দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় ব্যক্তিগত জীবনে গভীর শোকের মুখে পড়েন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাঁর মা, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেন। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে দ্রুত বদলে যাওয়া পরিস্থিতি তাঁকে শোক কাটিয়ে ওঠার সময় দেয়নি। দেশে ফেরার পর নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগও খুব বেশি পাননি তিনি।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান–এর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল) দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দিয়েছেন খালেদা জিয়া। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকট ও আন্দোলনের পর নির্বাচনের প্রাক্কালে দলটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব এসে পড়ে তারেক রহমানের কাঁধে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাবা–মায়ের কাছ থেকে পাওয়া রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও সংগঠনিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে তিনি জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও বিএনপিকে আবার জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। ৬০ বছর বয়সী এই নেতা নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যাপক জনসমাগম ঘটান এবং দেশ পরিচালনা নিয়ে তাঁর পরিকল্পনা ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে নিজেকে রাষ্ট্রনায়কসুলভ নেতৃত্ব হিসেবে উপস্থাপন করেন।
১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের মধ্য দিয়ে বিএনপির ক্ষমতায় আসা নিশ্চিত হয়। দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারেক রহমান বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন—যা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো মন্তব্য করেছে, ২০০৮ সালে সামরিক–সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় চিকিৎসার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়ার পর প্রায় দেড় যুগ নির্বাসনে থাকা এই মৃদুভাষী রাজনীতিকের জন্য এবারের নির্বাচন ছিল ভাগ্য ফেরানোর এক উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত। তাঁর প্রত্যাবর্তন, সরাসরি মাঠে নেতৃত্ব, সাধারণ মানুষের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ এবং সংযত রাজনৈতিক ভাষা তৃণমূল পর্যায়ে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে।
তবে একই সঙ্গে প্রচারণার শুরুতে প্রত্যাশা ও অনিশ্চয়তার এক মিশ্র আবহ ছিল বলেও উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো। নির্বাচনের ফলাফলের পর সেই সংশয়ের বড় অংশ কেটে গেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা তারেক রহমানের উত্থানকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে লন্ডনে নির্বাসিত অবস্থায় থেকে ফ্রান্সের নেতৃত্ব দেওয়া এবং পরে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণকারী ফরাসি নেতা শার্ল দ্য গল–এর সঙ্গে তুলনা করছেন। দীর্ঘ সময় যুক্তরাজ্যে অবস্থান করেও তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দলকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেন এবং দেশে ফিরে সরাসরি নেতৃত্বের হাল ধরেন।
নির্বাচনের আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, দেশের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, যাতে মানুষ নিরাপদে বসবাস করতে পারে। দেশে ফেরার পর তিনি উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য এড়িয়ে সংযম ও পুনর্মিলনের আহ্বান জানান এবং বলেন, ‘আমার একটি পরিকল্পনা আছে।’
পরবর্তীতে তিনি সেই পরিকল্পনার রূপরেখা তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, কোনো একক শক্তির ওপর অতিনির্ভরতা এড়িয়ে চলা, ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং তৈরি পোশাক শিল্পের পাশাপাশি খেলনা ও চামড়াজাত শিল্পের মতো খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া। রাজনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে তিনি প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ বা ১০ বছরে সীমাবদ্ধ করার প্রস্তাবও দিয়েছেন।
১৭ কোটির বেশি মানুষের দেশের দায়িত্ব নেওয়া যে সহজ নয়, তা স্বীকার করে তিনি ভেঙে পড়া অর্থনীতি পুনরুদ্ধারকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য ও জ্বালানি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন।
নির্বাচনের আগে তিনি যে বড় ও স্পষ্ট ম্যান্ডেটের প্রত্যাশা করেছিলেন, তা এখন তাঁর হাতে। সেই ম্যান্ডেট নিয়েই দেশ পরিচালনার নতুন অধ্যায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারেক রহমান।- বাসস
খালেদ / পোস্টকার্ড




















