০৬:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অবশেষে হাতিয়ায় যুক্ত হচ্ছে ফেরি, দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষ প্রান্তে দ্বীপবাসী

এতদিন যা ছিল শুধু স্বপ্ন এখন তা বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে। গাড়িতে আসা-যাওয়া করা যাবে, মালামাল বোঝাই গাড়ি আসতে পারবে সহজেই। স্বাধীনতার পর এবারই প্রথম মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে নিরাপদ ও আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা স্থাপিত হতে যাচ্ছে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার। দ্রুততম সময়ের মধ্যে দ্বীপবাসীর জন্য চালু হবে ফেরি। এরই মধ্যে দুই পাড়ে শুরু হয়ে গেছে বিশাল কর্মযজ্ঞ।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানের খবরে যার পর নাই খুশি হাতিয়া দ্বীপের বাসিন্দারা। অধীর আগ্রহে অপেক্ষার প্রহর গুণছেন তারা। তাদের কথায়, ফেরি চলাচলের সিদ্বান্তে বদলে যাবে দ্বীপের চিত্র। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে নানা ক্ষেত্রে আসবে গতিশীলতা। এই অঞ্চলের অর্থনীতিতেও আসবে ব্যাপক পরিবর্তন।

একটি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়নের এই দ্বীপে সাড়ে ৭ লাখ লোকের বসবাস। মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌপথ। চরম ভোগান্তি তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। দীর্ঘদিন থেকে সিট্রাক ও ট্রলারে নদী পারাপার করতে হয় এখানকার মানুষজনকে। পুরোনো সিট্রাকগুলো প্রায় সময়েই বিকল হয়ে পড়ে থাকে ঘাটে। ঝুঁকি নিয়ে ছোট ট্রলার ও স্পিডবোটে নদী পার হতে হয় যাত্রীদের। মালামাল আনা-নেওয়ায় ভোগান্তির শেষ নেই।

তাই নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা ছিল দ্বীপের বাসিন্দাদের বড় স্বপ্ন। অতীতে সব সরকার শুধু আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ ছিল। উল্লেখ করার মতো কোনো উন্নয়ন যোগাযোগব্যবস্থায় হয়নি। ব্যবসায়ীরা তাদের মালামাল আনা-নেওয়া করেন মান্ধাতা আমলের ট্রলারে। বর্ষায় প্রতিকূল আবহাওয়ায় ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটেছে অসংখ্যবার। অবশেষে নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থার সেই স্বপ্ন পূরণ হতে চলছে। ফেরি চলাচলের জন্য নলচিরা ও চেয়ারম্যান ঘাটে ল্যান্ডিং স্টেশন তৈরি করা হচ্ছে।

স্থানীয় মুদি দোকানি ব্যবসায়ী দুলাল ব্যাপারী জানান, প্রতিদিন একবার আসেন ঘাটে। ফেরি চলাচলের জন্য তৈরি করা ঘাটের কাজ দেখার জন্য। নিজের চোখে ফেরি চলাচল দেখতে পাবেন কখনো চিন্তাও করেননি। খুব দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে দুই পাড়ের ল্যান্ডিং স্টেশনের কাজ। শতাধিক শ্রমিক ২৪ ঘণ্টা কাজ করছেন। মাঝে-মধ্যে জোয়ার ও ভাটার কারণে কাজ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হলেও অল্প সময়ের মধ্যে রাস্তাসহ অনেক কিছু দৃশ্যমান। ফেরি চলাচলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন দ্বীপের ব্যবসায়ীরা। তাদের মালামালবোঝাই গাড়ি সরাসরি চলে আসবে দ্বীপে। দ্বীপের বাসিন্দারা সুলভ মূল্যে পণ্য কিনতে পারবেন।

তিনি আরও জানান, ব্যবসায়ীরা ট্রলার বোঝাই করে মালামাল আনতে গিয়ে অসংখ্যবার ট্রলারডুবির কবলে পড়েছেন। অনেক সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী পথের ভিখারি হয়েছেন।

পল্লী চিকিৎসক তানভীর উদ্দিন বলেন, এই ঘাটে অসংখ্য মুমূর্ষু রোগীর আর্তনাদ দেখেছি। অনেক গর্ভবতী মাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় নদীর তীরে অপেক্ষা করতে দেখেছি। নদী উত্তাল ও সতর্ক সংকেত দেওয়ার পর নৌ-চলাচল পুরোপুরি বন্ধ থাকে। তখন এপার থেকে ওপারে যাওয়া যায় না। দু-একটি নৌযান চললেও প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে নিজেদের দায়িত্বে চলাচল করতে হয়। কিছুদিন আগে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় দ্বীপের ৫ শতাধিক ছাত্রছাত্রী ঘাটে আটকা পড়েন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে।

