যে চট্টগ্রাম থেকে উচ্চারিত হয়েছিল স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা, সেই বীর প্রসবিনী চট্টগ্রামে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও নির্মিত হয়নি কোনো স্থায়ী জাতীয় স্মৃতিসৌধ।
দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ দশকেও প্রতিশ্রুত স্মৃতিসৌধ ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কাজ শুরু না হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধা ও সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। বর্তমানে উত্তর কাট্টলীর একটি অস্থায়ী স্মৃতিসৌধেই সীমাবদ্ধ থাকছে ২৬ মার্চের রাষ্ট্রীয় সকল আনুষ্ঠানিকতা।
অস্থায়ী কাঠামোতেই সীমাবদ্ধ শ্রদ্ধা নিবেদন
বুধবার (২৫ মার্চ) দুপুরে উত্তর কাট্টলীর অস্থায়ী স্মৃতিসৌধ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। ধোয়া-মোছা, রঙ করা এবং কৃত্রিম ঘাস দিয়ে সাজানো হচ্ছে স্তম্ভ ও বেদি। অস্থায়ী গেট এবং চলাচলের পথ সংস্কার করা হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, এই জায়গাটি বছরের বাকি সময় অবহেলায় পড়ে থাকে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও যুবদল নেতা শাহেদ আকবর বলেন, “স্মৃতিসৌধের জায়গাটি স্থায়ী বন্দোবস্ত হওয়া জরুরি। যাতায়াতের রাস্তা নাজুক এবং লাইটিংয়ের অভাব রয়েছে। এছাড়া পাশের একটি বন্ধ হওয়া ইটভাটা পুনরায় চালু করার পাঁয়তারা চলছে, যা এই পবিত্র স্থানের পরিবেশ নষ্ট করবে।”
দৃশ্যমান অগ্রগতির অভাব ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আক্ষেপ
২০২৪ সালের ২৩ মার্চ জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এখানে একটি অস্থায়ী স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন করা হয়। তখন আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধের আদলে ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে ৩০ একর জমির ওপর স্থায়ী স্মৃতিসৌধ ও জাদুঘর নির্মিত হবে। কিন্তু দীর্ঘদিনেও প্রকল্পের কোনো দৃশ্যমান কাজ শুরু না হওয়ায় হতাশ মুক্তিযোদ্ধারা।
বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ড. ইদ্রিস আলী আক্ষেপ করে বলেন,
“আমরা স্বাধীনতাকে দলীয়করণ করার চেষ্টা করেছি কিন্তু সঠিকভাবে ধারণ করিনি। তরুণ প্রজন্মের জন্য ইতিহাসের উপাদানগুলো সংরক্ষণ করা হয়নি। চট্টগ্রামের গুরুত্ব অপরিসীম হওয়া সত্ত্বেও এখানে স্থায়ী স্মৃতিসৌধ বা সংগ্রহশালা না থাকাটা ইতিহাসের জন্য মানহানিকর।”
প্রশাসনের বক্তব্য ও কর্মসূচি
স্থায়ী স্মৃতিসৌধের বিষয়ে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত জানান, স্থায়ী স্মৃতিসৌধ ও জাদুঘরের জন্য প্রস্তাবিত জমি বরাদ্দ চেয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে, তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি।
এদিকে, আগামীকাল ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে উত্তর কাট্টলী অস্থায়ী স্মৃতিসৌধে তোপধ্বনি ও পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। এছাড়া সকাল ৮টায় এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে কুচকাওয়াজ এবং বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে জেলা প্রশাসন।
প্রসংগত; ঢাকার সাভারের আদলে চট্টগ্রামে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিলেও তা আর বেশি দূর এগোয়নি। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে এ নিয়ে আলোচনা হলেও নকশা চূড়ান্ত হয়নি। চট্টগ্রাম নগরীতে একটি শহীদ মিনার থাকলেও কোনো স্মৃতিসৌধ নেই।
মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভের ৫৫ বছর পর নগরীর পতেঙ্গা মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশে পাহাড়তলীর উত্তর কাট্টলী মৌজায় ১৫০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৩০ ফুট প্রস্থের অস্থায়ী স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় নির্মিত এই অস্থায়ী স্মৃতিসৌধে এবারও বিজয় দিবসের শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজন করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসন পাহাড়তলীর উত্তর কাট্টলী মৌজায় পরিবেশ বিধ্বংসী চারটি অবৈধ ইটভাটা ধ্বংস করে সরকারি ৪৫ একর জায়গা দখলমুক্ত করে। এর মধ্যে ৩০ একর জমিতে ২০২৩ সালে অস্থায়ী স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান। তখন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে জাতীয় স্মৃতিসৌধের আদলে চট্টগ্রামে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের কথা বলে। এর আগে ২০২২ সালের ২৮ অক্টোবর উত্তর কাট্টলীতে স্মৃতিসৌধ ও জাদুঘর নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল।
স্থানীয়রা জানান, মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামের অবদান অনন্য। চট্টগ্রাম থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধে নৌ-কমান্ডোরা চট্টগ্রাম বন্দরকে অচল করে দেয়। সেটি ছিল যুদ্ধের সময় একটি মাইলফলক। কিন্তু দুঃখের বিষয়, চট্টগ্রামে স্মৃতিসৌধ, স্মৃতিস্তম্ভ ও মুক্তিযুদ্ধের জাদুঘর নেই। মুক্তিযোদ্ধাদের দীর্ঘদিনের দাবির আলোকে এখানে অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করে জেলা প্রশাসন। কিন্তু তারপর বেশ ক’বছর কেটে গেলেও স্থায়ী স্মৃতিসৌধ, স্মৃতিস্তম্ভ ও জাদুঘর নির্মাণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;



















