১২:৫৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সীতাকুণ্ডে ধর্ষণে অন্তঃসত্ত্বা কিশোরীর গর্ভপাত, সালিশে ধর্ষক ও ভুক্তভোগীর বাবাকে জরিমানা!

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল ভাটিয়ারি গ্রামে ১৫ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনায় একের পর এক চাঞ্চল্যকর ও গা শিউরে ওঠা তথ্য বেরিয়ে আসছে। ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়া ওই কিশোরীর গর্ভের ৭ মাসের সন্তানকে জোরপূর্বক হাসপাতালে নিয়ে নষ্ট (স্টিলবার্থ বা মৃতজাতক) করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনা ধামাচাপা দিতে স্থানীয় রাজনৈতিক কার্যালয়ে সালিশি বৈঠক ডেকে ধর্ষকের পাশাপাশি উল্টো ভুক্তভোগী কিশোরীর বাবাকেও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

এ ঘটনায় গত ১৮ মে কিশোরীর পিতা মোহাম্মদ আবদুর রশিদ বাদী হয়ে চারজনকে আসামি করে সীতাকুণ্ড মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলার আসামিরা হলেন— মাহাবুবুল আলম, ফয়জুল হক, রিপন এবং চান মিয়া ওরফে চান্দু মিয়া।

মামলার পরদিন (১৯ মে) পুলিশ এজাহারনামীয় ৩ নম্বর আসামি রিপনকে (আবু তাহের সাওদাগরের ছেলে) গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠিয়েছে। তবে তাকে আটকের পর থানা থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য কিছু যুবক চেষ্টা চালিয়েছিল বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

ভুক্তভোগীর মা ফরিদা বেগম জানান, পরিবারটি পাহাড়ে কৃষিকাজ ও চা দোকান চালিয়ে অত্যন্ত অভাব-অনটনের মধ্যে জীবিকা নির্বাহ করে। গত বছরের নভেম্বর মাসে তাদের ১৫ বছর বয়সী কিশোরী মেয়েটি সিডিএ আবাসিক এলাকার মাঠে গরু দেখভাল করার সময় স্থানীয় ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ মাহাবুবুল আলম তাকে একটি পরিত্যক্ত ঘরে নিয়ে ধর্ষণ করে। এতে কিশোরীটি ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে।

ঘটনাটি জানাজানি হলে গত ৮ মে ধর্ষক মাহাবুবুল আলমের অনুসারী কিছু যুবক কিশোরীকে জোরপূর্বক চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায় এবং তার গর্ভের সন্তানটি নষ্ট করায়। গর্ভপাতের এই ঘটনার পরই পুরো বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

আইনি প্রক্রিয়াকে তোয়াক্কা না করে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে স্থানীয় যুবদলের কার্যালয়ে একটি সালিশি বৈঠক বসানো হয়। বৈঠকে অদ্ভুত ও অপমানজনক সিদ্ধান্ত নেন তথাকথিত বিচারকরা। তারা ধর্ষক মাহাবুবুল আলমকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করার পাশাপাশি, ওই টাকা দিয়ে কিশোরীর বিয়ে দেওয়ার অজুহাতে ভুক্তভোগীর পিতা আবদুর রশিদকেও সমপরিমাণ (৫০ হাজার টাকা) জরিমানা করেন।

গত ১০ মে ধর্ষকের জরিমানার টাকা পরিশোধের শেষ দিন থাকলেও সে কোনো টাকা দেয়নি। উল্টো সালিশের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে ভুক্তভোগী পরিবারের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের চেষ্টা চালায় ধর্ষকের অনুসারীরা। 

গত ২০ মে (বুধবার) কিশোরীর বাবাকে জিম্মি করে আদালতে নিয়ে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়া হয় এবং মামলা না তুললে পরিবারটিকে এলাকা ছাড়া করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে সালিশে উপস্থিত থাকা যুবদল ভাটিয়ারী ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ড শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং মামলার ২ নম্বর আসামি ফয়জুল হক জানান, সালিশটি দলীয় কার্যালয়ে নয়, বরং রাস্তার ওপর হয়েছিল। উত্তেজিত জনতার হাত থেকে তিনি ভুক্তভোগী পরিবারটির ঘরবাড়ি রক্ষা করেছিলেন দাবি করে নিজের সম্পৃক্ততার বিষয়টি অস্বীকার করেন।

সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, “ধর্ষণের ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে এবং এক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।” সামাজিক সালিশে ধর্ষণের বিচার করার কোনো আইনি সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, “যারা এই তথাকথিত বিচার বা সালিশ করেছে, তদন্ত সাপেক্ষে তাদেরও বিধি মোতাবেক আইনের আওতায় আনা হবে।”

শারীরিক-মানসিক নির্যাতন, গর্ভের সন্তান হারানো এবং ঘরবাড়ি ছাড়ার হুমকিতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবারটি।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;

ট্যাগ
জনপ্রিয় সংবাদ

জলিল টেক্সটাইলে তৈরি হবে অত্যাধুনিক অস্ত্র, আজ হস্তান্তর

সীতাকুণ্ডে ধর্ষণে অন্তঃসত্ত্বা কিশোরীর গর্ভপাত, সালিশে ধর্ষক ও ভুক্তভোগীর বাবাকে জরিমানা!

