০৭:৫৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লোনা পানির আঘাতে সীতাকুণ্ডের কুমিরা-গুপ্তছড়া ব্রিজে ফাটল: সন্দ্বীপবাসীর পারাপারে চরম ঝুঁকি, ঘাট বন্ধের আশঙ্কা

চট্টগ্রামের মূল ভূখণ্ড সীতাকুণ্ড থেকে দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে যাতায়াত ও পণ্য পারাপারের একমাত্র ভরসা নৌপথ। তবে এই নৌপথের সবচেয়ে ব্যস্ততম ও গুরুত্বপূর্ণ কুমিরা-গুপ্তছড়া ঘাটের সমুদ্রমুখী দীর্ঘ ব্রিজটি বর্তমানে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে কোনো বড় ধরনের সংস্কার বা মেরামত না হওয়ায় জোয়ারের উত্তাল ঢেউ এবং লোনা পানির অনবরত আঘাতে ব্রিজের অধিকাংশ স্থানে মারাত্মক ফাটল ও ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে করে প্রতিদিন জানমালের চরম ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন হাজার হাজার দ্বীপবাসী।

একসময় সীতাকুণ্ড উপজেলার নৌপথে ৬টি সচল ঘাটের মাধ্যমে ব্যবসায়ী, চাকুরিজীবী ও সাধারণ মানুষ চলাচল করতেন। কিন্তু কালক্রমে নাব্যতা সংকট ও খালগুলো নৌ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় আমির মোহাম্মদ ঘাট, মুরাদপুর ঘাট, বাড়বকুন্ড ঘাট ও সীতাকুণ্ড ঘাট চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে একমাত্র বিকল্প হিসেবে কুমিরা-গুপ্তছড়া ও বাঁশবাড়িয়া ঘাটের ওপর দ্বীপবাসীর চাপ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কুমিরা-গুপ্তছড়া ঘাটে যাত্রী সুবিধার্থে নানামুখী উন্নয়ন কাজ করে জেলা পরিষদ ও বিআইডব্লিউটিএ। এর অংশ হিসেবে কাদা-মাটির বিড়ম্বনা থেকে যাত্রীদের মুক্তি দিতে ১৯১১ সালে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দে সমুদ্রের বুক চিরে ৬৫০ মিটার দীর্ঘ একটি সংযোগ ব্রিজ (Jetty Bridge) স্থাপন করা হয়েছিল।

দীর্ঘদিন ধরে এই ব্রিজের ওপর দিয়ে সন্দ্বীপের ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, শিশু, বয়োবৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীরা স্বাচ্ছন্দ্যে নৌযানে ওঠানামা করে আসছিলেন। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে লোনা মিশ্রিত পানির প্রবল জোয়ার ও ঢেউয়ের ধাক্কায় ব্রিজের নিচের পিলার ও বিভিন্ন অংশ ক্ষয়ে গিয়ে ধসে পড়ছে।

স্থানীয় ভুক্তভোগী যাত্রীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “পূর্বে এই ঘাটে চলাচলের সময় কাদা-মাটিতে শরীর মাখামাখি হয়ে যেত। ব্রিজটি হওয়ার পর সেই নরকযাতনা থেকে মুক্তি মিলেছিল। কিন্তু এখন ব্রিজের বিভিন্ন অংশে যে বড় বড় ফাটল ও ভাঙন ধরেছে, তাতে যেকোনো মুহূর্তে এটি ধসে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আর ব্রিজটি ভেঙে পড়লে সন্দ্বীপের লাখ লাখ মানুষকে আবার সেই পুরনো আদিম দুর্ভোগের কবলে পড়তে হবে।”

এদিকে, প্রায় ২০০ কোটি টাকারও অধিক অর্থ ব্যয়ে পার্শ্ববর্তী বাঁশবাড়িয়া ফেরী ঘাটকে আধুনিক ও ফেরী চলাচলের সম্পূর্ণ উপযোগী করায় ওই রুটে ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকুরিজীবীদের যাতায়াত ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বাঁশবাড়িয়া ঘাট দিয়ে দৈনিক গড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার মানুষ এবং বিপুলসংখ্যক মালবাহী ও যাত্রীবাহী পরিবহন পারাপার হচ্ছে।

