০৮:৫২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কোণঠাসা করতে সন্ত্রাসীদের ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ মিশন

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর। এক সময়কার ‘মরণফাঁদ’ খ্যাত এই জনপদকে অপরাধমুক্ত করতে গত ৯ মার্চ পরিচালিত হয়েছিল ৪ হাজার সদস্যের বিশাল এক যৌথ অভিযান। অভিযানের পর সন্ত্রাসীদের দুর্গ গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানে বসানো হয়েছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুটি বিশেষ ক্যাম্প। কিন্তু অভিযানের তিন সপ্তাহ পার হতেই সেখানে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ মানবিক ও কৌশলগত সংকট। একদিকে বিদ্যুৎ-পানি আর খাবারের তীব্র অভাব, অন্যদিকে আত্মগোপনে থাকা সন্ত্রাসীদের চোরাগোপ্তা তৎপরতায় এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরের অস্থায়ী ক্যাম্পে বর্তমানে পুলিশ ও র‌্যাবের প্রায় ২০০ জন সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। তবে গত ২৩ দিন ধরে তারা যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন, তাকে ‘মানবেতর’ বললেও কম বলা হয়। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় সেখানে পৌঁছায়নি সুপেয় পানির স্থায়ী ব্যবস্থা। পার্শ্ববর্তী পাহাড়ের ঝিরি বা বসতি থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে তাদের।

পুলিশের কয়েকজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রচণ্ড গরমে তাঁবুর নিচে থাকা যেমন যন্ত্রণাদায়ক, তেমনি রাতের আঁধারে মশার উপদ্রব আর বন্য পরিবেশের ভয়ংকর নিস্তব্ধতা তো আছেই। বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় সদস্যদের মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, ফলে পরিবারের সঙ্গেও তারা ঠিকমতো যোগাযোগ করতে পারছেন না। ভালো মানের হোটেল বা বাজার না থাকায় মানসম্মত খাবার এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থাও সেখানে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রশাসনকে মানসিকভাবে দুর্বল করতে সন্ত্রাসীরা বেছে নিয়েছে নতুন কৌশল। অভিযোগ উঠেছে, রাতের অন্ধকারে কয়েক দফায় ক্যাম্পের পানির পাইপ কেটে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা। শুধু তাই নয়, যৌথ বাহিনীর কাছে পরাজয়ের পর শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিন ও তার সহযোগীরা প্রকাশ্যে না এলেও তাদের অনুসারীরা সিএনজি চালক, সবজি বিক্রেতা কিংবা দিনমজুরের ছদ্মবেশে ক্যাম্পের চারপাশে ঘোরাঘুরি করছে। এতে প্রশাসনের প্রতিটি পদক্ষেপ বা মুভমেন্টের খবর সহজেই অপরাধীদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইয়াছিন বাহিনীর কাজী ফারুক, মো. হাছান, নুরুল হক ভান্ডারি এবং অমর ফারুকের মতো দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীরা এলাকায় কৌশলে যাতায়াত করছে। এমনকি র‌্যাব কর্মকর্তা আব্দুল মোতালেব হত্যা মামলার আসামিরাও গত ঈদের সময় এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জঙ্গল সলিমপুরের ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে নতুন মোতায়েনকৃত সদস্যদের পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় তারা স্থানীয় অপরাধীদের চিনতে হিমশিম খাচ্ছেন। অন্যদিকে, আগের বিভিন্ন অভিযানে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করা ‘সোর্স’দের ওপর সন্ত্রাসীরা অকথ্য নির্যাতন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষোদগার করায় বর্তমানে ভয়ে কেউ মুখ খুলছে না। ফলে সঠিক তথ্যের অভাবে অপরাধীদের গ্রেপ্তারে এক ধরণের স্থবিরতা বিরাজ করছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতি সমাধানে নড়েচড়ে বসেছে জেলা প্রশাসন। গত মঙ্গলবার ক্যাম্প দুটি পরিদর্শন করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান। পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক জানান, সদস্যদের কষ্ট লাঘবে দ্রুত দুটি গভীর নলকূপ বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি তাঁবুর ভোগান্তি কমাতে স্থায়ীভাবে টিনের ঘর নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “জঙ্গল সলিমপুরকে আর কোনোভাবেই সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হতে দেওয়া হবে না। যারা একজন সরকারি কর্মকর্তাকে হত্যা করার দুঃসাহস দেখিয়েছে, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে।”

বর্তমানে জঙ্গল সলিমপুরে স্কুল-মাদ্রাসা ও হাট-বাজার খোলা থাকলেও স্থানীয়দের চোখে-মুখে এখনো আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। তাদের আশঙ্কা, যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই সংকট দ্রুত সমাধান না হয় এবং ক্যাম্পগুলো গুটিয়ে নেওয়া হয়, তবে ফের পাহাড় কাটা, প্লট বাণিজ্য আর চাঁদাবাজির রাজত্ব কায়েম করবে সন্ত্রাসীরা।

উল্লেখ্য, গত ১৯ জানুয়ারি সন্ত্রাসী হামলায় র‍্যাব কর্মকর্তা আব্দুল মোতালেব নিহতের পর থেকেই এই এলাকায় উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। গত ৯ মার্চের অভিযানে ২২ জন গ্রেফতার ও বিপুল অস্ত্র উদ্ধার করা হলেও মূল হোতা ইয়াছিন এখনো পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;  

