ঋতুরাজ বসন্তের শেষ দিন আজ। একইসাথে পঞ্জিকার পাতা থেকে আজ বিদায় নিচ্ছে ১৪৩২ বঙ্গাব্দ। আজ চৈত্র সংক্রান্তি। বাঙালির বারো মাসের তেরো পার্বণের অন্যতম এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। কাল ভোরের সূর্য নতুন বারতা নিয়ে আসবে, শুরু হবে নতুন বছর—১৪৩৩। এই দিনটি কেবল একটি বর্ষপঞ্জির সমাপ্তি নয়; বরং এটি বাঙালির আত্মিক শুদ্ধি, অতীতের জীর্ণতা ও ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবনকে সাজানোর এক শাশ্বত মুহূর্ত।
এক বছরের ক্লান্তি মুছে ফেলার দিন
চৈত্র সংক্রান্তি মানেই নতুনের জন্য জায়গা করে দেওয়া। বাঙালির বিশ্বাস, বছরের শেষ দিনে সব গ্লানি আর ব্যর্থতাকে চৈত্র শেষের ঝরো হাওয়ায় উড়িয়ে দিতে হয়। তবেই না নতুন বছর পূর্ণতা পায়। গ্রাম থেকে শহর—সর্বত্রই এই দিনটি পালিত হয় এক অন্তর্লীন প্রেরণা থেকে। আধুনিক নাগরিক জীবনে উৎসবের ধরণ বদলালেও এর মর্মকথা আজও অমলিন রয়ে গেছে। মানুষ আজ উন্মুখ হয়ে আছে আগামীর সোনালী ভোরের প্রত্যাশায়।
আচার-অনুষ্ঠানে বৈচিত্র্য ও লোকজ ঐতিহ্য
চৈত্র সংক্রান্তি পালনের আচারে এলাকাভেদে ভিন্নতা থাকলেও এর মূল সুর এক—ঐতিহ্যের অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ। অতীতে চৈত্র সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ জনপদে গাজন উৎসব, চড়ক পূজা আর মেলার আয়োজন হতো। সময়ের বিবর্তনে এটি এখন এক সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালি আজ এই উৎসবে শামিল।
পাহাড়ি জনপদে চৈত্র সংক্রান্তি এক বিশেষ মহিমা নিয়ে হাজির হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা ‘বৈসাবি’ উৎসবের মাধ্যমে তিন দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য আয়োজনে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ পালন করছে। তাদের জলকেলি এবং ঐতিহ্যবাহী নাচ-গান এই দিনটিকে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে, যা বাঙালির সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।
নগরের প্রস্তুতি ও উৎসবের আমেজ
বন্দরনগরী চট্টগ্রামে চৈত্র সংক্রান্তি ঘিরে নেওয়া হয়েছে নানা কর্মসূচি। নগরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন আজ সন্ধ্যায় বিদায়ী বছরের সূর্যকে বিদায় জানাতে এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
আজ রাত ৮টায় নগরের বৌদ্ধ মন্দির সড়কে শত শিল্পীর তুলিতে আঁকা হবে বিশালাকার আলপনা। ‘আলপনার রঙে নববর্ষ আবাহন’ শীর্ষক এই আয়োজনে মেতে উঠবে গোটা নগরী।
শিল্পকলা একাডেমি এবং সিআরবি শিরীষ তলায় চলছে শেষ মুহূর্তের মহড়া। পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্য তৈরি মুখোশ আর লোকজ সরঞ্জামে সেজে উঠেছে চারু চত্বর।
নতুন প্রত্যয়ে আগামীর পথচলা
আজকের সূর্যাস্তের সাথে সাথে ইতিহাসের পাতায় জমা হবে ১৪৩২ বঙ্গাব্দের সব পাওয়া-না পাওয়া। ফেলে আসা বছরের শোক, তাপ আর সংকটের স্মৃতি মুছে ফেলে বাঙালি আজ গাইবে জীবনের গান। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, নতুন বছর যেন বয়ে আনে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা, আর প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয় শান্তির বার্তা।
জীর্ণ পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে বাঙালির এই উৎসবমুখরতা প্রমাণ করে—বাঙালি জাতি সবসময়ই আশাবাদী এবং প্রাণের স্পন্দনে উজ্জীবিত। কাল ভোরে রমনার বটমূল থেকে চট্টগ্রামের শিরীষ তলা—সবখানে ধ্বনিত হবে নতুনের জয়গান।
শুভ চৈত্র সংক্রান্তি!
খালেদ / পোস্টকার্ড ;



















