০৯:৪৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জলদস্যু থেকে সন্দ্বীপের ‘রাজা’, পর্তুগিজ তিবাউর ইতিহাস

মেঘনা নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগরের বুকে অবস্থিত চট্টগ্রামের অন্যতম প্রাচীন দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপ। সপ্তদশ শতকে কৌশলগত অবস্থান, প্রচুর লবণ উৎপাদন, কৃষিপণ্য ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে সন্দ্বীপের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। বাণিজ্য ও ভৌগোলিক গুরুত্বের কারণে তৎকালীন সময়ে পর্তুগিজ ও আরাকানি জলদস্যুদের মূল ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিল এই দ্বীপটি। আর এই দ্বীপেই একসময় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে শাসন চালিয়েছিলেন সেবাস্তিয়ান গঞ্জালেজ তিবাউ নামের এক পর্তুগিজ জলদস্যু।

সৈনিক থেকে লবণ বণিক

জোয়াকিম জোসেফ এ ক্যাম্পোস-এর ‘হিস্ট্রি অব দ্য পর্তুগিজ ইন বেঙ্গল’ ও ঐতিহাসিক সূত্রের তথ্যমতে, পর্তুগালের ‘সান্তো আন্তোনিও দে তোজালে’ এলাকার অখ্যাত এক পরিবারে জন্ম নেওয়া তিবাউ ১৬০৫ সালে প্রথম ভারতে আসেন। গোয়ায় এসে পর্তুগিজ সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেও অল্প দিনের মধ্যেই সেই সৈনিক জীবনের ইতি টানেন তিনি। এরপর দ্রুতই বাংলায় চলে আসেন এবং একটি জাহাজ কিনে শুরু করেন লবণের ব্যবসা।

যে ঘটনায় বদলে যায় জীবন

১৬০৭ সালে তৎকালীন আরাকান রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড়ের ‘দেয়াং’ (ডিয়াঙ্গা) এলাকায় লবণের ব্যবসা করতে গিয়ে এক ভয়াবহ গণহত্যার মুখোমুখি হন তিবাউ। আরাকানরাজের নির্দেশে সেখানে থাকা পর্তুগিজদের ওপর ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালানো হলে বহু পর্তুগিজ প্রাণ হারান। অলৌকিকভাবে বেঁচে যান তিবাউ।

জীবনের এমন মোড়ে এসে তিবাউ ও বেঁচে যাওয়া অন্যান্য পর্তুগিজরা একত্রিত হয়ে ‘গঙ্গার মুখে’ নতুন বসতি গড়েন এবং পেশা হিসেবে বেছে নেন বেপরোয়া জলদস্যুতা। আরাকান রাজার ওপর প্রতিশোধ নিতে তারা আরাকানি জাহাজে লুটপাট চালিয়ে তৎকালীন বকলার (বরিশাল) বাজারে বিক্রি করতে শুরু করেন।

রক্তের সমুদ্রে সন্দ্বীপ বিজয়

১৬০৫ ও ১৬০৭ সালে সন্দ্বীপের সাবেক পর্তুগিজ শাসক ডমিঙ্গো কারভালহো ও ম্যানোয়েল দা মাত্তোসের মৃত্যুর পর দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেন অদক্ষ প্রশাসক পেরো গোমেজ। গোমেজের ব্যর্থতার সুযোগে তার অধীনস্থ কর্মকর্তা ফতেহ খান ক্ষমতার দখল নিয়ে নিজেকে সন্দ্বীপের শাসক ঘোষণা করেন।

এই বিশৃঙ্খলার সুযোগ কাজে লাগান তিবাউ। ১৬০৯ সালে বকলার শাসক রাজা প্রতাপাদিত্যের সাথে চুক্তি করে ২০০ অশ্বারোহী ও যুদ্ধজাহাজ নিয়ে সন্দ্বীপে হামলা চালান তিনি। ফতেহ খানের ৪০টি পালতোলা জাহাজ ও ৮০০ সৈন্যের বিশাল বাহিনীকে নিজেদের অসামান্য নৌ-দক্ষতায় ধূলিসাৎ করে দেয় তিবাউর বাহিনী। যুদ্ধে ফতেহ খান নিহত হলে সন্দ্বীপের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যায় তিবাউর হাতে।

