চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকার ‘ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ’-এ বিষাক্ত গ্যাসে ১০ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার দেড় মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। কিন্তু এত বড় একটি হৃদয়বিদারক ট্রাজেডির পরও নিরপেক্ষ বিচার, আইনানুগ ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসনের বিষয়টি আজ প্রভাবশালী মালিকপক্ষের কারসাজি ও প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতায় ঢাকা পড়তে বসেছে। আদালতের সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুশাসন এবং বিভিন্ন সরকারি সতর্কতা সত্ত্বেও ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের নানা কৌশল ও ক্ষমতার দাপট এখন প্রশ্নবিদ্ধ করছে গোটা বিচার প্রক্রিয়াকে।
গত ১৪ আগস্ট সকালে ছুটির দিনে ইয়ার্ডটিতে ভাঙার জন্য নির্ধারিত ‘এমটি রাসি’ নামের একটি এলএনজি ক্যারিয়ারের ব্যালাস্ট ট্যাংকে কাজ করছিলেন শ্রমিকরা। ট্যাংকে জমে থাকা স্লাজ ও পানি থেকে তৈরি হওয়া মারাত্মক বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড (এইচটুএস) গ্যাস নিঃশ্বাসের সঙ্গে প্রবেশ করায় এই মৃত্যুর মিছিল তৈরি হয়। সরকারি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে যে, অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ওই কনফাইন্ড স্পেসে কাজ করার সময় শ্রমিকদের হাতে কোনো ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী বা গ্যাস মাস্ক ছিল না। এমনকি ঘটনাস্থলে কোনো চিকিৎসক, অ্যাম্বুলেন্স বা জরুরি উদ্ধারকারী দলও উপস্থিত ছিল না। প্রাথমিক অবহেলার সেই ক্ষত শুকানোর আগেই শুরু হয় নানা অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার তৎপরতা।
তদন্তে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে যে, দুর্ঘটনার মাত্র এক মাস আগে ১৫ জুলাই কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা দায়ের করেছিল। এর আগেও একাধিকবার নিরাপত্তা ঘাটতি সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হলেও মালিকপক্ষ তা তোয়াক্কা করেনি। এছাড়া দুর্ঘটনার দিন অর্থাৎ ১৪ আগস্টের ঠিক দুই দিন আগে ১২ আগস্টই ইয়ার্ডটির পরিবেশগত ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। মেয়াদোত্তীর্ণ ছাড়পত্র নিয়েই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এই জাহাজ কাটার কাজ চলছিল, যা পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ঘটনার পর পরিবেশ অধিদপ্তর পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা ও কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিলেও নেপথ্যে ইয়ার্ডটি পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তে আরও প্রকাশ পেয়েছে যে, দুর্ঘটনার দিন ইয়ার্ডে কর্মরত শ্রমিকদের উপস্থিতি এবং বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডে (বিএসবিআরবি) জমা দেওয়া অনুমোদিত জনবল তালিকার মধ্যে বিশাল ফারাক ছিল। নিহতদের অনেকের নামই ছিল না মূল তালিকায়। এছাড়া কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘লিমা’ (LIMA)-তে ভুয়া ও অসত্য তথ্য আপলোড করে কারখানার পরিবেশকে সুশৃঙ্খল দেখানোর একটি ডিজিটাল জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। এই অসঙ্গতিগুলো প্রমাণ করে যে কাগজে-কলমে নিয়মের কথা বলা হলেও বাস্তবে শ্রমিকদের জীবন সুরক্ষার ন্যূনতম তোয়াক্কা করা হতো না।
দুর্ঘটনার পর মালিকপক্ষের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বড় বড় ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে তা নিয়ে চলছে নানা লুকোচুরি ও হয়রানি। আংশিক কিছু অর্থ প্রদানের পর বাকি টাকা বা ন্যায়বিচার চাইতে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের স্বজনদের বিভিন্ন আইনি ও সামাজিক ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চরম নিরাপত্তাহীনতা ও অভাবের তাড়নায় দিশেহারা এসব পরিবার এখন দ্বারে দ্বারে ঘুরেও সঠিক বিচার পাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে, ১০ জন শ্রমিকের এই মৃত্যুকে স্রেফ একটি সাধারণ দুর্ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে। বিভিন্ন মহলের প্রভাবে ও বিশেষ পরিদর্শনের নাটক সাজিয়ে অপরাধ আড়াল করার এই প্রবণতা জনমনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। শ্রমিক সংগঠন ও সচেতন মহলের জোর দাবি, আইনি ফাঁকফোকর ও প্রভাবের জাল ভেদ করে নিরপেক্ষ বিচারিক তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে এবং দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় এই মৃত্যুপুরীখ্যাত ইয়ার্ডগুলো শ্রমিকদের জন্য আরও বড় বিপদের ফাঁদ হয়ে দাঁড়াবে।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;