০১:৪১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গ্রাহকদের ক্ষোভ: ব্যাংকে টাকা থাকলেও নেই নগদ, ৩ কোটি মানুষের সংকটের আশঙ্কা

ব্যাংকে জমা রাখা কষ্টার্জিত অর্থ থাকলেও প্রয়োজনের সময় তা তুলতে পারছেন না লাখো আমানতকারী। শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংকের গ্রাহকেরা এখন চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্তের কারণে লভ্যাংশ বঞ্চিত ও মূলধন সংকটে পড়া ভুক্তভোগী আমানতকারীরা এবার ‘হেয়ার কাট’ নীতি বাতিল এবং পূর্ণ মুনাফাসহ আমানত ফেরতের দাবিতে রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

বুধবার (১৭ জুন) দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী আমানতকারীরা তাদের এই চরম দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন এবং স্বাভাবিক ব্যাংকিং লেনদেন চালুর দাবি জানান।

সংকটের মূল কারণ ও আমানতকারীদের ক্ষোভ

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের গত ২১ জানুয়ারির একটি সিদ্ধান্তের কারণে শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংকে গচ্ছিত আমানতের ওপর বিগত দুই বছরের মুনাফা কর্তন করা হয়েছে। এর পরিবর্তে মাত্র ৪ শতাংশ বিশেষ সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা করায় সাধারণ ও মধ্যবিত্ত আমানতকারীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

লিখিত বক্তব্যে আমানতকারীরা বলেন:

  • ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী, প্রবাসী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য।
  • জমি বিক্রির অর্থ, পেনশনের টাকা, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স কিংবা চিকিৎসার জন্য সঞ্চিত অর্থ নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায় এসব ব্যাংকে রাখা হয়েছিল।
  • দীর্ঘদিন ধরে অর্থ উত্তোলনে সীমাবদ্ধতা থাকায় বহু পরিবার আজ মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।

“সন্তানের লেখাপড়ার খরচ, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসা, নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধ ও খাদ্যসামগ্রী কেনার সামর্থ্যও অনেক পরিবার হারিয়ে ফেলেছে। ঋণের দায়ে জর্জরিত হয়ে অনেকে সামাজিক ও আইনি জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন।”

বক্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশের প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারী পরিবারের প্রায় ৩ কোটি সদস্য ভয়াবহ সংকটে পড়বেন।

আমানতকারীদের ৪ দফা দাবি

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সংবাদ সম্মেলন থেকে চার দফা দাবি তুলে ধরা হয়:

১. ‘হেয়ার কাট’ নীতি বাতিল: বৈষম্যমূলক ‘হেয়ার কাট’ নীতি বাতিল করে গত দুই বছরের চুক্তি অনুযায়ী পূর্ণ মুনাফাসহ আমানতের মূল অর্থ দ্রুত ফেরত দিতে হবে।

২. স্বাভাবিক লেনদেন চালু: দেশের অন্যান্য তফসিলি ব্যাংকের মতো এই পাঁচটি ব্যাংকেও সব ধরনের স্বাভাবিক লেনদেন চালু করতে হবে।

৩. মেয়াদোত্তীর্ণ স্কিমের অর্থ পরিশোধ: মেয়াদোত্তীর্ণ এফডি, ডিপিএস ও এমটিডিআরের অর্থ চুক্তি অনুযায়ী দ্রুত পরিশোধ করতে হবে।

৪. মুনাফার হার পুনর্বহাল: ২০২৬ সালের জন্য ঘোষিত ৯ থেকে ৯.৫ শতাংশ মুনাফার হার প্রত্যাহার করে পূর্বের চুক্তিভিত্তিক হার বহাল রাখতে হবে।

পরবর্তী কর্মসূচি ও আলটিমেটাম

আমানতকারীরা জানান, তারা আইন ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে ইতোমধ্যে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার স্মারকলিপি দিয়েছেন। এমনকি জাতীয় সংসদের সামনে মানববন্ধন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে অবস্থান কর্মসূচিও পালন করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি।

তারা প্রধানমন্ত্রী, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেন, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলে আমানতকারীদের দুর্ভোগ কমার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও পুনরুদ্ধার হবে। তবে দ্রুত সমাধান না হলে ব্যাংকগুলোর শাখা পর্যায়ে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি, ব্যবস্থাপক অবরুদ্ধকরণ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাওয়ের মতো কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবেন বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী সাধারণ আমানতকারীদের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সভাপতি মু. আবুল কালাম আজাদ, সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন, সহ-সভাপতি খালেদ মোশাররফ, এম এ কাদের, শারমিন আক্তার, সহ-সাধারণ সম্পাদক আরিফ হোসেন এবং অর্থ সম্পাদক আলাউদ্দীন আজাদ।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;