নিজস্ব ‘ছায়া সাম্রাজ্য’ ও বিশ্বাসঘাতকতা

সন্দ্বীপ জয়ের পর তিবাউ কেবল একজন জলদস্যু থাকেননি, বরং নিজেকে সন্দ্বীপের এক স্বাধীন ‘রাজা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। যদিও গোয়া থেকে পরিচালিত পর্তুগিজদের অফিশিয়াল শাসন ‘এস্তাদো দা ইন্ডিয়া’র অধীনে তিনি ছিলেন না, ইতিহাসবিদরা একে পর্তুগিজদের একটি ‘ছায়া সাম্রাজ্য’ বলে অভিহিত করেন।

একপর্যায়ে তিবাউর সেনাবাহিনীতে এক হাজারের বেশি পর্তুগিজ, দুই হাজার স্থানীয় সৈন্য, ২০০ অশ্বারোহী এবং সুবিশাল নৌবহর যুক্ত হয়। ক্ষমতায় অন্ধ হয়ে তিনি বকলার শাসক প্রতাপাদিত্যকে সন্দ্বীপের রাজস্বের অর্ধেক দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন, এমনকি প্রতাপাদিত্যের অধীনস্থ দক্ষিণ শাহবাজপুর (বর্তমান ভোলা) দখল করে নেন।

পতন ও সাম্রাজ্যের ইতি

১৬১৫ সালের দিকে তিবাউ গোয়ার সরকারি নৌবহরের সহায়তায় আরাকানের রাজধানী ‘ম্রাউক ইউ’ আক্রমণে অংশ নেন। কিন্তু ডাচদের যৌথ প্রতিরোধের মুখে সেই অভিযানে শোচনীয় পরাজয় ঘটে তাদের।

অবশেষে ১৬১৭ সালে আরাকানরাজ মিন রাজাগির পুত্র মিন খামাউং সন্দ্বীপে বড় ধরণের পাল্টা আক্রমণ চালান। এই যুদ্ধে তিবাউ চূড়ান্তভাবে পরাজিত হন। আর এর মাধ্যমেই ইতি ঘটে সন্দ্বীপে পর্তুগিজ জলদস্যু সেবাস্তিয়ান গঞ্জালেজ তিবাউর প্রায় এক দশকের রক্তক্ষয়ী ও রাজকীয় শাসনের।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;

ট্যাগ
জনপ্রিয় সংবাদ

‘অ্যামেজিং চট্টগ্রাম’: আন্তর্জাতিক মানের নগর গড়তে সিপিডিএলের মহাপরিকল্পনা

জলদস্যু থেকে সন্দ্বীপের ‘রাজা’, পর্তুগিজ তিবাউর ইতিহাস

প্রকাশিত হয়েছে: ০৮:২১:৪০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

মেঘনা নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগরের বুকে অবস্থিত চট্টগ্রামের অন্যতম প্রাচীন দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপ। সপ্তদশ শতকে কৌশলগত অবস্থান, প্রচুর লবণ উৎপাদন, কৃষিপণ্য ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে সন্দ্বীপের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। বাণিজ্য ও ভৌগোলিক গুরুত্বের কারণে তৎকালীন সময়ে পর্তুগিজ ও আরাকানি জলদস্যুদের মূল ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিল এই দ্বীপটি। আর এই দ্বীপেই একসময় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে শাসন চালিয়েছিলেন সেবাস্তিয়ান গঞ্জালেজ তিবাউ নামের এক পর্তুগিজ জলদস্যু।

সৈনিক থেকে লবণ বণিক

জোয়াকিম জোসেফ এ ক্যাম্পোস-এর ‘হিস্ট্রি অব দ্য পর্তুগিজ ইন বেঙ্গল’ ও ঐতিহাসিক সূত্রের তথ্যমতে, পর্তুগালের ‘সান্তো আন্তোনিও দে তোজালে’ এলাকার অখ্যাত এক পরিবারে জন্ম নেওয়া তিবাউ ১৬০৫ সালে প্রথম ভারতে আসেন। গোয়ায় এসে পর্তুগিজ সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেও অল্প দিনের মধ্যেই সেই সৈনিক জীবনের ইতি টানেন তিনি। এরপর দ্রুতই বাংলায় চলে আসেন এবং একটি জাহাজ কিনে শুরু করেন লবণের ব্যবসা।

যে ঘটনায় বদলে যায় জীবন

১৬০৭ সালে তৎকালীন আরাকান রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড়ের ‘দেয়াং’ (ডিয়াঙ্গা) এলাকায় লবণের ব্যবসা করতে গিয়ে এক ভয়াবহ গণহত্যার মুখোমুখি হন তিবাউ। আরাকানরাজের নির্দেশে সেখানে থাকা পর্তুগিজদের ওপর ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালানো হলে বহু পর্তুগিজ প্রাণ হারান। অলৌকিকভাবে বেঁচে যান তিবাউ।

