এদেশের এক একজন মুক্তিযোদ্ধা এক একটি ইতিহাস। তেমনি একজন শুক্কুর চৌধুরী । মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া একজন সাহসী সৈনিক । সেলফোনে কথা বলে একদিন অনুমতি মেলে সাক্ষাতের। গর্বিত হই এক বীর মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ পেয়ে।
মুক্তিযোদ্ধা শুক্কুরের পুরো নাম মোঃ আবদুস শুক্কুর চৌধুরী। তাঁর বাবার নামঃ মরহুম আহম্মেদ সোবাহান চৌধুরী এবং মাতা ‘র নামঃ মরহুমা রশিদা বেগম। শুক্কুর চৌধুরী বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান। গ্রামের বাড়ি সীতাকুণ্ডের বাশবাড়ীয়া ইউনিয়নের মধ্য বাঁশবাড়িয়া গ্রামে চাঁন শিকদার বাড়ী।
মুক্তিযোদ্ধা শুক্কুর চৌধুরী র শৈশব ও কৈশোর পিতার কর্মস্থল কর্ণফুলীর তীর ঘেষা কালুরঘাটস্থ বৃহৎ শিল্পাঞ্চলে কেটেছে।
ছোটবেলায় বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মধ্যমনি থাকতেন। পছন্দের খেলা ছিল ফুটবল, ক্রিকেট ভলিবল ব্যাডমিন্টন সহ সব ইনডোর খেলা, এছাড়া বইপড়া লেখালেখি নাটক সহ বহুবিধ সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে ছিলেন সরব মুখর।
শুক্কুর চৌধুরী’র পড়াশোনা শুরু নার্সারি হতে ক্লাস থ্রি পর্যন্ত ইস্পাহানী কেজি স্কুল, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেনী চররাঙ্গামাটিয়া সরকারী প্রাইমারি স্কুলে। সেখান হতে পঞ্চম শ্রেণি পাশ করে ভর্তি হন মোহরা এ এল খান উচ্চ বিদ্যালয়ে। এখান হতে ১৯৭০ সালে এস এস সি পাশ করে ভর্তি হন চট্টগ্রাম সরকারী সিটি কলেজ, ১৯৭৫ সালে অর্থনীতিতে স্নাতক পাশ করেন।
দেশ তখন উত্তাল। নানা বৈষম্য চলছিল। পশ্চিম পাকিস্তানিরা নানাভাবে শোষণ করছিল পূর্ব পাকিস্থানীদের ওপর। এসব খবর পৌঁছে যেত গ্রাম গ্রামান্তরে। মানুষের মুখেমুখে, রেডিও এবং পত্রিকার মাধ্যমে নানা খবর জেনে যেত শুক্কুর’রা। সে খবরগুলো এবং কলেজ ছাত্র হিসাবে নিত্যদিন বিভিন্ন বিক্ষোভ মিছিলে উদ্দিপ্ত করতো তার মত তরুনদের। এরমধ্যে ৭ই মার্চে রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু। শুক্কুর চৌধুরী সে ভাষণ শোনেন রেডিওতে। তার ভাষায় -“রক্ত গরম করা ও পরবর্তী করনীয় ও দিক নির্দেশনা মুলক ছিল বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ।”
শুক্কুর চৌধুরী ক্ষয়িষ্ণু জমিদার পরিবারের সন্তান, মোটামুটি মধ্যবিত্ব গোছের স্বচ্ছলতা ও যৎসামান্য জমিজমাও ছিল। কিন্তু দেশ যদি পরাধীন থাকে তবে সে জমি বা সম্পদের মূল্য কী থাকে? তাই সবার আগে দেশকে মুক্ত করতে হবে। বাঁচাতে হবে মাতৃভূমিটাকে। এমন চিন্তা থেকেই একরাতে গোপনে বেড়িয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য। কথা হয় মোঃ আবদুস শুক্কুর চৌধুরীর সাথে ।
প্রশ্ন : আপনি কত বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ঠিক কোন বোধ থেকে এই দুঃসাহসিক সিদ্ধান্তটা নিলেন?
