স্বাস্থ্য সচেতনতার অংশ হিসেবে যে আখের লাল চিনি মানুষ চড়া দামে কিনে খাচ্ছেন, বাজারে তা নিয়ে চলছে ভয়ংকর প্রতারণা। সাধারণ পরিশোধিত সাদা চিনির সাথে কাপড়ের (টেক্সটাইল) ক্ষতিকর রং ও রাসায়নিক কেমিক্যাল মিশিয়ে তা ‘আখের লাল চিনি’ হিসেবে বাজারে বিক্রি করছে একটি অসাধু সিন্ডিকেট চক্র। সরকারি প্রতিষ্ঠানের মোড়ক নকল করে তৈরি এই চিনি চায়ের কাপ থেকে শুরু করে চলে যাচ্ছে শিশুর মুখেও। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ভেজাল চিনি আসলে এক ধরণের ‘স্লো পয়জন’ বা ধীর গতির বিষ; যা দীর্ঘদিন খেলে ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের মতো মারাত্মক রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সম্প্রতি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন বাজার তদারকি সংস্থার অভিযানে এই জালিয়াতির চিত্র হাতেনাতে ধরা পড়েছে।
যেভাবে চলছে জালিয়াতি
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনসহ দেশের নামী ব্র্যান্ডগুলোর মোড়ক হুবহু নকল করে এসব চিনি বাজারে ছাড়া হচ্ছে। সাধারণ সাদা চিনিকে টেক্সটাইল রং দিয়ে লাল বা গাঢ় বাদামি করা হচ্ছে। চিনির দানাগুলোকে আসল আখের চিনির মতো আঠালো ও দলা পাকানো দেখাতে ব্যবহার করা হচ্ছে বিশেষ রাসায়নিক কেমিক্যাল। অনুমোদন না থাকলেও প্যাকেটের গায়ে অবৈধভাবে বিএসটিআই-এর লোগো ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এসব প্যাকেটের মোড়কে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কোনো সুনির্দিষ্ট ঠিকানা থাকে না।
কেজিতে ৯০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি লাভ
খুচরা বাজারে সাধারণ সাদা চিনি ১০০ থেকে ১১০ টাকায় মিললেও, এই কৃত্রিম লাল চিনি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে। অথচ প্যাকেটের গায়ে সরকারি রেট অনুযায়ী খুচরা মূল্য লেখা থাকে ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে ৭০ থেকে ৯০ টাকা বাড়তি মুনাফা লুটছে এই চক্র, যার বিনিময়ে মানুষের শরীরে ঢুকে যাচ্ছে ক্যানসারের মতো ক্ষতিকর উপাদান।
মানবদেহে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদ বলেন: “কৃত্রিম লাল রং তৈরিতে প্রায়ই ‘এরিথ্রোসিন’ বা ‘রেড ডাই-৩’ নামক উপাদান ব্যবহৃত হয়, যা অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণ করলে থাইরয়েড টিউমারসহ বিভিন্ন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। এছাড়া এই কেমিক্যাল কিডনি ও লিভারের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। কৃত্রিম রঙের প্রভাবে শিশুদের মধ্যে অতি-সক্রিয়তা বা মনোযোগের অভাব দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন এই ভেজাল চিনি গ্রহণে উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ, ত্বক ও হজম প্রক্রিয়ায় মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।”
ক্ষুব্ধ সাধারণ ভোক্তা ও খুচরা ব্যবসায়ীরা
রাজধানীর জিনজিরা কাঁচাবাজারে ক্রেতা মো. হেলাল বলেন, “আমরা সাধারণ ভোক্তারা স্বাভাবিকভাবে দেখে আসল-নকল বুঝব না। স্বাস্থ্যের কথা ভেবে বেশি টাকা দিয়ে বিষ কিনে নিচ্ছি পরিবারের জন্য। এই অসাধু কাজ বন্ধে সরকারের কঠোর নজরদারি করা দরকার।”
একই বাজারের মুদি ব্যবসায়ী সাক্কুর আলম জানান, বাজারে এখন সরকারি লাল চিনির সরবরাহ নেই বললেই চলে। অথচ প্রায় সব দোকানেই প্যাকেটজাত লাল চিনি পাওয়া যাচ্ছে। এগুলো মূলত নকল ও কৃত্রিম রং মেশানো চিনি।
ক্যাব ও ভোক্তা অধিকারের হুঁশিয়ারি
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “অসাধুরা সরাসরি মানুষ মেরে ফেলার মতো কাজ করলেও সামান্য জরিমানা দিয়ে ছাড় পেয়ে যাচ্ছে। এদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা দরকার।”
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মন্ডল বলেন, “সাদা চিনিতে টেক্সটাইল রং মিশিয়ে লাল চিনি হিসেবে বিক্রি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এসব অবৈধ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। মূল উৎপাদনকারীদের ধরে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হবে।”
এদিকে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, করপোরেশনের লাল চিনি নির্দিষ্ট ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে এবং ডিলারদের মাধ্যমে খোলা বস্তায় বিক্রি করা হয়। অন্য কোনো বেসরকারি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি করপোরেশনের পণ্য বা নাম ব্যবহার করে প্যাকেটজাত করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;




















