০৭:৫৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অপহরণের দুই বছর পর উদ্ধার কঙ্কাল, দুই যুগেও মেলেনি বিচার: এক বিলাপিত পরিবারের গল্প

চট্টগ্রামের পরিচিত ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা জামাল উদ্দিন চৌধুরী নিখোঁজ হয়েছিলেন আজ থেকে ঠিক ২৩ বছর আগে। ২০০৩ সালের ২৪ জুলাই রাতে চট্টগ্রাম শহরের চকবাজারের নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে চান্দগাঁওয়ের বাসায় ফেরার পথেই অপহৃত হন তিনি। কিন্তু দীর্ঘ ২৩ বছর অতিক্রান্ত হলেও তার নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার পায়নি ভুক্তভোগী পরিবার। বিচার পাওয়ার আশাই এখন ছেড়ে দিয়েছেন তারা।

৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ ও কঙ্কাল উদ্ধার
অপহরণের পর পরিবারের কাছে ফোন করে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছিল অপহরণকারীরা। প্রশাসনের পরামর্শে ২৫ লাখ টাকা পরিশোধও করে পরিবার, কিন্তু জীবিত আর ফেরেননি জামাল উদ্দিন। অপহরণের ঘটনার দুই বছর পর, ২০০৫ সালের ২৪ আগস্ট আনোয়ারা সদরের সাবেক ইউপি সদস্য মো. শহীদুল ইসলামকে গ্রেপ্তারের পর তার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ফটিকছড়ির কাঞ্চননগরের পাহাড়ি এলাকা থেকে জামাল উদ্দিনের একটি কঙ্কাল উদ্ধার করে র‍্যাব। পরবর্তীতে সিঙ্গাপুরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় কঙ্কালটি জামাল উদ্দিনেরই।

মূল আসামিদের অব্যাহতির অভিযোগ
অপহরণ মামলা যখন হত্যা মামলায় রূপ নেয়, তখন শহীদুল ইসলামের জবানবন্দিতে অনেকের নাম উঠে এলেও তদন্তের গতিপথ নিয়ে প্রশ্ন তোলে ভুক্তভোগী পরিবার। ২০০৬ সালে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মূল অভিযুক্তদের আড়াল করে ২৪ জনকে অব্যাহতি দেয় এবং ১৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। পরিবারের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী আসল আসামিরা সব সময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে।

বিচার চাইতে চাইতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া
বাবার নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার পেতে জামাল উদ্দিনের ছেলে ফরমান রেজা লিটন দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে থানা, আদালত ও প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। দীর্ঘদিনের বিচারহীনতায় ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়ে তারা এখন আর আদালতে যান না। গত ৯ বছর ধরে মামলার বাদীও আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া বন্ধ রেখেছেন।

বাবার বিচারের অপেক্ষায় থাকতে থাকতেই গত বছরের সেপ্টেম্বরে না-ফেরার দেশে চলে যান জামাল উদ্দিনের ছোট ছেলে চৌধুরী আরমান রেজা। চোখের সামনে বড় ভাইয়ের আকুতি আর ছোট ছেলের কান্না দেখতে দেখতে এখন ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন জামাল উদ্দিনের স্ত্রী নাজমা আক্তার। দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে ভরসা হারিয়ে তারা এখন শেষ ভরসা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপর ওপরই আশা রাখছেন।

জামাল উদ্দিনের বেঁচে থাকা ছেলে ফরমান রেজা আক্ষেপ করে বলেন, বিচার ব্যবস্থার ওপর তাদের আর কোনো আস্থা নেই। তারা এখন আর কোনো বিচারও চান না।

সাধারণ মানুষের ভরসা কোথায়?
চট্টগ্রামের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচারে যখন দুই যুগেও কোনো সুরাহা মেলে না, পরিবারকে যখন সুবিচারের আশা ছেড়ে দিতে হয়, তখন সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে বিচার পাওয়ার আর কতটুকু ভরসা অবশিষ্ট থাকে—এমনই এক কঠিন প্রশ্ন রেখে গেছে জামাল উদ্দিনের এই ট্র্যাজিক ঘটনা।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;

