সীতাকুণ্ডের পাহাড়ের বুক চিরে জেগে উঠেছে সবুজের গালিচা। চারদিকে মৌ মৌ করছে পুদিনা পাতার সতেজ সুবাস। পবিত্র মাহে রমজানকে সামনে রেখে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার পাহাড়ের পাদদেশে এবার পুদিনা পাতার বাম্পার ফলন হয়েছে। আধুনিক কৃষি পদ্ধতি ও অনুকূল আবহাওয়ায় এবার বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত এই ঔষধি গুণসম্পন্ন পুদিনা চাষে হাসি ফুটেছে স্থানীয় শত শত কৃষকের মুখে। সংশ্লিষ্টদের আশা, চলতি মৌসুমে উপজেলাজুড়ে অর্ধকোটি টাকারও বেশি পুদিনা বাণিজ্য হবে।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যানুযায়ী, সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী, সলিমপুর, কুমিরা ও সোনাইছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় ২০ হেক্টর জমিতে পুদিনার আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপ্লব ঘটেছে ভাটিয়ারী ইউনিয়নের জাহানাবাদ এলাকার খাদেম পাড়ায়। শুধু এই একক এলাকাতেই ১০ হেক্টর জমিতে পুদিনার চাষ হয়েছে। প্রায় ৫০০ জন কৃষক এ বছর হাড়ভাঙ্গা খাটুনি আর মেধার সমন্বয়ে পাহাড়ের পাদদেশকে সবুজ পুদিনার বাগানে রূপান্তর করেছেন। বর্তমানে উপজেলায় মোট ৮৫ মেট্রিক টন পুদিনা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫০ লক্ষাধিক টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
মাদামবিবির হাট এলাকার আদর্শ কৃষক তাজুদ্দীন জানান, চলতি মৌসুমে ৪৫ শতক জমিতে পুদিনার আবাদ করেছেন। কৃষি অফিসের সঠিক পরামর্শ ও নিবিড় পরিচর্যায় এবার ফলনও আশাতীত ভালো হয়েছে। তিনি বলেন, “সব মিলিয়ে আমার খরচ পড়েছে প্রায় ১ লক্ষ টাকা। যদি বাজার দর স্থিতিশীল থাকে এবং পরিস্থিতি অনুকূলে থাকে, তবে ২ লক্ষ টাকারও বেশি পুদিনা বিক্রি করতে পারব বলে আশা করছি। আমার মতো মো. শাহ আলম, সেলিম ও শাহজাহানসহ এই এলাকার অন্তত ৭০ জন কৃষক পুদিনা চাষ করে তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছেন।”
স্থানীয় কৃষকরা জানান, চট্টগ্রামের ইফতার আয়োজনে পুদিনা পাতা ছাড়া যেন তৃপ্তি মেটে না। শরবত থেকে শুরু করে নানা পদের ইফতারিতে এর চাহিদা আকাশচুম্বী। তাই রমজান আসার আগেই পাইকাররা ভিড় জমাচ্ছেন চাষিদের দোরগোড়ায়। এখান থেকে পুদিনা সরবরাহ হচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায়।
সীতাকুণ্ড উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহ পুদিনার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে বলেন, পুদিনায় প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট থাকে, যা ক্যান্সার, হৃদরোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগ থেকে শরীরকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। এছাড়া দাঁত ও মাড়ির ক্ষত সারাতে এবং গলার সংক্রমণ রোধে এটি অত্যন্ত কার্যকর।
তিনি বলেন, সীতাকুণ্ডের পাহাড়ের পাদদেশের মাটি পুদিনা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বাণিজ্যিকভাবে এই চাষ এখন কেবল পারিবারিক আয়ই বাড়াচ্ছে না, বরং স্থানীয় পর্যায়ে বড় আকারের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করছে।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা শিরিন আক্তার জানান, সারা বছর পুদিনার চাষ হলেও রমজানকে কেন্দ্র করে কৃষকরা বিশেষ প্রস্তুতি নেন। তিনি বলেন, আমরা মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের উৎপাদন বৃদ্ধিতে নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। বিশেষ করে কীটনাশকবিহীন জৈব পদ্ধতিতে পুদিনা চাষে তাদের উৎসাহিত করা হচ্ছে, যাতে ভোক্তারা শতভাগ নিরাপদ ও ভেষজ গুণসম্পন্ন পণ্যটি পান।
কৃষিবিদ ড. মো: সাইফুল আলম বলেন, পুদিনা সুগন্ধযুক্ত মুখরোচক গাছ। তরি-তরকারিসহ বিভিন্ন খাদ্যে পুদিনার ব্যবহারে বাড়তি স্বাদ যুক্ত হয়। প্রাচীনকাল থেকে পুদিনা অনেক রোগের ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। খাবারের সাথে সুগন্ধ হিসেবে ব্যবহার ছাড়াও পুদিনার আরো কিছু ব্যবহার রয়েছে। পুদিনার গাছ থেকে মেনথল নামের এক ধরনের তেল উত্পাদন হয়। যা দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পারফিউম, টুথপেস্ট, স্যাম্পু, মিন্ট চকলেট তৈরি করা হয়। এছাড়া পুদিনার গাছ থেকে তৈরি করা হয় মূল্যবান পিপারমেন্ট তেল।
তিনি বলেন, সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি অঞ্চলে পুদিনার এই ক্রমবর্ধমান উৎপাদন স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এই পুদিনা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;




















