০২:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাহাজভাঙা শিল্পের বাস্তব চিত্র উদ্বেগজনক, এক বছরে ৫৮ শ্রমিক আহত এবং নিহত ৪

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) এর এক জরিপে দেখা গেছে, চট্টগ্রামের জাহাজভাঙা শিল্পে নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবের কারণে ২০২৫ সালে মোট ৪৮টি দুর্ঘটনায় ৫৮ জন শ্রমিক আহত এবং ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। অথচ এসব দুর্ঘটনার বড় অংশই ছিল প্রতিরোধযোগ্য। দেশের জাহাজভাঙা শিল্পে নিরাপত্তা ও শ্রমিক সুরক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রতিশ্রুতি ও উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র উদ্বেগজনক।

সোমবার ( ২২ ডিসেম্বর ) চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের একটি হোটেলে আয়োজিত এক সভায় এ জরিপের তথ্য প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) এ জরিপ পরিচালনা করেন।
প্রত্যক্ষ শ্রমিকের তথ্য ও সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে করা এই জরিপে দুর্ঘটনার সময়, ধরন, মাত্রা, পেশাভিত্তিক ঝুঁকি এবং চি- কিৎসা ও ক্ষতিপূরণের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করা হয়।

জরিপ থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালে মোট দুর্ঘটনার মধ্যে ৩০টি মারাত্মক, ১৪টি হালকা এবং ৪টি ঘটনায় একাধিক শ্রমিক আহত হয়েছেন দিনের বেলায় সংঘটিত দুর্ঘটনার সংখ্যা ২৯টি, যা মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৬০ শতাংশ। রাতের সময় ১৯টি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যেখানে আলো স্বল্পতা, ক্লান্তি এবং পর্যাপ্ত তদারকির অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভারী লোহা বা গার্ডার পড়ে আঘাত সবচেয়ে বেশি। এর হার প্রায় ৩৫ শতাংশ। এরপর আগুন ও গ্যাস বিস্ফোরণ ২০ শতাংশ এবং উচ্চতা থেকে পড়া ও যন্ত্রপাতিজনিত দুর্ঘটনা প্রত্যেকটি প্রায় ১৫ শতাংশ।

হালকা দুর্ঘটনার হার ২৯ শতাংশ হলেও মৃত্যুর হার ৮ শতাংশ, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল মাথায় গুরুতর আঘাত, ভারী লোহার আঘাত এবং ট্যাংকির ভেতরে পড়ে যাওয়া যার সবকটিই প্রতিরোধযোগ্য বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে।

জরিপে আরও উল্লেখ করা হয়, মোট দুর্ঘটনার ৭০% কাটার হেলপার, কাটারম্যান, ফিটারম্যান ও ওয়্যার গ্রুপের শ্রমিকদের মধ্যে ঘটেছে। বিশেষ করে জুলাই-নভেম্বর বর্ষা মৌসুম এবং কাজের চাপ বৃদ্ধির সময় দুর্ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অধিকাংশ ইয়ার্ডে পর্যাপ্ত পিপি (হেলমেট, গগলস, গ্লাভস) নেই, ঝুঁকিপূর্ণ কাটিং কার্যক্রম, গ্যাস ও অক্সিজেন লাইনের ত্রুটি, প্রশিক্ষণহীন শ্রমিক এবং পর্যাপ্ত আলো ও সুপারভিশন না থাকা দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

জরিপে সুপারিশ করা হয়, লাইসেন্সবিহীন ও অদক্ষ ঠিকাদারের অধীনে শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ করা, রাত্রিকালীন কাজ বন্ধ রাখা, বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রাথমিক চিকিৎসা টিম ও পর্যাপ্ত এম্বুলেন্স নিশ্চিত করা, ন্যূনতম ৩৬ হাজার টাকা মাসিক মজুরি নির্ধারণ, দৈনিক ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ না করানো এবং উচ্চতায় কাজের সময় বাধ্যতামূলক সেফটি বেল্ট ও হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করা।

জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্তের সভাপতিত্বে এবং ফোরামের সদস্য সচিব ও বিলস-এর সেন্টার কোঅর্ডিনেটর ফজলুল কবির মিন্টুর সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য রাখেন যুগ্ম আহ্বায়ক এ এম নাজিম উদ্দিন, শ্রম দপ্তরের উপপরিচালক রোমানা আক্তার, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক কলসুম আক্তার সোমা, ইপসার কোঅর্ডিনেটর মো. আলী শাহীন, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সবুর শুভ, বিএমএসএফ নেতা নুরুল আবসার প্রমুখ।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;

