সবুজ চট্টগ্রাম গড়ার বিশাল লক্ষ্য নিয়ে এক অভূতপূর্ব পরিবেশবাদী উদ্যোগ বাস্তবায়নে মাঠে নামছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) জেলার ১৬টি উপজেলায় একযোগে এক দিনে এক লাখ চারা রোপণের সব রকম প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, গণমাধ্যমকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রায় ১৫ হাজার মানুষ সরাসরি এ বিশাল কর্মযজ্ঞে অংশগ্রহণ করবেন। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সরকারি তহবিলের ওপর কোনো ধরনের অতিরিক্ত চাপ না ফেলে এবং সরকারের কোনো অর্থ ব্যয় না করেই পুরোপুরি সমন্বিত উদ্যোগে এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
উদ্যোগটির বিস্তারিত তুলে ধরতে সোমবার (২৬ অক্টোবর) চট্টগ্রামের ডিসি পার্কে এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দাবি-দাওয়ায় আন্দোলন করি, কিন্তু আগামীকাল আমাদের এই ১৫ হাজার মানুষের যে সমাবেশ ও কাজ হবে, তা হবে মূলত পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন। এটি আমাদের বেঁচে থাকার আন্দোলন এবং আগামী প্রজন্মের নিরাপদ ভবিষ্যতের আন্দোলন।’
ঐতিহাসিক এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইসমাইল জবিউল্লাহ। মঙ্গলবার সকালে নগরীর জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রথম চারাটি রোপণ করে কর্মসূচির শুভসূচনা হবে। পরবর্তীতে দিনব্যাপী ১৬টি উপজেলায় চারা রোপণের কার্যক্রমের পর বিকেলে ডিসি পার্কে উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর হাতে এক লাখতম চারাটি রোপণের মাধ্যমে স্মরণীয় এই কার্যক্রম উদযাপন করা হবে।
গাছ লাগানোর প্রস্তুতি হিসেবে জেলায় ইতিমধ্যেই প্রায় ৮৬ হাজার গর্ত খনন সম্পন্ন করা হয়েছে এবং অবশিষ্ট গর্তগুলো কর্মসূচি শুরু হওয়ার পূর্বেই তৈরি হয়ে যাবে। চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানাসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি দপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এতিমখানাগুলোতে চারা বিতরণের কাজও ইতিমধ্যে পুরোদমে শুরু হয়েছে। চাহিদা ও পরিবেশের ভিন্নতা অনুযায়ী ফলজ, বনজ, ঔষধি ও সৌন্দর্যবর্ধক—যেমন আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, আমড়া, মেহগনি, গর্জন, আমলকী, হরীতকী, জারুল ও বকুলের চারা নির্বাচন করা হয়েছে। এছাড়া জলবায়ু সুরক্ষা ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় সন্দ্বীপসহ উপকূলে নারকেলগাছ রোপণে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
শুধু চারা রোপণ করাই কর্মসূচির উদ্দেশ্য নয়, বরং রোপণকৃত প্রতিটি চারা বাঁচিয়ে রাখাকেই মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে জেলা প্রশাসন। গাছগুলোর টেকসই সুরক্ষা ও সঠিক পরিচর্যার জন্য চারার চারপাশে বেড়া দেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত তদারকির লক্ষ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি, গ্রাম পুলিশ ও শিক্ষকদের এই তদারকি ব্যবস্থায় যুক্ত করা হয়েছে এবং কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করছে বন বিভাগ। কোনো চারা মারা গেলে বা দুর্বল হয়ে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে তা প্রতিস্থাপনের জন্য অতিরিক্ত ১০ থেকে ২০ হাজার চারা আগে থেকেই মজুত রাখা হয়েছে।
সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ও সহযোগিতার ভিত্তিতে এত বিপুল চারা সংগ্রহ সহজ করার জন্য জেলা প্রশাসক বিশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশন, পরিবেশ ও বন বিভাগ, বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং স্থানীয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রতি।
উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখার তাগিদ দিয়ে জেলা প্রশাসক জোর দিয়ে বলেন, মানুষের প্রয়োজনে অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ চলবে, তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন সেই উন্নয়ন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কোনো ধরনের পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি না করে। নতুন গাছ লাগানোর পাশাবাশি প্রাকৃতিক সবুজ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সর্বস্তরের নাগরিকদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই পরিবেশমুখী আন্দোলনে এগিয়ে আসার বিনীত আহ্বান জানান তিনি।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক থাকাকালে ‘গ্রিন অ্যান্ড ক্লিন নারায়ণগঞ্জ’ শীর্ষক কর্মসূচির অধীনে এক দিনে এক লাখ চারা রোপণ করে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। সেই সফল অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতাতেই এবার সমগ্র চট্টগ্রাম জেলাজুড়ে সফলভাবে এই সুবিশাল পরিবেশভিত্তিক আন্দোলন বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;