তিনি আরও বলেন, ফেরি চালু হলে এ ধরনের সমস্যায় আর পড়তে হবে না। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া হলেও নিরাপদে ফেরি চলাচল করতে পারবে। যাত্রীদের চলাচল স্বাভাবিক থাকবে।

স্থানীয়রা বলছেন, এই রুটে চলাচলকারী যাত্রী, মুমূর্ষু রোগী, পণ্য আনা নেওয়া ও জরুরি প্রয়োজনে জেলা শহরে যাওয়ার ক্ষেত্রে এখন আর ভোগান্তিতে পড়তে হবে না। থাকবে না কোনো ঝুঁকি। আবার দ্বীপের ইলিশ মাছ, বাদাম ও ধানসহ উৎপাদিত পণ্য ট্রাক বোঝাই করে নিয়ে যাওয়া যাবে মোকামে। পাওয়া যাবে সঠিক মূল্য। ফেরি চালু হলে দ্বীপের বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি যেমন দূর হবে তেমনি অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে।

এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ এস এম আশ্রাফুজ্জামান বলেন, দ্রুত ফেরি চলাচলের জন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। আপাতত দুই পাড়ে চারটি রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে। জোয়ার ও ভাটায় ফেরি থেকে গাড়ি ওঠানামা করতে পারবে এসব রাস্তা দিয়ে। এ ছাড়া দুই পাড়ে জেটি, যাত্রী ছাউনি, ফেরিঘাট ব্যাংক প্রটেকশন, ফেরি ঘাট এপ্রোচ রোডসহ আরও কিছু কাজের জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। অনুমোদন পেলে এসব কাজও দ্রুত করা হবে।

হাতিয়া সম্মিলিত সামাজিক সংগঠনের সদস্য মো. জুয়েল বলেন, এই ফেরির জন্য দ্বীপের বাসিন্দাদের আন্দোলন সংগ্রাম করতে হয়েছে অনেক। এই দ্বীপের কৃতী সন্তান এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসুদসহ সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন দফতরে গিয়ে ঘুরেছেন দিনের পর দিন। নৌ-উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন পরিদর্শনে এসেছেন কয়েকবার। এসব কারণে অবশেষে হাতিয়ায় ফেরি চলাচল শুরু হতে যাচ্ছে।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;

জনপ্রিয় সংবাদ

জলিল টেক্সটাইলে তৈরি হবে অত্যাধুনিক অস্ত্র, আজ হস্তান্তর

অবশেষে হাতিয়ায় যুক্ত হচ্ছে ফেরি, দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষ প্রান্তে দ্বীপবাসী

প্রকাশিত হয়েছে: ০৭:০৬:৪০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২৫

এতদিন যা ছিল শুধু স্বপ্ন এখন তা বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে। গাড়িতে আসা-যাওয়া করা যাবে, মালামাল বোঝাই গাড়ি আসতে পারবে সহজেই। স্বাধীনতার পর এবারই প্রথম মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে নিরাপদ ও আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা স্থাপিত হতে যাচ্ছে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার। দ্রুততম সময়ের মধ্যে দ্বীপবাসীর জন্য চালু হবে ফেরি। এরই মধ্যে দুই পাড়ে শুরু হয়ে গেছে বিশাল কর্মযজ্ঞ।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানের খবরে যার পর নাই খুশি হাতিয়া দ্বীপের বাসিন্দারা। অধীর আগ্রহে অপেক্ষার প্রহর গুণছেন তারা। তাদের কথায়, ফেরি চলাচলের সিদ্বান্তে বদলে যাবে দ্বীপের চিত্র। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে নানা ক্ষেত্রে আসবে গতিশীলতা। এই অঞ্চলের অর্থনীতিতেও আসবে ব্যাপক পরিবর্তন।

একটি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়নের এই দ্বীপে সাড়ে ৭ লাখ লোকের বসবাস। মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌপথ। চরম ভোগান্তি তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। দীর্ঘদিন থেকে সিট্রাক ও ট্রলারে নদী পারাপার করতে হয় এখানকার মানুষজনকে। পুরোনো সিট্রাকগুলো প্রায় সময়েই বিকল হয়ে পড়ে থাকে ঘাটে। ঝুঁকি নিয়ে ছোট ট্রলার ও স্পিডবোটে নদী পার হতে হয় যাত্রীদের। মালামাল আনা-নেওয়ায় ভোগান্তির শেষ নেই।