ট্যাগ
জনপ্রিয় সংবাদ

‘অ্যামেজিং চট্টগ্রাম’: আন্তর্জাতিক মানের নগর গড়তে সিপিডিএলের মহাপরিকল্পনা

অপহরণের দুই বছর পর উদ্ধার কঙ্কাল, দুই যুগেও মেলেনি বিচার: এক বিলাপিত পরিবারের গল্প

প্রকাশিত হয়েছে: ০৬:১০:১৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

চট্টগ্রামের পরিচিত ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা জামাল উদ্দিন চৌধুরী নিখোঁজ হয়েছিলেন আজ থেকে ঠিক ২৩ বছর আগে। ২০০৩ সালের ২৪ জুলাই রাতে চট্টগ্রাম শহরের চকবাজারের নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে চান্দগাঁওয়ের বাসায় ফেরার পথেই অপহৃত হন তিনি। কিন্তু দীর্ঘ ২৩ বছর অতিক্রান্ত হলেও তার নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার পায়নি ভুক্তভোগী পরিবার। বিচার পাওয়ার আশাই এখন ছেড়ে দিয়েছেন তারা।

৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ ও কঙ্কাল উদ্ধার
অপহরণের পর পরিবারের কাছে ফোন করে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছিল অপহরণকারীরা। প্রশাসনের পরামর্শে ২৫ লাখ টাকা পরিশোধও করে পরিবার, কিন্তু জীবিত আর ফেরেননি জামাল উদ্দিন। অপহরণের ঘটনার দুই বছর পর, ২০০৫ সালের ২৪ আগস্ট আনোয়ারা সদরের সাবেক ইউপি সদস্য মো. শহীদুল ইসলামকে গ্রেপ্তারের পর তার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ফটিকছড়ির কাঞ্চননগরের পাহাড়ি এলাকা থেকে জামাল উদ্দিনের একটি কঙ্কাল উদ্ধার করে র‍্যাব। পরবর্তীতে সিঙ্গাপুরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় কঙ্কালটি জামাল উদ্দিনেরই।

মূল আসামিদের অব্যাহতির অভিযোগ
অপহরণ মামলা যখন হত্যা মামলায় রূপ নেয়, তখন শহীদুল ইসলামের জবানবন্দিতে অনেকের নাম উঠে এলেও তদন্তের গতিপথ নিয়ে প্রশ্ন তোলে ভুক্তভোগী পরিবার। ২০০৬ সালে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মূল অভিযুক্তদের আড়াল করে ২৪ জনকে অব্যাহতি দেয় এবং ১৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। পরিবারের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী আসল আসামিরা সব সময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে।

বিচার চাইতে চাইতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া
বাবার নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার পেতে জামাল উদ্দিনের ছেলে ফরমান রেজা লিটন দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে থানা, আদালত ও প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। দীর্ঘদিনের বিচারহীনতায় ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়ে তারা এখন আর আদালতে যান না। গত ৯ বছর ধরে মামলার বাদীও আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া বন্ধ রেখেছেন।

বাবার বিচারের অপেক্ষায় থাকতে থাকতেই গত বছরের সেপ্টেম্বরে না-ফেরার দেশে চলে যান জামাল উদ্দিনের ছোট ছেলে চৌধুরী আরমান রেজা। চোখের সামনে বড় ভাইয়ের আকুতি আর ছোট ছেলের কান্না দেখতে দেখতে এখন ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন জামাল উদ্দিনের স্ত্রী নাজমা আক্তার। দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে ভরসা হারিয়ে তারা এখন শেষ ভরসা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপর ওপরই আশা রাখছেন।

জামাল উদ্দিনের বেঁচে থাকা ছেলে ফরমান রেজা আক্ষেপ করে বলেন, বিচার ব্যবস্থার ওপর তাদের আর কোনো আস্থা নেই। তারা এখন আর কোনো বিচারও চান না।

সাধারণ মানুষের ভরসা কোথায়?
চট্টগ্রামের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচারে যখন দুই যুগেও কোনো সুরাহা মেলে না, পরিবারকে যখন সুবিচারের আশা ছেড়ে দিতে হয়, তখন সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে বিচার পাওয়ার আর কতটুকু ভরসা অবশিষ্ট থাকে—এমনই এক কঠিন প্রশ্ন রেখে গেছে জামাল উদ্দিনের এই ট্র্যাজিক ঘটনা।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;