বিপরীতে, আর্থিক বরাদ্দের অভাবে কুমিরা-গুপ্তছড়া ঘাটে এক ধরণের অচল অবস্থা দেখা দিয়েছে। কুমিরা ঘাটের জরাজীর্ণ ও নাজুক ব্রিজের কারণে এই রুটে আগের তুলনায় যাত্রী সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে বলে জানিয়েছেন ঘাট পরিচালক নয়ন। তিনি বলেন, “কুমিরা-গুপ্তছড়া ঘাট দ্বীপবাসীর চলাচলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী পথ। এখনো দৈনিক গড়ে ২ থেকে ৩ হাজার যাত্রী এই ঘাট দিয়ে আসা-যাওয়া করছেন। ব্রিজটির কারণে কাদা মাড়িয়ে নৌযানে ওঠার দুর্ভোগ এখন আর নেই। কিন্তু অতি দ্রুত এই ব্রিজটি পুনর্নির্মাণ বা সংস্কার না করলে ঘাটটি যেকোনো সময় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।”

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বিআইডব্লিউটিএ’র (BIWTA) প্রকল্প পরিচালক আশরাফ উদ্দিন জানান, ব্রিজের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কাজ শেষ করা হয়েছে। তবে ব্রিজে নতুন করে ফাটল ধরার বিষয়ে তাঁদের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। একই সাথে তিনি উল্লেখ করেন, কুমিরা ব্রিজের উন্নয়নে আপাতত নতুন কোনো বড় প্রকল্প বা কাজ হাতে নেওয়া হবে না।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, কর্তৃপক্ষের এমন উদাসীনতা অব্যাহত থাকলে যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে ৬৫০ মিটারের এই লাইফলাইন ব্রিজটি, যা সন্দ্বীপ ও সীতাকুণ্ডের অর্থনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে তুলবে। জরুরি ভিত্তিতে এই ব্রিজ পুনর্নির্মাণে সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন দ্বীপবাসী।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;

ট্যাগ
জনপ্রিয় সংবাদ

‘অ্যামেজিং চট্টগ্রাম’: আন্তর্জাতিক মানের নগর গড়তে সিপিডিএলের মহাপরিকল্পনা

লোনা পানির আঘাতে সীতাকুণ্ডের কুমিরা-গুপ্তছড়া ব্রিজে ফাটল: সন্দ্বীপবাসীর পারাপারে চরম ঝুঁকি, ঘাট বন্ধের আশঙ্কা

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫:৫৩:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

চট্টগ্রামের মূল ভূখণ্ড সীতাকুণ্ড থেকে দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে যাতায়াত ও পণ্য পারাপারের একমাত্র ভরসা নৌপথ। তবে এই নৌপথের সবচেয়ে ব্যস্ততম ও গুরুত্বপূর্ণ কুমিরা-গুপ্তছড়া ঘাটের সমুদ্রমুখী দীর্ঘ ব্রিজটি বর্তমানে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে কোনো বড় ধরনের সংস্কার বা মেরামত না হওয়ায় জোয়ারের উত্তাল ঢেউ এবং লোনা পানির অনবরত আঘাতে ব্রিজের অধিকাংশ স্থানে মারাত্মক ফাটল ও ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে করে প্রতিদিন জানমালের চরম ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন হাজার হাজার দ্বীপবাসী।

একসময় সীতাকুণ্ড উপজেলার নৌপথে ৬টি সচল ঘাটের মাধ্যমে ব্যবসায়ী, চাকুরিজীবী ও সাধারণ মানুষ চলাচল করতেন। কিন্তু কালক্রমে নাব্যতা সংকট ও খালগুলো নৌ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় আমির মোহাম্মদ ঘাট, মুরাদপুর ঘাট, বাড়বকুন্ড ঘাট ও সীতাকুণ্ড ঘাট চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে একমাত্র বিকল্প হিসেবে কুমিরা-গুপ্তছড়া ও বাঁশবাড়িয়া ঘাটের ওপর দ্বীপবাসীর চাপ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কুমিরা-গুপ্তছড়া ঘাটে যাত্রী সুবিধার্থে নানামুখী উন্নয়ন কাজ করে জেলা পরিষদ ও বিআইডব্লিউটিএ। এর অংশ হিসেবে কাদা-মাটির বিড়ম্বনা থেকে যাত্রীদের মুক্তি দিতে ১৯১১ সালে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দে সমুদ্রের বুক চিরে ৬৫০ মিটার দীর্ঘ একটি সংযোগ ব্রিজ (Jetty Bridge) স্থাপন করা হয়েছিল।

