০২:৪৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সীতাকুণ্ডে আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি নেই, পর্যটন ও জনভোগান্তির এক অন্তহীন আক্ষেপ

যেখানে মেঘ ছোঁয় পাহাড়ের চূড়া, আর সাগরের বাতাস এসে কানে কানে কথা বলে— সীতাকুণ্ডের প্রতিটি ভাঁজে মিশে আছে অদ্ভুত এক প্রশান্তি। একদিকে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের সুউচ্চ শিখর, অন্যদিকে গুলিয়াখালী, বাঁশবাড়িয়া বা কুমিরা সমুদ্র সৈকত; প্রকৃতির এই অনন্য দান উপভোগ করতে প্রতিদিন দেশ-বিদেশের হাজারো পর্যটক ছুটে আসেন এখানে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এই পর্যটন কেন্দ্রে বাংলাদেশ রেলওয়ের কোনো ‘আন্তঃনগর’ ট্রেনের যাত্রাবিরতি নেই। এতে করে পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা যেমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি স্থানীয় লাখ লাখ মানুষকে পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, সীতাকুণ্ড সদর স্টেশন থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কুমিরা স্টেশনে ‘মহানগর এক্সপ্রেস’ এবং ‘চট্টলা এক্সপ্রেস’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনের যাত্রাবিরতি দেওয়া হয়েছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল, পার্শ্ববর্তী আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (IIUC) এবং শিল্পাঞ্চলের কথা বিবেচনা করে এই স্টপেজ দেওয়া হয়েছে।

তবে সরেজমিনে নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি ভিন্ন। দীর্ঘ ৫ বছর ধরে এই রুটে যাতায়াতকারী যাত্রীরা জানান, কুমিরা স্টেশনে সারা দিনে হাতেগোনা ১০ জন যাত্রীও পাওয়া যায় না। উপরন্তু, ট্রেনের স্টাফদের যোগসাজশে কুমিরা স্টেশনের জন্য বরাদ্দকৃত টিকিটগুলো অবৈধভাবে কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। প্রশ্ন উঠেছে— যেখানে একটি ‘নরমাল’ স্টেশনে যাত্রী নেই বললেই চলে, সেখানে সীতাকুণ্ডের মতো জনবহুল ও পর্যটন-গুরুত্বপূর্ণ সদরে কেন স্টপেজ দেওয়া হচ্ছে না?

দেশের অন্যান্য অঞ্চল, বিশেষ করে নরসিংদী, ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া, কসবা এবং কুমিল্লার মানুষ সীতাকুণ্ড ভ্রমণের জন্য মূলত ট্রেনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সীতাকুণ্ড স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের স্টপেজ না থাকায় তারা সরাসরি এখানে নামতে পারছেন না। অনেককে বাধ্য হয়ে ৪৪ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম শহরে গিয়ে আবার উল্টো পথে সীতাকুণ্ড ফিরতে হয়। এই বাড়তি সময় এবং খরচের ভয়ে বহু পর্যটক এখন সীতাকুণ্ড আসতে সংকোচ বোধ করছেন। এতে করে স্থানীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

সীতাকুণ্ডের সচেতন মহল মনে করেন, এটি কেবল একটি যাতায়াত সমস্যা নয়, এটি সীতাকুণ্ডবাসীর জন্য একটি বড় বৈষম্য। সম্প্রতি সীতাকুণ্ডের ছাত্র-জনতাকে বিভিন্ন স্থানীয় ও জাতীয় ইস্যুতে রাজপথে সোচ্চার থাকতে দেখা গেলেও, ট্রেনের যাত্রাবিরতির মতো মৌলিক একটি দাবি নিয়ে এখনও কোনো ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে ওঠেনি।

স্থানীয় এক বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, “ছাত্র-জনতা সব সমস্যা নিয়ে কথা বলে, কিন্তু আমাদের প্রাণের এই দাবিটি নিয়ে কেন কেউ রাস্তায় নামছে না? এটি আদায় করতে পারলে সীতাকুণ্ডের চেহারা বদলে যাবে।”

রেলওয়ে সূত্রের দাবি, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের সময়সূচী বজায় রাখতে সব স্টেশনে স্টপেজ দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীতাকুণ্ডের গুরুত্ব বিবেচনায় অন্তত ‘চট্টলা’ বা ‘মহানগর’ এর মতো ট্রেনের ৫ মিনিটের বিরতি শিডিউলে বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না।

সীতাকুণ্ডের সাধারণ মানুষ ও পর্যটন প্রেমীদের এখন একটাই দাবি— রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দ্রুত সীতাকুণ্ড স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের স্টপেজ নিশ্চিত করুক। অন্যথায়, বৃহত্তর স্বার্থে ছাত্র-জনতাকে সাথে নিয়ে কঠোর আন্দোলনের ডাক দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্থানীয়রা।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;