ট্যাগ
জনপ্রিয় সংবাদ

জলিল টেক্সটাইলে তৈরি হবে অত্যাধুনিক অস্ত্র, আজ হস্তান্তর

গ্রাহকদের ক্ষোভ: ব্যাংকে টাকা থাকলেও নেই নগদ, ৩ কোটি মানুষের সংকটের আশঙ্কা

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:৩৭:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

ব্যাংকে জমা রাখা কষ্টার্জিত অর্থ থাকলেও প্রয়োজনের সময় তা তুলতে পারছেন না লাখো আমানতকারী। শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংকের গ্রাহকেরা এখন চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্তের কারণে লভ্যাংশ বঞ্চিত ও মূলধন সংকটে পড়া ভুক্তভোগী আমানতকারীরা এবার ‘হেয়ার কাট’ নীতি বাতিল এবং পূর্ণ মুনাফাসহ আমানত ফেরতের দাবিতে রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

বুধবার (১৭ জুন) দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী আমানতকারীরা তাদের এই চরম দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন এবং স্বাভাবিক ব্যাংকিং লেনদেন চালুর দাবি জানান।

সংকটের মূল কারণ ও আমানতকারীদের ক্ষোভ

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের গত ২১ জানুয়ারির একটি সিদ্ধান্তের কারণে শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংকে গচ্ছিত আমানতের ওপর বিগত দুই বছরের মুনাফা কর্তন করা হয়েছে। এর পরিবর্তে মাত্র ৪ শতাংশ বিশেষ সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা করায় সাধারণ ও মধ্যবিত্ত আমানতকারীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

লিখিত বক্তব্যে আমানতকারীরা বলেন:

  • ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী, প্রবাসী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য।
  • জমি বিক্রির অর্থ, পেনশনের টাকা, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স কিংবা চিকিৎসার জন্য সঞ্চিত অর্থ নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায় এসব ব্যাংকে রাখা হয়েছিল।
  • দীর্ঘদিন ধরে অর্থ উত্তোলনে সীমাবদ্ধতা থাকায় বহু পরিবার আজ মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।

“সন্তানের লেখাপড়ার খরচ, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসা, নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধ ও খাদ্যসামগ্রী কেনার সামর্থ্যও অনেক পরিবার হারিয়ে ফেলেছে। ঋণের দায়ে জর্জরিত হয়ে অনেকে সামাজিক ও আইনি জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন।”

বক্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশের প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারী পরিবারের প্রায় ৩ কোটি সদস্য ভয়াবহ সংকটে পড়বেন।

আমানতকারীদের ৪ দফা দাবি

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সংবাদ সম্মেলন থেকে চার দফা দাবি তুলে ধরা হয়:

১. ‘হেয়ার কাট’ নীতি বাতিল: বৈষম্যমূলক ‘হেয়ার কাট’ নীতি বাতিল করে গত দুই বছরের চুক্তি অনুযায়ী পূর্ণ মুনাফাসহ আমানতের মূল অর্থ দ্রুত ফেরত দিতে হবে।

২. স্বাভাবিক লেনদেন চালু: দেশের অন্যান্য তফসিলি ব্যাংকের মতো এই পাঁচটি ব্যাংকেও সব ধরনের স্বাভাবিক লেনদেন চালু করতে হবে।

৩. মেয়াদোত্তীর্ণ স্কিমের অর্থ পরিশোধ: মেয়াদোত্তীর্ণ এফডি, ডিপিএস ও এমটিডিআরের অর্থ চুক্তি অনুযায়ী দ্রুত পরিশোধ করতে হবে।

৪. মুনাফার হার পুনর্বহাল: ২০২৬ সালের জন্য ঘোষিত ৯ থেকে ৯.৫ শতাংশ মুনাফার হার প্রত্যাহার করে পূর্বের চুক্তিভিত্তিক হার বহাল রাখতে হবে।

পরবর্তী কর্মসূচি ও আলটিমেটাম

আমানতকারীরা জানান, তারা আইন ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে ইতোমধ্যে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার স্মারকলিপি দিয়েছেন। এমনকি জাতীয় সংসদের সামনে মানববন্ধন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে অবস্থান কর্মসূচিও পালন করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি।

তারা প্রধানমন্ত্রী, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেন, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলে আমানতকারীদের দুর্ভোগ কমার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও পুনরুদ্ধার হবে। তবে দ্রুত সমাধান না হলে ব্যাংকগুলোর শাখা পর্যায়ে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি, ব্যবস্থাপক অবরুদ্ধকরণ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাওয়ের মতো কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবেন বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী সাধারণ আমানতকারীদের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সভাপতি মু. আবুল কালাম আজাদ, সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন, সহ-সভাপতি খালেদ মোশাররফ, এম এ কাদের, শারমিন আক্তার, সহ-সাধারণ সম্পাদক আরিফ হোসেন এবং অর্থ সম্পাদক আলাউদ্দীন আজাদ।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;