দীর্ঘদিন ধরে এই ব্রিজের ওপর দিয়ে সন্দ্বীপের ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, শিশু, বয়োবৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীরা স্বাচ্ছন্দ্যে নৌযানে ওঠানামা করে আসছিলেন। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে লোনা মিশ্রিত পানির প্রবল জোয়ার ও ঢেউয়ের ধাক্কায় ব্রিজের নিচের পিলার ও বিভিন্ন অংশ ক্ষয়ে গিয়ে ধসে পড়ছে।

স্থানীয় ভুক্তভোগী যাত্রীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “পূর্বে এই ঘাটে চলাচলের সময় কাদা-মাটিতে শরীর মাখামাখি হয়ে যেত। ব্রিজটি হওয়ার পর সেই নরকযাতনা থেকে মুক্তি মিলেছিল। কিন্তু এখন ব্রিজের বিভিন্ন অংশে যে বড় বড় ফাটল ও ভাঙন ধরেছে, তাতে যেকোনো মুহূর্তে এটি ধসে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আর ব্রিজটি ভেঙে পড়লে সন্দ্বীপের লাখ লাখ মানুষকে আবার সেই পুরনো আদিম দুর্ভোগের কবলে পড়তে হবে।”

এদিকে, প্রায় ২০০ কোটি টাকারও অধিক অর্থ ব্যয়ে পার্শ্ববর্তী বাঁশবাড়িয়া ফেরী ঘাটকে আধুনিক ও ফেরী চলাচলের সম্পূর্ণ উপযোগী করায় ওই রুটে ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকুরিজীবীদের যাতায়াত ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বাঁশবাড়িয়া ঘাট দিয়ে দৈনিক গড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার মানুষ এবং বিপুলসংখ্যক মালবাহী ও যাত্রীবাহী পরিবহন পারাপার হচ্ছে।

বিপরীতে, আর্থিক বরাদ্দের অভাবে কুমিরা-গুপ্তছড়া ঘাটে এক ধরণের অচল অবস্থা দেখা দিয়েছে। কুমিরা ঘাটের জরাজীর্ণ ও নাজুক ব্রিজের কারণে এই রুটে আগের তুলনায় যাত্রী সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে বলে জানিয়েছেন ঘাট পরিচালক নয়ন। তিনি বলেন, “কুমিরা-গুপ্তছড়া ঘাট দ্বীপবাসীর চলাচলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী পথ। এখনো দৈনিক গড়ে ২ থেকে ৩ হাজার যাত্রী এই ঘাট দিয়ে আসা-যাওয়া করছেন। ব্রিজটির কারণে কাদা মাড়িয়ে নৌযানে ওঠার দুর্ভোগ এখন আর নেই। কিন্তু অতি দ্রুত এই ব্রিজটি পুনর্নির্মাণ বা সংস্কার না করলে ঘাটটি যেকোনো সময় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।”

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বিআইডব্লিউটিএ’র (BIWTA) প্রকল্প পরিচালক আশরাফ উদ্দিন জানান, ব্রিজের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কাজ শেষ করা হয়েছে। তবে ব্রিজে নতুন করে ফাটল ধরার বিষয়ে তাঁদের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। একই সাথে তিনি উল্লেখ করেন, কুমিরা ব্রিজের উন্নয়নে আপাতত নতুন কোনো বড় প্রকল্প বা কাজ হাতে নেওয়া হবে না।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, কর্তৃপক্ষের এমন উদাসীনতা অব্যাহত থাকলে যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে ৬৫০ মিটারের এই লাইফলাইন ব্রিজটি, যা সন্দ্বীপ ও সীতাকুণ্ডের অর্থনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে তুলবে। জরুরি ভিত্তিতে এই ব্রিজ পুনর্নির্মাণে সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন দ্বীপবাসী।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;