১২:৫৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

র‍্যাবের জালে সলিমপুরের দুর্ধর্ষ ক্যাডার সাদ্দাম

চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের এক আতঙ্কের নাম ‘গলাকাটা বাচা’। জঙ্গল সলিমপুরের গহীন পাহাড়ে যার নির্দেশে চলত জমি দখল, চাঁদাবাজি আর অস্ত্রের ঝনঝনানি। অবশেষে র‍্যাব-৭-এর এক সাঁড়াশি অভিযানে ধরা পড়েছে এই দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী সাদ্দাম হোসেন প্রকাশ ‘গলাকাটা বাচা’ (৩৭)।

শুক্রবার সীতাকুণ্ডের দক্ষিণ সলিমপুর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, যা ওই এলাকার সাধারণ মানুষের মনে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ভয়ের মেঘ কিছুটা হলেও কাটাতে সাহায্য করেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায় ,সাদ্দাম হোসেন বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন আরেফিন নগর মুক্তিযোদ্ধা কলোনির আব্দুল করিমের ছেলে। অপরাধ জগতে সে ‘গলাকাটা বাচা’ নামে পরিচিতি পায় তার নিষ্ঠুরতা ও বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের কারণে। সে জঙ্গল সলিমপুরের অঘোষিত সম্রাট সাজ্জাদ আলী ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’-এর দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহযোগী এবং তার বাহিনীর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে পরিচিত। বড় সাজ্জাদ যখন আড়ালে থেকে জঙ্গল সলিমপুরের ‘প্লট সাম্রাজ্য’ নিয়ন্ত্রণ করত, তখন মাঠপর্যায়ে সেই আধিপত্য ধরে রাখার দায়িত্ব ছিল বাচার কাঁধে।

বাচার অপরাধের ফিরিস্তি কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়। র‍্যাব ও পুলিশি তথ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচলাইশ, চকবাজার, ডাবলমুরিং, বায়েজিদ বোস্তামী, আকবর শাহ এবং সীতাকুণ্ড মডেল থানায় অন্তত ৭টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব মামলার মধ্যে রয়েছে নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও হত্যাচেষ্টা ,অস্ত্রবাজি ও চাঁদাবাজি, জমি দখল এবং মাদক ও ছিনতাই ।

র‍্যাব-৭-এর অধিনায়ক সহকারী পুলিশ সুপার এ আর এম মোজাফফর হোসেন জানান, সাদ্দাম দীর্ঘদিন ধরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় আত্মগোপন করে ছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানা যায় যে, সে দক্ষিণ সলিমপুর এলাকায় কোনো এক গোপন মিটিং বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্যে অবস্থান করছে। গত শুক্রবার সুপরিকল্পিত অভিযানে তাকে ঘিরে ফেলে র‍্যাব। পালানোর কোনো সুযোগ না পেয়ে অবশেষে ধরা দেয় এই দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী।

সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জঙ্গল সলিমপুরকে অপরাধীদের ‘সেফ হাউস’ হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে সাদ্দাম হোসেনের বড় ভূমিকা ছিল। বড় সাজ্জাদের বাহিনীর হয়ে সে পাহাড়ে অস্ত্রধারী ক্যাডারদের প্রশিক্ষণ ও টহল তদারকি করত। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে জমি বিক্রি এবং পাহাড় কাটার টোকেন বাণিজ্যে তার নির্দেশ ছাড়া কোনো কাজ চলত না। তার গ্রেপ্তারের মাধ্যমে বড় সাজ্জাদের বাহিনীর একটি শক্তিশালী খুঁটি উপড়ে ফেলা হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাদ্দামের গ্রেপ্তারের খবরে দক্ষিণ সলিমপুর ও জঙ্গল সলিমপুর এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বলেন, “বাচা ছিল এই এলাকার অভিশাপ। তার কথা না শুনলে পাহাড়ের গহীনে নিয়ে গিয়ে টর্চার সেলে নির্যাতন করা হতো। আমরা চাই তার যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় এবং সে যেন আর বের হতে না পারে।”

গ্রেপ্তারের পর আইনগত প্রক্রিয়া শেষে সাদ্দাম হোসেনকে চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচলাইশ মডেল থানা পুলিশের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তাকে রিমান্ডে নিয়ে জঙ্গল সলিমপুরের অস্ত্রের মজুদ এবং বড় সাজ্জাদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করার চেষ্টা করা হবে।

জঙ্গল সলিমপুরের ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসীদের মূলোৎপাটন করতে সাদ্দাম হোসেনের মতো রাঘববোয়ালদের গ্রেপ্তার প্রশাসনের একটি বড় সাফল্য। তবে স্থানীয়দের দাবি, বাচা গ্রেপ্তার হলেও বড় সাজ্জাদ এবং তার নেপথ্যের আশ্রয়দাতারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের আইনের আওতায় না আনা পর্যন্ত সলিমপুরের পাহাড় ও জনপদ পুরোপুরি নিরাপদ হবে না।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;