ট্যাগ
জনপ্রিয় সংবাদ

জলিল টেক্সটাইলে তৈরি হবে অত্যাধুনিক অস্ত্র, আজ হস্তান্তর

জাহাজভাঙা শিল্পের বাস্তব চিত্র উদ্বেগজনক, এক বছরে ৫৮ শ্রমিক আহত এবং নিহত ৪

প্রকাশিত হয়েছে: ০৬:০৬:৩৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) এর এক জরিপে দেখা গেছে, চট্টগ্রামের জাহাজভাঙা শিল্পে নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবের কারণে ২০২৫ সালে মোট ৪৮টি দুর্ঘটনায় ৫৮ জন শ্রমিক আহত এবং ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। অথচ এসব দুর্ঘটনার বড় অংশই ছিল প্রতিরোধযোগ্য। দেশের জাহাজভাঙা শিল্পে নিরাপত্তা ও শ্রমিক সুরক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রতিশ্রুতি ও উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র উদ্বেগজনক।

সোমবার ( ২২ ডিসেম্বর ) চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের একটি হোটেলে আয়োজিত এক সভায় এ জরিপের তথ্য প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) এ জরিপ পরিচালনা করেন।
প্রত্যক্ষ শ্রমিকের তথ্য ও সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে করা এই জরিপে দুর্ঘটনার সময়, ধরন, মাত্রা, পেশাভিত্তিক ঝুঁকি এবং চি- কিৎসা ও ক্ষতিপূরণের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করা হয়।

জরিপ থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালে মোট দুর্ঘটনার মধ্যে ৩০টি মারাত্মক, ১৪টি হালকা এবং ৪টি ঘটনায় একাধিক শ্রমিক আহত হয়েছেন দিনের বেলায় সংঘটিত দুর্ঘটনার সংখ্যা ২৯টি, যা মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৬০ শতাংশ। রাতের সময় ১৯টি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যেখানে আলো স্বল্পতা, ক্লান্তি এবং পর্যাপ্ত তদারকির অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভারী লোহা বা গার্ডার পড়ে আঘাত সবচেয়ে বেশি। এর হার প্রায় ৩৫ শতাংশ। এরপর আগুন ও গ্যাস বিস্ফোরণ ২০ শতাংশ এবং উচ্চতা থেকে পড়া ও যন্ত্রপাতিজনিত দুর্ঘটনা প্রত্যেকটি প্রায় ১৫ শতাংশ।

হালকা দুর্ঘটনার হার ২৯ শতাংশ হলেও মৃত্যুর হার ৮ শতাংশ, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল মাথায় গুরুতর আঘাত, ভারী লোহার আঘাত এবং ট্যাংকির ভেতরে পড়ে যাওয়া যার সবকটিই প্রতিরোধযোগ্য বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে।

জরিপে আরও উল্লেখ করা হয়, মোট দুর্ঘটনার ৭০% কাটার হেলপার, কাটারম্যান, ফিটারম্যান ও ওয়্যার গ্রুপের শ্রমিকদের মধ্যে ঘটেছে। বিশেষ করে জুলাই-নভেম্বর বর্ষা মৌসুম এবং কাজের চাপ বৃদ্ধির সময় দুর্ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অধিকাংশ ইয়ার্ডে পর্যাপ্ত পিপি (হেলমেট, গগলস, গ্লাভস) নেই, ঝুঁকিপূর্ণ কাটিং কার্যক্রম, গ্যাস ও অক্সিজেন লাইনের ত্রুটি, প্রশিক্ষণহীন শ্রমিক এবং পর্যাপ্ত আলো ও সুপারভিশন না থাকা দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

জরিপে সুপারিশ করা হয়, লাইসেন্সবিহীন ও অদক্ষ ঠিকাদারের অধীনে শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ করা, রাত্রিকালীন কাজ বন্ধ রাখা, বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রাথমিক চিকিৎসা টিম ও পর্যাপ্ত এম্বুলেন্স নিশ্চিত করা, ন্যূনতম ৩৬ হাজার টাকা মাসিক মজুরি নির্ধারণ, দৈনিক ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ না করানো এবং উচ্চতায় কাজের সময় বাধ্যতামূলক সেফটি বেল্ট ও হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করা।

জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্তের সভাপতিত্বে এবং ফোরামের সদস্য সচিব ও বিলস-এর সেন্টার কোঅর্ডিনেটর ফজলুল কবির মিন্টুর সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য রাখেন যুগ্ম আহ্বায়ক এ এম নাজিম উদ্দিন, শ্রম দপ্তরের উপপরিচালক রোমানা আক্তার, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক কলসুম আক্তার সোমা, ইপসার কোঅর্ডিনেটর মো. আলী শাহীন, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সবুর শুভ, বিএমএসএফ নেতা নুরুল আবসার প্রমুখ।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;