চট্টগ্রামের দুঃখ হিসেবে পরিচিত কালুরঘাট কর্ণফুলী নদীর ওপর নতুন রেল-কাম-সড়ক সেতু নির্মাণের প্রক্রিয়া এক বছরেরও বেশি সময় ধরে থমকে আছে। গত বছরের মার্চ মাসে বিদেশী পরামর্শক (কনসালটেন্ট) নিয়োগের টেন্ডার আহ্বান করা হলেও দীর্ঘ ১২ মাসেও সেই প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলে নকশা প্রণয়ন থেকে শুরু করে মূল সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
পরামর্শক নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা
রেল ভবন ও প্রকল্প পরিচালকের দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১৭ মার্চ কালুরঘাট সেতুর পরামর্শক নিয়োগের টেন্ডার আহ্বান করা হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার ইডিসিএফ (EDCF) ও ইডিপিএফ (EDPF)-এর ঋণ সহায়তায় নির্মিতব্য এই প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠানকেই পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে।
দাতা সংস্থার দেওয়া ২২টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা থেকে ৮টি গ্রুপ (জয়েন্ট ভেঞ্চার) দরপত্র দাখিল করে। যাচাই-বাছাই শেষে ৫টি প্রতিষ্ঠানের একটি ‘শর্ট লিস্ট’ তৈরি করে দক্ষিণ কোরিয়ার কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হলেও এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন মেলেনি। অথচ গত বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই এই নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা ছিল।
প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা ও ব্যয়
বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মুহাম্মদ কুদরত-ই-খুদা জানিয়েছেন, কনসালটেন্ট নিয়োগের পরই সেতুর চূড়ান্ত ডিজাইন বা নকশা সম্পন্ন হবে। এরপরই শুরু হবে মূল সেতুর টেন্ডার প্রক্রিয়া।
১১ হাজার ৫৬০ কোটি ৭৭ লাখ টাকার এই মেগা প্রকল্পে দক্ষিণ কোরিয়া দিচ্ছে ৭ হাজার ১২৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা। বাকি ৪ হাজার ৪৩৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা বহন করবে বাংলাদেশ সরকার। ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর একনেক সভায় অনুমোদিত এই প্রকল্পটি ২০২৬ সালের শুরুর দিকে দৃশ্যমান হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সেতুর কারিগরি বৈশিষ্ট্য
প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ৭০০ মিটার দীর্ঘ এই ‘এক্সট্রা ডোজড’ টাইপ সেতুটিতে থাকবে:
- রেলপথ: একপাশে দুটি ডুয়াল গেজ রেলপথ।
- সড়কপথ: অন্যপাশে স্ট্যান্ডার্ড মানের দুই লেনের সড়ক (প্রতিটি লেন ১৮ ফুট)।
- সার্ভিস লেন: উভয় পাশে ৫ ফুট করে সার্ভিস লেন ও পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা।
- অন্যান্য: ৭টি স্প্যান (নদীর অভ্যন্তরে ৫টি), ৬.২০ কিমি রেল ভায়াডাক্ট এবং ২.৪০ কিমি সড়ক ভায়াডাক্ট।
প্রশাসনের বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য
সম্প্রতি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম এবং রেলওয়ের মহাপরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেতু এলাকা পরিদর্শন করেছেন। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) প্রকৌশলী মো. সবুক্তগীন জানান, পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়াটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং খুব শীঘ্রই এটি সম্পন্ন হবে বলে তারা আশাবাদী।
উল্লেখ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে সেতুটি যানবাহন ও ট্রেন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে পরামর্শক নিয়োগে এই দীর্ঘসূত্রতা প্রকল্পের সামগ্রিক সময়সীমার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে সবুজ সংকেত পেলেই কেবল গতি ফিরবে চট্টগ্রামবাসীর এই স্বপ্নের প্রকল্পে।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;



