তাই নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা ছিল দ্বীপের বাসিন্দাদের বড় স্বপ্ন। অতীতে সব সরকার শুধু আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ ছিল। উল্লেখ করার মতো কোনো উন্নয়ন যোগাযোগব্যবস্থায় হয়নি। ব্যবসায়ীরা তাদের মালামাল আনা-নেওয়া করেন মান্ধাতা আমলের ট্রলারে। বর্ষায় প্রতিকূল আবহাওয়ায় ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটেছে অসংখ্যবার। অবশেষে নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থার সেই স্বপ্ন পূরণ হতে চলছে। ফেরি চলাচলের জন্য নলচিরা ও চেয়ারম্যান ঘাটে ল্যান্ডিং স্টেশন তৈরি করা হচ্ছে।

স্থানীয় মুদি দোকানি ব্যবসায়ী দুলাল ব্যাপারী জানান, প্রতিদিন একবার আসেন ঘাটে। ফেরি চলাচলের জন্য তৈরি করা ঘাটের কাজ দেখার জন্য। নিজের চোখে ফেরি চলাচল দেখতে পাবেন কখনো চিন্তাও করেননি। খুব দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে দুই পাড়ের ল্যান্ডিং স্টেশনের কাজ। শতাধিক শ্রমিক ২৪ ঘণ্টা কাজ করছেন। মাঝে-মধ্যে জোয়ার ও ভাটার কারণে কাজ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হলেও অল্প সময়ের মধ্যে রাস্তাসহ অনেক কিছু দৃশ্যমান। ফেরি চলাচলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন দ্বীপের ব্যবসায়ীরা। তাদের মালামালবোঝাই গাড়ি সরাসরি চলে আসবে দ্বীপে। দ্বীপের বাসিন্দারা সুলভ মূল্যে পণ্য কিনতে পারবেন।

তিনি আরও জানান, ব্যবসায়ীরা ট্রলার বোঝাই করে মালামাল আনতে গিয়ে অসংখ্যবার ট্রলারডুবির কবলে পড়েছেন। অনেক সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী পথের ভিখারি হয়েছেন।

পল্লী চিকিৎসক তানভীর উদ্দিন বলেন, এই ঘাটে অসংখ্য মুমূর্ষু রোগীর আর্তনাদ দেখেছি। অনেক গর্ভবতী মাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় নদীর তীরে অপেক্ষা করতে দেখেছি। নদী উত্তাল ও সতর্ক সংকেত দেওয়ার পর নৌ-চলাচল পুরোপুরি বন্ধ থাকে। তখন এপার থেকে ওপারে যাওয়া যায় না। দু-একটি নৌযান চললেও প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে নিজেদের দায়িত্বে চলাচল করতে হয়। কিছুদিন আগে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় দ্বীপের ৫ শতাধিক ছাত্রছাত্রী ঘাটে আটকা পড়েন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে।

তিনি আরও বলেন, ফেরি চালু হলে এ ধরনের সমস্যায় আর পড়তে হবে না। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া হলেও নিরাপদে ফেরি চলাচল করতে পারবে। যাত্রীদের চলাচল স্বাভাবিক থাকবে।

স্থানীয়রা বলছেন, এই রুটে চলাচলকারী যাত্রী, মুমূর্ষু রোগী, পণ্য আনা নেওয়া ও জরুরি প্রয়োজনে জেলা শহরে যাওয়ার ক্ষেত্রে এখন আর ভোগান্তিতে পড়তে হবে না। থাকবে না কোনো ঝুঁকি। আবার দ্বীপের ইলিশ মাছ, বাদাম ও ধানসহ উৎপাদিত পণ্য ট্রাক বোঝাই করে নিয়ে যাওয়া যাবে মোকামে। পাওয়া যাবে সঠিক মূল্য। ফেরি চালু হলে দ্বীপের বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি যেমন দূর হবে তেমনি অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে।

এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ এস এম আশ্রাফুজ্জামান বলেন, দ্রুত ফেরি চলাচলের জন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। আপাতত দুই পাড়ে চারটি রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে। জোয়ার ও ভাটায় ফেরি থেকে গাড়ি ওঠানামা করতে পারবে এসব রাস্তা দিয়ে। এ ছাড়া দুই পাড়ে জেটি, যাত্রী ছাউনি, ফেরিঘাট ব্যাংক প্রটেকশন, ফেরি ঘাট এপ্রোচ রোডসহ আরও কিছু কাজের জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। অনুমোদন পেলে এসব কাজও দ্রুত করা হবে।

হাতিয়া সম্মিলিত সামাজিক সংগঠনের সদস্য মো. জুয়েল বলেন, এই ফেরির জন্য দ্বীপের বাসিন্দাদের আন্দোলন সংগ্রাম করতে হয়েছে অনেক। এই দ্বীপের কৃতী সন্তান এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসুদসহ সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন দফতরে গিয়ে ঘুরেছেন দিনের পর দিন। নৌ-উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন পরিদর্শনে এসেছেন কয়েকবার। এসব কারণে অবশেষে হাতিয়ায় ফেরি চলাচল শুরু হতে যাচ্ছে।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;