকরা স্বপ্ন দেখেছিলেন বিশ্ব রেকর্ডের খাতায় নাম তোলার, গিনেস কর্তৃপক্ষের দুয়ারে কড়া নেড়েছিলেন এই দাবি নিয়ে যে এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় জমায়েত। সেই স্বীকৃতি আনুষ্ঠানিকভাবে হাতে এসেছে কি না তার সদুত্তর নেই, কিন্তু চট্টগ্রামের মানুষের হৃদয়ে এই নিয়ে কোনো সংশয় নেই, প্রতিবার তারা নতুন করে বলে ওঠে, এই মিছিল পৃথিবীতে অতুলনীয়।

তবে এত বড় ভালোবাসার স্রোতকে বইয়ে নিয়ে যাওয়া সহজ কাজ নয়, আর চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক অতীত মনে করিয়ে দেয়, এই ভালোবাসার আগুন কখনো কখনো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারে। হাটহাজারীতে একটা সামান্য ফেসবুক পোস্ট থেকে দাউদাউ করে জ্বলে উঠেছিল সংঘাত, জশনে জুলুসের সমর্থক আর মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যে, শতাধিক মানুষ আহত হয়েছিলেন সেই রাতে, প্রশাসনকে জারি করতে হয়েছিল ১৪৪ ধারা। এই ঘটনা যেন এক তিক্ত মনে করিয়ে দেওয়া, ভালোবাসা আর উত্তেজনা একই শহরের বাতাসে পাশাপাশি বাস করে, আর যত বড় হয় এই জনস্রোত, ততই বাড়ে তার ভেতরের ঝুঁকি, ততই কঠিন হয় শহরের প্রশাসনের জন্য একে নিরাপদে পথ চলতে দেওয়া।

তবু, বছর ঘুরে এলে আবার সেই একই পথে জেগে ওঠে চট্টগ্রাম। খানকার এক ছোট্ট দরজা থেকে যাত্রা শুরু করা এই মিছিল আজ শহরের নিজের গল্প হয়ে উঠেছে, তার রক্তে মিশে গেছে, তার অলিগলির স্মৃতিতে খোদাই হয়ে আছে। প্রতিবছর এই একটা দিনে বন্দরনগরী তার সমস্ত ব্যস্ততা ভুলে গিয়ে হেঁটে চলে এক অদৃশ্য ভালোবাসার পিছু পিছু, আর হয়তো এখানেই লুকিয়ে আছে আসল উত্তর, কেন এই শহরই হয়ে উঠল জুলুসের শহর। সংখ্যা দিয়ে এই ভালোবাসা মাপা যায় না, কেবল অনুভব করা যায়, যেভাবে চট্টগ্রামের প্রতিটি রাস্তা প্রতিবছর একই দিনে নতুন করে অনুভব করে তার নবীপ্রেম।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;