ট্যাগ
জনপ্রিয় সংবাদ

জলিল টেক্সটাইলে তৈরি হবে অত্যাধুনিক অস্ত্র, আজ হস্তান্তর

সীতাকুণ্ডে আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি নেই, পর্যটন ও জনভোগান্তির এক অন্তহীন আক্ষেপ

প্রকাশিত হয়েছে: ০৬:৫৪:১৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬

যেখানে মেঘ ছোঁয় পাহাড়ের চূড়া, আর সাগরের বাতাস এসে কানে কানে কথা বলে— সীতাকুণ্ডের প্রতিটি ভাঁজে মিশে আছে অদ্ভুত এক প্রশান্তি। একদিকে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের সুউচ্চ শিখর, অন্যদিকে গুলিয়াখালী, বাঁশবাড়িয়া বা কুমিরা সমুদ্র সৈকত; প্রকৃতির এই অনন্য দান উপভোগ করতে প্রতিদিন দেশ-বিদেশের হাজারো পর্যটক ছুটে আসেন এখানে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এই পর্যটন কেন্দ্রে বাংলাদেশ রেলওয়ের কোনো ‘আন্তঃনগর’ ট্রেনের যাত্রাবিরতি নেই। এতে করে পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা যেমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি স্থানীয় লাখ লাখ মানুষকে পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, সীতাকুণ্ড সদর স্টেশন থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কুমিরা স্টেশনে ‘মহানগর এক্সপ্রেস’ এবং ‘চট্টলা এক্সপ্রেস’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনের যাত্রাবিরতি দেওয়া হয়েছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল, পার্শ্ববর্তী আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (IIUC) এবং শিল্পাঞ্চলের কথা বিবেচনা করে এই স্টপেজ দেওয়া হয়েছে।

তবে সরেজমিনে নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি ভিন্ন। দীর্ঘ ৫ বছর ধরে এই রুটে যাতায়াতকারী যাত্রীরা জানান, কুমিরা স্টেশনে সারা দিনে হাতেগোনা ১০ জন যাত্রীও পাওয়া যায় না। উপরন্তু, ট্রেনের স্টাফদের যোগসাজশে কুমিরা স্টেশনের জন্য বরাদ্দকৃত টিকিটগুলো অবৈধভাবে কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। প্রশ্ন উঠেছে— যেখানে একটি ‘নরমাল’ স্টেশনে যাত্রী নেই বললেই চলে, সেখানে সীতাকুণ্ডের মতো জনবহুল ও পর্যটন-গুরুত্বপূর্ণ সদরে কেন স্টপেজ দেওয়া হচ্ছে না?

দেশের অন্যান্য অঞ্চল, বিশেষ করে নরসিংদী, ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া, কসবা এবং কুমিল্লার মানুষ সীতাকুণ্ড ভ্রমণের জন্য মূলত ট্রেনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সীতাকুণ্ড স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের স্টপেজ না থাকায় তারা সরাসরি এখানে নামতে পারছেন না। অনেককে বাধ্য হয়ে ৪৪ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম শহরে গিয়ে আবার উল্টো পথে সীতাকুণ্ড ফিরতে হয়। এই বাড়তি সময় এবং খরচের ভয়ে বহু পর্যটক এখন সীতাকুণ্ড আসতে সংকোচ বোধ করছেন। এতে করে স্থানীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

সীতাকুণ্ডের সচেতন মহল মনে করেন, এটি কেবল একটি যাতায়াত সমস্যা নয়, এটি সীতাকুণ্ডবাসীর জন্য একটি বড় বৈষম্য। সম্প্রতি সীতাকুণ্ডের ছাত্র-জনতাকে বিভিন্ন স্থানীয় ও জাতীয় ইস্যুতে রাজপথে সোচ্চার থাকতে দেখা গেলেও, ট্রেনের যাত্রাবিরতির মতো মৌলিক একটি দাবি নিয়ে এখনও কোনো ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে ওঠেনি।

স্থানীয় এক বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, “ছাত্র-জনতা সব সমস্যা নিয়ে কথা বলে, কিন্তু আমাদের প্রাণের এই দাবিটি নিয়ে কেন কেউ রাস্তায় নামছে না? এটি আদায় করতে পারলে সীতাকুণ্ডের চেহারা বদলে যাবে।”

রেলওয়ে সূত্রের দাবি, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের সময়সূচী বজায় রাখতে সব স্টেশনে স্টপেজ দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীতাকুণ্ডের গুরুত্ব বিবেচনায় অন্তত ‘চট্টলা’ বা ‘মহানগর’ এর মতো ট্রেনের ৫ মিনিটের বিরতি শিডিউলে বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না।

সীতাকুণ্ডের সাধারণ মানুষ ও পর্যটন প্রেমীদের এখন একটাই দাবি— রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দ্রুত সীতাকুণ্ড স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের স্টপেজ নিশ্চিত করুক। অন্যথায়, বৃহত্তর স্বার্থে ছাত্র-জনতাকে সাথে নিয়ে কঠোর আন্দোলনের ডাক দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্থানীয়রা।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;