পৌর শহরের যান্ত্রিক কোলাহল আর ফাইলের স্তূপ থেকে বাঁচতে মিনা নির্জনে পাড়ি জমিয়েছে। মিনার বিশ্বাস, “যে কথা ৫ শব্দে বলা যায়, সে কথাকে ৫০০ শব্দে বলাও একটি বিশেষ গুণ”। তার কাছে জীবনের সার্থকতা কেবল বেঁচে থাকায় নয়, বরং বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহূর্তকে শব্দের অলংকারে সাজানোতে। সর্ষে ক্ষেতের এই হলদে সমুদ্র দেখে তার মনে হলো, ৫ শব্দে একে হয়তো বলা যায়— “প্রকৃতির মাঝে এক চিলতে শান্তি”। কিন্তু তার মন মানল না; সে চাইল এই মুহূর্তকে এক মহাকাব্যে রূপ দিতে।
সেদিন মিনা পরেছিল গাঢ় নীল আর হ্লুদের আদলে কাজের একটি শাড়ি। তার চোখে ছিল লাল ফ্রেমের চশমা, যা তার বুদ্ধদীপ্ত চেহারায় এক অন্যরকম আভিজাত্য যোগ করেছে। হাতে একটি লাল ব্যাগ, যা হলুদ সর্ষে ফুলের ভিড়ে এক উজ্জ্বল বৈপরীত্য তৈরি করছিল। সে যখন সর্ষে ক্ষেতের সরু আইল ধরে হাঁটছিল, তার চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ যেন প্রকৃতির নিজস্ব বাজনার সাথে তাল মেলাচ্ছিল।
হঠাৎ সে থমকে দাঁড়াল। একটি সতেজ সর্ষে ফুল ছিঁড়ে পরম মমতায় নিজের কানে গুঁজল। তার আঙুলের ডগায় লেগে রইল হলুদ পরাগ রেণু। সে অনুভব করল, এই ক্ষুদ্র ফুলটি কেবল একটি উদ্ভিদ নয়, এটি মাটির গভীর থেকে উঠে আসা এক টুকরো হাসি। যদি সে কেবল বলত, “আমি কানে ফুল গুঁজেছি”, তবে এই ফুলের সুবাস, রোদের ওম আর বাতাসের দোলা—সবই কি হারিয়ে যেত না? তাই সে তার ডায়েরিতে লিখতে শুরু করল সেই মুহূর্তের কথা, যেখানে প্রতিটি শব্দ একটি করে পাপড়ি হয়ে ফুটে উঠছিল।
মাথার ওপর বিশাল নীল আকাশ আর চারপাশে অবারিত হলুদ। মিনা বুঝতে পারল, বড় বড় কথা বলা বা লেখা কেবল পাণ্ডিত্য নয়, এটি আসলে একটি সাধারণ মুহূর্তকে অসাধারণ করে তোলার জাদুকরী ক্ষমতা। যখন সে তার লাল চশমাটা একটু ঠিক করে দিগন্তের দিকে তাকাল, তার মনে হলো সে কোনো সাধারণ সর্ষে ক্ষেতে নেই, বরং সে দাঁড়িয়ে আছে এক জীবন্ত কবিতার পাতায়।

সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলতে শুরু করল, তখন মিনা ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিল। সে জানত, পৌর শহরে ফিরে যখন কেউ তাকে জিজ্ঞেস করবে, “দিনটা কেমন কাটল?”, সে তখন ৫ শব্দে উত্তর দেবে না। সে তার ঝুলি থেকে বের করবে সেই ৫০০ শব্দের জাদুকরী বর্ণনা, যা শুনে শ্রোতারাও মুহূর্তের জন্য সেই হলদে সমুদ্রের ঘ্রাণ পাবে। কারণ, সংক্ষিপ্ততা যদি হয় জ্ঞান, তবে বিস্তার হলো সেই জ্ঞানের শৈল্পিক রূপ।
– মোহছেনা মিনার ফেসবুক থেকে…
খালেদ / পোস্টকার্ড ;



















