চট্টগ্রামের আধ্যাত্মিক আকাশের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র, অলিয়ে কামেল ‘খাজা-এ-বাঙাল’ হযরত খাজা কালু শাহ্ ইয়ামেনী (রহ.)-এর পবিত্র বার্ষিক ওরশ মোবারক যথাযথ ভাবগাম্ভীর্য ও বর্ণাঢ্য আয়োজনে সলিমপুরের কালু শাহ্ নগরস্থ মাজার প্রাঙ্গণে সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার (২৪ জুন) পবিত্র ৮ই মহররম ওরশ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত হাজার হাজার ভক্ত-আশেকানের সমাগমে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

ভোর থেকেই মাজার প্রাঙ্গণে শুরু হয় দিনব্যাপী বিশেষ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক কর্মসূচি। যার মধ্যে ছিল—বাদ ফজর খতমে কোরআন ও খতমে গাউছিয়া, বাদ জোহর হামদ-নাত ও ক্বেরাত মাহফিল, এবং বাদ মাগরিব বিশেষ জিকির-আজকার ও তসবিহ পাঠ। বাদ এশা ওরশ উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ আলোচনা সভা ও মিলাদ মাহফিলে দেশের বরেণ্য ওলামায়ে কেরাম ও পীর-মাশায়েখগণ মহান এই সাধকের জীবন ও কর্মের ওপর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা পেশ করেন। সবশেষে দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করা হয়।
ওরশ মোবারকের এ বিশেষ মাহফিলে মাগরিবের পর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মাহফিল সঞ্চালনা করেন হযরত খাজা কালু শাহ্ (রহ.) জামে মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা মুফতি মোহাম্মদ মাসুদ আলম আল কাদেরী এবং তাফসির ও মোনাজাত পরিচালনা করেন হযরত খাজা কালু শাহ্ (রহ.) সুন্নিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মোহাম্মদ আবুল কালাম আমীরী। এছাড়া রাত ১০টা পর্যন্ত তাফসির পেশ করেন মাওলানা সৈয়দ মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, মাওলানা মোহাম্মদ মহিউদ্দিন নেহারী এবং মাওলানা মোহাম্মদ মজিব উদ্দিন। রাত ১২টা থেকে ফজর পর্যন্ত মাহফিল সঞ্চালনা করেন মাওলানা মুফতি মোহাম্মদ মাসুদ আলম আল কাদেরী। উক্ত সময়ে তাফসির পেশ করেন মাওলানা মোহাম্মদ ফখরউদ্দিন আল কাদেরী, মাওলানা মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন এবং মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল হামিদ কালুবী। শেষে ফজরের পর মিলাদ-কিয়াম ও আখেরী মোনাজাত পরিচালনা করেন মাওলানা মোহাম্মদ ফখরউদ্দিন আল কাদেরী।
ওরশ পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ও সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মোরছালিন জানান, ওরশকে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল এবং ভক্তদের নিরাপত্তা ও যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবীরা নিয়োজিত ছিলেন।
মাজার কমপ্লেক্সের মোতাওয়াল্লি আলহাজ্ব মোঃ সিরাজুদ্দৌলা সওদাগর ওরশে আগত সকল ভক্ত ও দর্শনার্থীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, প্রতি বছর ৮ই মহররম তাঁর পবিত্র ওরশে মহান এই অলির রূহানী ফয়েজ হাসিলের আশায় যে মিলনমেলা গড়ে ওঠে, তা আমাদের অন্তরে সুফিবাদের প্রকৃত আলো জ্বালিয়ে দিতে সহায়তা করে।

হযরত খাজা কালু শাহ্ ইয়ামেনী (রহ.) আধ্যাত্মিক সাধক
চট্টগ্রামের আধ্যাত্মিক আকাশের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং ‘খাজা-এ-বাঙাল’ হিসেবে সুপরিচিত হযরত খাজা কালু শাহ্ ইয়ামেনী (রহ.) ছিলেন একজন মহান অলিয়ে কামেল ও কামেলে মোকাম্মেল পীর। তাঁর জন্ম ও প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে ঐতিহাসিক তথ্যের চেয়ে তাঁর আধ্যাত্মিক প্রভাব ও কারামতের বয়ানই ইতিহাসে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
উৎপত্তি ও আগমণ: কথিত আছে, তিনি সুদূর আরব অঞ্চলের ইয়ামেন থেকে ইসলামের সুমহান আদর্শ প্রচারের উদ্দেশ্যে বাংলায় পদার্পণ করেন। নিজের প্রচারবিমুখতা এবং ইবাদত-বন্দেগিতে মগ্ন থাকার কারণে তিনি সমসাময়িক বহু আধ্যাত্মিক সাধকের চেয়েও স্বতন্ত্র ছিলেন। চট্টগ্রাম তথা সীতাকুণ্ডের সলিমপুরের মাটিকে তিনি তাঁর কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।
আধ্যাত্মিক মাকাম ও প্রভাব: হযরত খাজা কালু শাহ্ (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক উচ্চমর্যাদা সম্পর্কে ইমাম শেরে বাংলা হযরত আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ আজিজুল হক (রহ.) তাঁর ‘দিওয়ান-ই আযীয’ গ্রন্থে সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। তাঁকে ‘কাশফ্ ও কারামাতের ধারক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বরকতময় উপস্থিতি ও দোয়া সলিমপুরবাসীকে দীর্ঘকাল ধরে আধ্যাত্মিক শান্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য প্রদান করে আসছে।
শিক্ষা ও সমাজসেবা: তিনি কেবল একজন আধ্যাত্মিক সাধকই ছিলেন না, বরং জ্ঞানচর্চার প্রসারেও তিনি ছিলেন অবিচল। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বা তাঁর নামে পরিচালিত ‘হযরত খাজা কালু শাহ্ (রহ.) সুন্নিয়া ফাজিল মাদরাসা’সহ বিভিন্ন দ্বীনি ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান অত্র এলাকায় ইসলামি শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধ প্রচারে আজও অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।
রূহানী প্রভাব: প্রতি বছর ৮ই মহররম তাঁর পবিত্র ওরশ উপলক্ষে দেশ-বিদেশের হাজারো ভক্ত-অনুরাগী সীতাকুণ্ডের সলিমপুরস্থ মাজার শরীফে সমবেত হন। তাঁর মাযার শরীফকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই আধ্যাত্মিক আবহ আজও মুমিন হৃদয়ে আল্লাহর ভালোবাসা ও রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণের প্রেরণা যোগায়।
তিনি আজও ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে ‘হাজত-এ-রওয়া’ (প্রয়োজন পূরণকারী) ও ‘মুশকিল-কুশা’ হিসেবে সমাদৃত। এই মহান অলির উছিলায় অগণিত মানুষ আধ্যাত্মিক ফয়েজ ও বরকত লাভ করছেন।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;
মেজবাহ উদ্দীন খালেদ ।। 



