প্রকাশিত হয়েছে: ০৮:১৪:৩০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল ভাটিয়ারি গ্রামে ১৫ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনায় একের পর এক চাঞ্চল্যকর ও গা শিউরে ওঠা তথ্য বেরিয়ে আসছে। ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়া ওই কিশোরীর গর্ভের ৭ মাসের সন্তানকে জোরপূর্বক হাসপাতালে নিয়ে নষ্ট (স্টিলবার্থ বা মৃতজাতক) করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনা ধামাচাপা দিতে স্থানীয় রাজনৈতিক কার্যালয়ে সালিশি বৈঠক ডেকে ধর্ষকের পাশাপাশি উল্টো ভুক্তভোগী কিশোরীর বাবাকেও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

এ ঘটনায় গত ১৮ মে কিশোরীর পিতা মোহাম্মদ আবদুর রশিদ বাদী হয়ে চারজনকে আসামি করে সীতাকুণ্ড মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলার আসামিরা হলেন— মাহাবুবুল আলম, ফয়জুল হক, রিপন এবং চান মিয়া ওরফে চান্দু মিয়া।

মামলার পরদিন (১৯ মে) পুলিশ এজাহারনামীয় ৩ নম্বর আসামি রিপনকে (আবু তাহের সাওদাগরের ছেলে) গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠিয়েছে। তবে তাকে আটকের পর থানা থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য কিছু যুবক চেষ্টা চালিয়েছিল বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

ভুক্তভোগীর মা ফরিদা বেগম জানান, পরিবারটি পাহাড়ে কৃষিকাজ ও চা দোকান চালিয়ে অত্যন্ত অভাব-অনটনের মধ্যে জীবিকা নির্বাহ করে। গত বছরের নভেম্বর মাসে তাদের ১৫ বছর বয়সী কিশোরী মেয়েটি সিডিএ আবাসিক এলাকার মাঠে গরু দেখভাল করার সময় স্থানীয় ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ মাহাবুবুল আলম তাকে একটি পরিত্যক্ত ঘরে নিয়ে ধর্ষণ করে। এতে কিশোরীটি ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে।

ঘটনাটি জানাজানি হলে গত ৮ মে ধর্ষক মাহাবুবুল আলমের অনুসারী কিছু যুবক কিশোরীকে জোরপূর্বক চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায় এবং তার গর্ভের সন্তানটি নষ্ট করায়। গর্ভপাতের এই ঘটনার পরই পুরো বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

আইনি প্রক্রিয়াকে তোয়াক্কা না করে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে স্থানীয় যুবদলের কার্যালয়ে একটি সালিশি বৈঠক বসানো হয়। বৈঠকে অদ্ভুত ও অপমানজনক সিদ্ধান্ত নেন তথাকথিত বিচারকরা। তারা ধর্ষক মাহাবুবুল আলমকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করার পাশাপাশি, ওই টাকা দিয়ে কিশোরীর বিয়ে দেওয়ার অজুহাতে ভুক্তভোগীর পিতা আবদুর রশিদকেও সমপরিমাণ (৫০ হাজার টাকা) জরিমানা করেন।

গত ১০ মে ধর্ষকের জরিমানার টাকা পরিশোধের শেষ দিন থাকলেও সে কোনো টাকা দেয়নি। উল্টো সালিশের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে ভুক্তভোগী পরিবারের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের চেষ্টা চালায় ধর্ষকের অনুসারীরা। 

গত ২০ মে (বুধবার) কিশোরীর বাবাকে জিম্মি করে আদালতে নিয়ে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়া হয় এবং মামলা না তুললে পরিবারটিকে এলাকা ছাড়া করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে সালিশে উপস্থিত থাকা যুবদল ভাটিয়ারী ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ড শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং মামলার ২ নম্বর আসামি ফয়জুল হক জানান, সালিশটি দলীয় কার্যালয়ে নয়, বরং রাস্তার ওপর হয়েছিল। উত্তেজিত জনতার হাত থেকে তিনি ভুক্তভোগী পরিবারটির ঘরবাড়ি রক্ষা করেছিলেন দাবি করে নিজের সম্পৃক্ততার বিষয়টি অস্বীকার করেন।

সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, “ধর্ষণের ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে এবং এক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।” সামাজিক সালিশে ধর্ষণের বিচার করার কোনো আইনি সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, “যারা এই তথাকথিত বিচার বা সালিশ করেছে, তদন্ত সাপেক্ষে তাদেরও বিধি মোতাবেক আইনের আওতায় আনা হবে।”

শারীরিক-মানসিক নির্যাতন, গর্ভের সন্তান হারানো এবং ঘরবাড়ি ছাড়ার হুমকিতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবারটি।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;