উত্তরঃ ১৭ বছর বয়সে, তখন সরকারী সিটি কলেজে এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যায়নরত। দেশের প্রতি ভালোবাসা, স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর তাগিদ থেকে আমার এই স্বিদ্ধান্ত নেয়া ।
প্রশ্ন : মাকে ছেড়ে দেশ বাঁচাতে গেলেন। মা আগে না দেশ আগে—এ রকম কোনো দ্বিধা কি কাজ করেছিল?
উত্তরঃ ঐ সময়ের সার্বিক রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় সচেতন তরুণ হিসাবে চারিদিকে বিদ্যমান হানাদার বাহিনীর হত্যা ধর্ষণ লুন্ঠনের অরাজকতা হতে মা মাটি ও দেশকে মুক্ত করাই হয়ে উঠে প্রধান দায়িত্ব।
প্রশ্ন : যুদ্ধে অংশ নেওয়ার অনুপ্রেরণা কে বা কী ছিল?
উত্তরঃ কলেজে প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত থাকায় চলমান ও পরিবর্তীত রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্যক জ্ঞাত ছিলাম। বাসায় দৈনিক ইত্তেফাক সহ দুটি পত্রিকা নিয়মিত নেয়া হতো, আর বড় ফিলিপস রেডিও ছিল, যাতে নিয়মিত সব খবরাখবর জানা হতো। তবে মুল অনুপ্রেরণা ও সাহস ছিলেন আমার পিতা। তিনি প্রাক্তন বৃটিশ সেনা কর্মকর্তা, রাজনৈতিক দলে যুক্ত না থাকলে ও বঙ্গবন্ধুর অন্ধ আবেগিক অনুরাগী ছিলেন।
প্রশ্ন : রাতের আঁধার, নাকি দিনের আলো—ঠিক কোন সময়টায় অপারেশন করা সহজ বা কঠিন ছিল?
উত্তরঃ আমরা ছিলাম বিএলএফ গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা। আমাদের কাজ ছিল দিনের বেলায় নিরাপদে থেকে খোঁজ খবর রাখা, রাতে চট্টগ্রাম হতে আগত মুক্তিযুদ্ধে যোগদানেচ্ছুদের নিরাপদ গাইড রুটে ভারতে পাঠানো, এবং ভারত হতে প্রশিক্ষণ ও অস্র নিয়ে ফেরা গেরিলা যোদ্ধাদের নিরাপদ শেল্টারের ব্যবস্থা করতঃ সুবিধাজনক সময়ে চট্টগ্রামে পাঠানোর ব্যবস্থা করা।
প্রশ্ন : আপনার অংশ নেওয়া অভিযানগুলো নিয়ে যদি বলতেন। এগুলো সফল করার পেছনে আপনার ভূমিকা কেমন ছিল?
উত্তরঃ আমরা কয়েকজন অগ্ৰজ মোজাফফর আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বিএলএফ গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে যোগদান করি ও সীতাকুণ্ড অঞ্চলে দায়িত্ব রত থাকি। জুলাই অগাস্ট হতে আঞ্চলিক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ইউসুফ সালাহউদ্দিন আহম্মদ (তখন বুয়েটের ছাত্র) উপ আন্চলিক কমান্ডার মোয়াজ উদ্দিন আহমদ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এস এম হলের ভিপি) ও মু মাহফুজুর রহমান (চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ছাত্র) গনের প্রত্যক্ষ অধীনে কাজ করতে হয়। যখন যেমন আদেশ নির্দেশ পেতাম তাই করে গেছি।
প্রশ্ন : আপনাদের মধ্যে তো ভয় বলে তেমন কিছু ছিল না। তবু কোনো অপারেশনে কি ভয় পেয়েছিলেন?
