বাঙালি মানেই কি উৎসবপ্রিয় জাতি? নাকি বাঙালির উৎসব এখন কাটগড়ায় দাঁড়িয়ে বিচার করছে—কে হিন্দু, আর কে মুসলমান? দরজায় কড়া নাড়ছে বাংলা নববর্ষ। অথচ যে উৎসব হওয়ার কথা ছিল মিলনমেলা, সেখানে আজ বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে ‘নামকরণ’ আর ‘ধর্মীয় মেরুকরণ’। প্রশ্ন জাগে, একটি শোভাযাত্রার নাম ‘মঙ্গল’ না ‘বৈশাখি’—তাতে কি আসলেই আমাদের জাতিগত বা ধর্মীয় পরিচয়ে কোনো বড় পরিবর্তন আসে? নাকি এটি কেবলই আমাদের ক্রমবর্ধমান পরমতঅসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ?
সংস্কৃতি যখন বিবাদের ইস্যু
পৃথিবীর খুব কম জাতিই আছে যারা নিজেদের গৌরবের ইতিহাস আর ঐতিহ্য নিয়ে এমন দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। বাংলা নববর্ষ কোনো বিশেষ ধর্মের নয়, এটি এই ভূখণ্ডের কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থা আর বাঙালির নাড়ির টান। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমরা আজ সবকিছুতেই ধর্মের রং চড়াতে গিয়ে উৎসবের মূল নির্যাসটুকুই হারিয়ে ফেলছি। যে উৎসবটি হওয়ার কথা ছিল বিভেদ ভুলে কাঁধে কাঁধ মেলানোর, সেখানে আমরা আজ ব্যতিব্যস্ত নামের রাজনীতি নিয়ে।
মনুষ্যত্বের মৃত্যু কি তবে আসন্ন?
আমরা কথায় কথায় ধর্মের দোহাই দিই, কিন্তু ধর্মের মূল শিক্ষা যে ‘শান্তি’ আর ‘পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ’, তা কি আমরা লালন করছি? রাজনৈতিক আদর্শ, লিঙ্গ, বর্ণ কিংবা অর্থনৈতিক অবস্থানের দোহাই দিয়ে আমরা যে মানসিক দেয়াল তুলছি, তাতে সমাজ ক্রমেই এক বিষাক্ত গুহায় পরিণত হচ্ছে। মানুষ হিসেবে আমাদের শ্রেষ্ঠত্বের দাবি কেবলই কি তর্কের খাতিরে? যে হৃদয়ে অন্য মানুষের প্রতি সহমর্মিতা নেই, সেখানে ধর্মের আচারও প্রাণহীন।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা কী রেখে যাচ্ছি?
আজকের বেড়ে ওঠা শিশুটি যখন বড়দের মাঝে এই বিভাজনের চর্চা দেখে, সে কী শেখে? আমরা কি তাকে ঘৃণা করতে শেখাচ্ছি? নাকি শেখাচ্ছি মানুষের আগে তার পরিচয় খুঁজতে? বড় হয়ে সে কি জানবে না যে এই উৎসবটি তার পূর্বপুরুষের, তার মাটির? আমরা যদি আজ পরষ্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে না পারি, তবে আগামীর সমাজ হবে এক রুগ্ণ সমাজ, যেখানে মানুষ থাকবে কিন্তু ‘মনুষ্যত্ব’ থাকবে নিখোঁজ।
সহমর্মিতার নতুন ভোর আসুক
জীবন অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। একে জটিল করে তোলার মাঝে কোনো বীরত্ব নেই। যার যার ধর্মীয় বিশ্বাস কিংবা রাজনৈতিক আদর্শকে হৃদয়ে আগলে রেখেও কি আমরা একজন ভালো মানুষ হিসেবে বাঁচতে পারি না? অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধা রাখাটাই তো প্রকৃত আভিজাত্য।
আসুন, এই বাংলা নববর্ষে আমাদের পুরোনো দিনের জীর্ণতা আর বিভেদকে ধুয়ে ফেলি। নাম যেটাই হোক, মূল উদ্দেশ্য হোক ঐক্যের। ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মনুষ্যত্বের জয়গান গাওয়াই হোক এবারের বৈশাখের অঙ্গীকার।
শুভ নববর্ষ ১৪৩৩!
খালেদ / পোস্টকার্ড ;




