ট্যাগ
জনপ্রিয় সংবাদ

জলিল টেক্সটাইলে তৈরি হবে অত্যাধুনিক অস্ত্র, আজ হস্তান্তর

র‍্যাবের জালে সলিমপুরের দুর্ধর্ষ ক্যাডার সাদ্দাম

প্রকাশিত হয়েছে: ১১:০৪:৪০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৬

চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের এক আতঙ্কের নাম ‘গলাকাটা বাচা’। জঙ্গল সলিমপুরের গহীন পাহাড়ে যার নির্দেশে চলত জমি দখল, চাঁদাবাজি আর অস্ত্রের ঝনঝনানি। অবশেষে র‍্যাব-৭-এর এক সাঁড়াশি অভিযানে ধরা পড়েছে এই দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী সাদ্দাম হোসেন প্রকাশ ‘গলাকাটা বাচা’ (৩৭)।

শুক্রবার সীতাকুণ্ডের দক্ষিণ সলিমপুর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, যা ওই এলাকার সাধারণ মানুষের মনে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ভয়ের মেঘ কিছুটা হলেও কাটাতে সাহায্য করেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায় ,সাদ্দাম হোসেন বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন আরেফিন নগর মুক্তিযোদ্ধা কলোনির আব্দুল করিমের ছেলে। অপরাধ জগতে সে ‘গলাকাটা বাচা’ নামে পরিচিতি পায় তার নিষ্ঠুরতা ও বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের কারণে। সে জঙ্গল সলিমপুরের অঘোষিত সম্রাট সাজ্জাদ আলী ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’-এর দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহযোগী এবং তার বাহিনীর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে পরিচিত। বড় সাজ্জাদ যখন আড়ালে থেকে জঙ্গল সলিমপুরের ‘প্লট সাম্রাজ্য’ নিয়ন্ত্রণ করত, তখন মাঠপর্যায়ে সেই আধিপত্য ধরে রাখার দায়িত্ব ছিল বাচার কাঁধে।

বাচার অপরাধের ফিরিস্তি কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়। র‍্যাব ও পুলিশি তথ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচলাইশ, চকবাজার, ডাবলমুরিং, বায়েজিদ বোস্তামী, আকবর শাহ এবং সীতাকুণ্ড মডেল থানায় অন্তত ৭টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব মামলার মধ্যে রয়েছে নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও হত্যাচেষ্টা ,অস্ত্রবাজি ও চাঁদাবাজি, জমি দখল এবং মাদক ও ছিনতাই ।

র‍্যাব-৭-এর অধিনায়ক সহকারী পুলিশ সুপার এ আর এম মোজাফফর হোসেন জানান, সাদ্দাম দীর্ঘদিন ধরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় আত্মগোপন করে ছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানা যায় যে, সে দক্ষিণ সলিমপুর এলাকায় কোনো এক গোপন মিটিং বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্যে অবস্থান করছে। গত শুক্রবার সুপরিকল্পিত অভিযানে তাকে ঘিরে ফেলে র‍্যাব। পালানোর কোনো সুযোগ না পেয়ে অবশেষে ধরা দেয় এই দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী।

সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জঙ্গল সলিমপুরকে অপরাধীদের ‘সেফ হাউস’ হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে সাদ্দাম হোসেনের বড় ভূমিকা ছিল। বড় সাজ্জাদের বাহিনীর হয়ে সে পাহাড়ে অস্ত্রধারী ক্যাডারদের প্রশিক্ষণ ও টহল তদারকি করত। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে জমি বিক্রি এবং পাহাড় কাটার টোকেন বাণিজ্যে তার নির্দেশ ছাড়া কোনো কাজ চলত না। তার গ্রেপ্তারের মাধ্যমে বড় সাজ্জাদের বাহিনীর একটি শক্তিশালী খুঁটি উপড়ে ফেলা হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাদ্দামের গ্রেপ্তারের খবরে দক্ষিণ সলিমপুর ও জঙ্গল সলিমপুর এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বলেন, “বাচা ছিল এই এলাকার অভিশাপ। তার কথা না শুনলে পাহাড়ের গহীনে নিয়ে গিয়ে টর্চার সেলে নির্যাতন করা হতো। আমরা চাই তার যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় এবং সে যেন আর বের হতে না পারে।”

গ্রেপ্তারের পর আইনগত প্রক্রিয়া শেষে সাদ্দাম হোসেনকে চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচলাইশ মডেল থানা পুলিশের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তাকে রিমান্ডে নিয়ে জঙ্গল সলিমপুরের অস্ত্রের মজুদ এবং বড় সাজ্জাদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করার চেষ্টা করা হবে।

জঙ্গল সলিমপুরের ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসীদের মূলোৎপাটন করতে সাদ্দাম হোসেনের মতো রাঘববোয়ালদের গ্রেপ্তার প্রশাসনের একটি বড় সাফল্য। তবে স্থানীয়দের দাবি, বাচা গ্রেপ্তার হলেও বড় সাজ্জাদ এবং তার নেপথ্যের আশ্রয়দাতারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের আইনের আওতায় না আনা পর্যন্ত সলিমপুরের পাহাড় ও জনপদ পুরোপুরি নিরাপদ হবে না।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;