উত্তরঃ আমরা তো গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা, সরাসরি যুদ্ধের পরিস্থিতি আসে ১৪ই ডিসেম্বর হতে বাড়বকুন্ডের দিকে গিয়ে ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ভারতীয় বাহিনী তথা মিত্র বাহিনীর সাথে যুক্ত হয়ে পাকিস্থানী বাহিনীর শেষ প্রতিরোধ কুমিরার দিকে অগ্ৰসরমান সময়টা ছিল চরম উত্তেজনা, ভয় ও উদ্বেগের।
প্রশ্ন- আপনারা কিভাবে বুঝলেন পাকিস্তানি সৈন্যের সাথে আপনারা যুদ্ধ করে জিততে পারবেন ? কেননা তারা ত ট্রেইনিং প্রাপ্ত ছিল ?
উত্তরঃ প্রথমতঃ দেশের জনগন এই যুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দেশের স্বাধীনতার জন্য একাত্ম ও উৎসর্গিত ছিল। গেরিলা যুদ্ধে যে কোন বাহিনীকে দূর্বল ও পরাস্ত করা সম্ভব যদি এলাকা ও দেশের জনসমর্থন সহযোগিতা থাকে। সেটা আমাদের প্রবল ভাবেই ছিল।
প্রশ্ন : যুদ্ধের সময় আপনার সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা কী?
উত্তরঃ তখন সদ্য কৈশোরোত্তীর্ন বয়স। পুরো মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটা দিন সময়টাই স্মরণীয়।
প্রশ্ন : স্বাধীনতার পর দেশ নিয়ে আপনার কোনো স্বপ্ন ছিল?
উত্তরঃ তখন আমি আমরা আবার কলেজে শিক্ষা জীবনে ফিরে গেছি, প্রথম প্রত্যাশা ছিলে হানাদার বাহিনীর রেখে যাওয়া ধংসস্তুপ সরিয়ে পূণঃবাসন, আইনশৃঙ্খলায় স্থিতিশীলতা এবং যে বঞ্চনার জন্য বিদ্রোহ সংগ্ৰাম সেই জনগনের প্রতিনিধি দ্ধারা গনতান্ত্রিক কল্যাণময় রাষ্ট্র।
প্রশ্ন : নতুন প্রজন্ম নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?
উত্তরঃ ঠিক এই মূহুর্তে খাণিকটা হতাশ বটে! তবে তরুন প্রজন্মের যারা ভুল তথ্যে ও প্রোপাগান্ডায় বিভ্রমে আছে সময়ে তাদের বোধদ্বয় হবে, আগত নুতন প্রজন্ম দেশ ও মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ঘটনা ইতিহাস জানবে এবং প্রকৃত দেশ প্রেমে উৎসর্গীত হবে বলেই আশাবাদ পোষন করি।
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ
আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ ।
মুক্তিযোদ্ধা শুক্কুর চৌধুরী একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারী চাকুরিজীবী, তিনি ১৯৭৬ সাল হতে কেয়ার, বিশ্বব্যাংক প্রকল্প, পাট উৎপাদন পরিদপ্তর, কৃষি- স্থানীয় সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে চাকুরী করে ২০০৯ সালে অবসর গ্ৰহন করেন।
তিনি একাধারে কবি লেখক সংগঠক ও লায়ন্স হিসাবে মানবিক সেবক। সর্বক্ষণিক লেখালেখি নিয়েই আছেন। ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম ঢাকা আসাম ও আগরতলা হতে উনার ১১টি একক ও ৫৪ টি যৌথ গ্ৰন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
সাহিত্যে অবদান রাখার জন্য তিনি বাংলাদেশ ও ভারতের বহু সংগঠন হতে বহু সন্মাননা লাভ করেছেন।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;
মেজবাহ উদ্দীন খালেদ ।। 



















