মেজবাহ উদ্দীন খালেদ ।।
একপাশে নীলাভ সমুদ্রের গর্জন, অন্যপাশে সবুজ অরণ্যে ঘেরা পাহাড়ের সারি। আর এই দুইয়ের বুক চিরে চলে গেছে দেশের লাইফলাইন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। কাছেই দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। প্রকৃতির এমন নিখুঁত ও কৌশলগত মেলবন্ধন সীতাকুণ্ডকে গড়ে তুলেছিল এক অপার সম্ভাবনার জনপদ হিসেবে। কিন্তু এই ভৌগোলিক সুবিধাই আজ সীতাকুণ্ডের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাগামহীন শিল্পায়ন, নিয়ম না মানার সংস্কৃতি আর মুনাফার অন্ধ মোহে রূপসী সীতাকুণ্ড আজ পরিণত হয়েছে এক পরিবেশগত মরণফাঁদে।
মাটির নিচে শূন্যতা, ওপরে ধসের আতঙ্ক
দেশের ইস্পাত চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশই জোগান দেয় সীতাকুণ্ডের রি-রোলিং মিলগুলো। কিন্তু এই ইস্পাত তৈরির নেপথ্যে রয়েছে এক আত্মঘাতী সমীকরণ। কারখানাগুলোর অতিমাত্রায় পানি উত্তোলনের ফলে সীতাকুণ্ডের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। আড়াই হাজার ফুট গভীরে গিয়েও এখন টিউবওয়েলে পানি মিলছে না। পরিবেশবিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, মাটির নিচের এই বিশাল শূন্যতা সীতাকুণ্ডকে এক ভয়াবহ ভূমিকম্প ও ভূমিধসের ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। যেকোনো বড় কম্পনে এই জনপদের বিস্তীর্ণ এলাকা ভূগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অথচ যে প্রকৃতির বুক চিরে এই পানি তোলা হচ্ছে, তার উপকারভোগী ছিল সাধারণ মানুষ। আজ দূষণ আর পানির হাহাকার সাধারণের ভাগ্যে জুটলেও, লাভের গুড় যাচ্ছে বড় বড় কনগ্লোমারেটদের পকেটে।
উপকূলজুড়ে মৃত্যুর ছায়া: জাহাজভাঙার মরণকামড়
সীতাকুণ্ডের ৪০ কিলোমিটার উপকূলজুড়ে একসময় রুপালি মাছের মেলা বসত। আজ সেখানে শুধুই বিষাক্ত রাসায়নিকের আস্তরণ। বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক ‘জাহাজভাঙা শিল্প’ (শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড) গিলে খেয়েছে এখানকার সমুদ্রকে। বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে উপকূল থেকে মাছ চিরতরে হারিয়ে গেছে। ফলে বংশানুক্রমে চলে আসা হাজার হাজার জেলে পরিবার আজ জীবিকা হারিয়ে বাধ্য হয়ে দৈনিক মজুরিতে কাজ করছে সেই বিপজ্জনক ইয়ার্ডগুলোতেই, যেখানে প্রতিমুহূর্তে তাড়া করে বেড়ায় মৃত্যু।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, জাহাজভাঙার বিষাক্ত রাসায়নিক এখন আর শুধু উপকূলে সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে সীতাকুণ্ডের ফসলি জমিতেও। ফলে ব্যাহত হচ্ছে কৃষিজ উৎপাদন।
জাহাজভাঙা শিল্পের বিষাক্ত চক্র:
সমুদ্রে বর্জ্য নিষ্কাশন ➔ মৎস্যসম্পদ ধ্বংস ➔ জেলের পেশা পরিবর্তন ➔ কৃষিজমিতে বিষ ছড়ানো
ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে ফার্নিচারের ‘স্লো পয়জন’
জাহাজভাঙা শিল্প থেকে নির্গত এক ডজনেরও বেশি বিষাক্ত পদার্থের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হলো ‘এসবেস্টস’। জাহাজের ইঞ্জিনরুম ও কেবিনে অগ্নিপ্রতিরোধক হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়। জাহাজ কাটার সময় এই এসবেস্টস নিঃশ্বাসের সাথে গিয়ে শ্রমিকদের ফুসফুস ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে। তবে এর চেয়েও ভীতিজনক বিষয় হলো, জাহাজের কেবিন থেকে খুলে আনা এসবেস্টসযুক্ত কাঠ দিয়ে সীতাকুণ্ডে গড়ে উঠেছে বিশাল ফার্নিচার বাজার। কম দামে আকর্ষণীয় হওয়ায় এই বিষাক্ত ফার্নিচার কিনে নিয়ে যাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ মানুষ। ঘরের শোভা বাড়াতে গিয়ে মানুষ অজান্তেই ড্রয়িংরুমে সাজিয়ে রাখছেন ক্যানসার সৃষ্টিকারী মরণব্যাধি!