জীবনের এমন মোড়ে এসে তিবাউ ও বেঁচে যাওয়া অন্যান্য পর্তুগিজরা একত্রিত হয়ে ‘গঙ্গার মুখে’ নতুন বসতি গড়েন এবং পেশা হিসেবে বেছে নেন বেপরোয়া জলদস্যুতা। আরাকান রাজার ওপর প্রতিশোধ নিতে তারা আরাকানি জাহাজে লুটপাট চালিয়ে তৎকালীন বকলার (বরিশাল) বাজারে বিক্রি করতে শুরু করেন।

রক্তের সমুদ্রে সন্দ্বীপ বিজয়

১৬০৫ ও ১৬০৭ সালে সন্দ্বীপের সাবেক পর্তুগিজ শাসক ডমিঙ্গো কারভালহো ও ম্যানোয়েল দা মাত্তোসের মৃত্যুর পর দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেন অদক্ষ প্রশাসক পেরো গোমেজ। গোমেজের ব্যর্থতার সুযোগে তার অধীনস্থ কর্মকর্তা ফতেহ খান ক্ষমতার দখল নিয়ে নিজেকে সন্দ্বীপের শাসক ঘোষণা করেন।

এই বিশৃঙ্খলার সুযোগ কাজে লাগান তিবাউ। ১৬০৯ সালে বকলার শাসক রাজা প্রতাপাদিত্যের সাথে চুক্তি করে ২০০ অশ্বারোহী ও যুদ্ধজাহাজ নিয়ে সন্দ্বীপে হামলা চালান তিনি। ফতেহ খানের ৪০টি পালতোলা জাহাজ ও ৮০০ সৈন্যের বিশাল বাহিনীকে নিজেদের অসামান্য নৌ-দক্ষতায় ধূলিসাৎ করে দেয় তিবাউর বাহিনী। যুদ্ধে ফতেহ খান নিহত হলে সন্দ্বীপের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যায় তিবাউর হাতে।

নিজস্ব ‘ছায়া সাম্রাজ্য’ ও বিশ্বাসঘাতকতা

সন্দ্বীপ জয়ের পর তিবাউ কেবল একজন জলদস্যু থাকেননি, বরং নিজেকে সন্দ্বীপের এক স্বাধীন ‘রাজা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। যদিও গোয়া থেকে পরিচালিত পর্তুগিজদের অফিশিয়াল শাসন ‘এস্তাদো দা ইন্ডিয়া’র অধীনে তিনি ছিলেন না, ইতিহাসবিদরা একে পর্তুগিজদের একটি ‘ছায়া সাম্রাজ্য’ বলে অভিহিত করেন।

একপর্যায়ে তিবাউর সেনাবাহিনীতে এক হাজারের বেশি পর্তুগিজ, দুই হাজার স্থানীয় সৈন্য, ২০০ অশ্বারোহী এবং সুবিশাল নৌবহর যুক্ত হয়। ক্ষমতায় অন্ধ হয়ে তিনি বকলার শাসক প্রতাপাদিত্যকে সন্দ্বীপের রাজস্বের অর্ধেক দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন, এমনকি প্রতাপাদিত্যের অধীনস্থ দক্ষিণ শাহবাজপুর (বর্তমান ভোলা) দখল করে নেন।

পতন ও সাম্রাজ্যের ইতি

১৬১৫ সালের দিকে তিবাউ গোয়ার সরকারি নৌবহরের সহায়তায় আরাকানের রাজধানী ‘ম্রাউক ইউ’ আক্রমণে অংশ নেন। কিন্তু ডাচদের যৌথ প্রতিরোধের মুখে সেই অভিযানে শোচনীয় পরাজয় ঘটে তাদের।

অবশেষে ১৬১৭ সালে আরাকানরাজ মিন রাজাগির পুত্র মিন খামাউং সন্দ্বীপে বড় ধরণের পাল্টা আক্রমণ চালান। এই যুদ্ধে তিবাউ চূড়ান্তভাবে পরাজিত হন। আর এর মাধ্যমেই ইতি ঘটে সন্দ্বীপে পর্তুগিজ জলদস্যু সেবাস্তিয়ান গঞ্জালেজ তিবাউর প্রায় এক দশকের রক্তক্ষয়ী ও রাজকীয় শাসনের।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;