ট্যাগ
জনপ্রিয় সংবাদ

‘অ্যামেজিং চট্টগ্রাম’: আন্তর্জাতিক মানের নগর গড়তে সিপিডিএলের মহাপরিকল্পনা

জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কোণঠাসা করতে সন্ত্রাসীদের ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ মিশন

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫:৪৬:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর। এক সময়কার ‘মরণফাঁদ’ খ্যাত এই জনপদকে অপরাধমুক্ত করতে গত ৯ মার্চ পরিচালিত হয়েছিল ৪ হাজার সদস্যের বিশাল এক যৌথ অভিযান। অভিযানের পর সন্ত্রাসীদের দুর্গ গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানে বসানো হয়েছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুটি বিশেষ ক্যাম্প। কিন্তু অভিযানের তিন সপ্তাহ পার হতেই সেখানে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ মানবিক ও কৌশলগত সংকট। একদিকে বিদ্যুৎ-পানি আর খাবারের তীব্র অভাব, অন্যদিকে আত্মগোপনে থাকা সন্ত্রাসীদের চোরাগোপ্তা তৎপরতায় এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরের অস্থায়ী ক্যাম্পে বর্তমানে পুলিশ ও র‌্যাবের প্রায় ২০০ জন সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। তবে গত ২৩ দিন ধরে তারা যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন, তাকে ‘মানবেতর’ বললেও কম বলা হয়। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় সেখানে পৌঁছায়নি সুপেয় পানির স্থায়ী ব্যবস্থা। পার্শ্ববর্তী পাহাড়ের ঝিরি বা বসতি থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে তাদের।

পুলিশের কয়েকজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রচণ্ড গরমে তাঁবুর নিচে থাকা যেমন যন্ত্রণাদায়ক, তেমনি রাতের আঁধারে মশার উপদ্রব আর বন্য পরিবেশের ভয়ংকর নিস্তব্ধতা তো আছেই। বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় সদস্যদের মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, ফলে পরিবারের সঙ্গেও তারা ঠিকমতো যোগাযোগ করতে পারছেন না। ভালো মানের হোটেল বা বাজার না থাকায় মানসম্মত খাবার এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থাও সেখানে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রশাসনকে মানসিকভাবে দুর্বল করতে সন্ত্রাসীরা বেছে নিয়েছে নতুন কৌশল। অভিযোগ উঠেছে, রাতের অন্ধকারে কয়েক দফায় ক্যাম্পের পানির পাইপ কেটে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা। শুধু তাই নয়, যৌথ বাহিনীর কাছে পরাজয়ের পর শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিন ও তার সহযোগীরা প্রকাশ্যে না এলেও তাদের অনুসারীরা সিএনজি চালক, সবজি বিক্রেতা কিংবা দিনমজুরের ছদ্মবেশে ক্যাম্পের চারপাশে ঘোরাঘুরি করছে। এতে প্রশাসনের প্রতিটি পদক্ষেপ বা মুভমেন্টের খবর সহজেই অপরাধীদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইয়াছিন বাহিনীর কাজী ফারুক, মো. হাছান, নুরুল হক ভান্ডারি এবং অমর ফারুকের মতো দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীরা এলাকায় কৌশলে যাতায়াত করছে। এমনকি র‌্যাব কর্মকর্তা আব্দুল মোতালেব হত্যা মামলার আসামিরাও গত ঈদের সময় এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জঙ্গল সলিমপুরের ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে নতুন মোতায়েনকৃত সদস্যদের পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় তারা স্থানীয় অপরাধীদের চিনতে হিমশিম খাচ্ছেন। অন্যদিকে, আগের বিভিন্ন অভিযানে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করা ‘সোর্স’দের ওপর সন্ত্রাসীরা অকথ্য নির্যাতন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষোদগার করায় বর্তমানে ভয়ে কেউ মুখ খুলছে না। ফলে সঠিক তথ্যের অভাবে অপরাধীদের গ্রেপ্তারে এক ধরণের স্থবিরতা বিরাজ করছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতি সমাধানে নড়েচড়ে বসেছে জেলা প্রশাসন। গত মঙ্গলবার ক্যাম্প দুটি পরিদর্শন করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান। পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক জানান, সদস্যদের কষ্ট লাঘবে দ্রুত দুটি গভীর নলকূপ বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি তাঁবুর ভোগান্তি কমাতে স্থায়ীভাবে টিনের ঘর নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “জঙ্গল সলিমপুরকে আর কোনোভাবেই সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হতে দেওয়া হবে না। যারা একজন সরকারি কর্মকর্তাকে হত্যা করার দুঃসাহস দেখিয়েছে, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে।”

বর্তমানে জঙ্গল সলিমপুরে স্কুল-মাদ্রাসা ও হাট-বাজার খোলা থাকলেও স্থানীয়দের চোখে-মুখে এখনো আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। তাদের আশঙ্কা, যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই সংকট দ্রুত সমাধান না হয় এবং ক্যাম্পগুলো গুটিয়ে নেওয়া হয়, তবে ফের পাহাড় কাটা, প্লট বাণিজ্য আর চাঁদাবাজির রাজত্ব কায়েম করবে সন্ত্রাসীরা।

উল্লেখ্য, গত ১৯ জানুয়ারি সন্ত্রাসী হামলায় র‍্যাব কর্মকর্তা আব্দুল মোতালেব নিহতের পর থেকেই এই এলাকায় উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। গত ৯ মার্চের অভিযানে ২২ জন গ্রেফতার ও বিপুল অস্ত্র উদ্ধার করা হলেও মূল হোতা ইয়াছিন এখনো পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;