বিধিনিষেধের তোয়াক্কাহীন কন্টেইনার ডিপো
সীতাকুণ্ডের বুকে একেকটি বেসরকারি কন্টেইনার ডিপো যেন একেকটি টাইমবোমা। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার আশেপাশে গড়ে ওঠা এসব ডিপো যেকোনো সময় বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ‘বিএম ডিপো’র ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণ সীতাকুণ্ডবাসীর সেই ভয়কে চিরস্থায়ী রূপ দিয়েছে। রাসায়নিকের সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় এক একটি দুর্ঘটনা পুরো এলাকার বাতাস ও পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছে।
ঠুঁটো জগন্নাথ পরিবেশ অধিদপ্তর
আইন আছে, প্রয়োগ নেই—বাংলাদেশের পরিবেশ রক্ষায় এই নির্মম সত্যটি সীতাকুণ্ডে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। নিয়মানুযায়ী কারখানাগুলোতে বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা (ETP) সার্বক্ষণিক চালু রাখার কথা থাকলেও উৎপাদন খরচ বাঁচাতে শিল্পমালিকরা তা বন্ধ রাখেন। আর এটি তদারকি করার মতো পর্যাপ্ত জনবল বা কারিগরি সক্ষমতা পরিবেশ অধিদপ্তরের নেই। কোনো কোনো কর্মকর্তা স্বাধীনভাবে কাজ করতে চাইলেও রাজনৈতিক চাপ ও প্রভাবশালী মহলের রোষানলে পড়তে হয়। মন্ত্রী-এমপিদের একটি ফোনেই মওকুফ হয়ে যায় কোটি টাকার পরিবেশগত জরিমানা।
প্রকৃতির শেষ ঢালও যখন হুমকির মুখে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। লবণাক্ততা ও ভাঙনের কারণে সীতাকুণ্ডের শত শত একর প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বন এমনিতেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে নতুন আঘাত হিসেবে সরকার সীতাকুণ্ডের আট হাজার একর ম্যানগ্রোভ বন কেটে ইকোনমিক জোন করার প্রস্তাব করেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে যে বন সীতাকুণ্ডের দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তাকেই উপড়ে ফেলার এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত সীতাকুণ্ডকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত করে তুলবে।
শিল্পবিপ্লব মানুষের জীবনকে আরামদায়ক করেছে ঠিকই, কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে এসে সেই শিল্পায়নই মানুষের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। টেকসই উন্নয়ন মানে পরিবেশ ধ্বংস করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নয়।
সীতাকুণ্ডের এই বিপর্যয় থেকে বাঁচতে হলে এখনই পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে হবে, পরিবেশ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং পরিবেশ অধিদপ্তরকে আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক চাপমুক্ত করে শক্তিশালী করতে হবে। সেই সাথে পরিবেশবান্ধব কারখানাকে দিতে হবে বিশেষ সরকারি প্রণোদনা। মনে রাখতে হবে, মানুষের বেঁচে থাকার পরিবেশই যদি ধ্বংস হয়ে যায়, তবে দিনশেষে সেই ‘উন্নয়ন’ ভোগ করার মতো কোনো মানুষই আর অবশিষ্ট থাকবে না।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;




















