বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের কোটি মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল। কিন্তু চিকিৎসাসেবার আড়ালে এই সরকারি হাসপাতালটিতে চলছে চরম অব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক দায়িত্বহীনতার করুণ প্রদর্শনী। সম্প্রতি হাসপাতালের ৬ষ্ঠ তলায় গাইনি ওয়ার্ডের লিফটের সামনের নজিরবিহীন অস্বাস্থ্যকর দৃশ্য এবং প্রতিনিয়ত চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনায় মারাত্মক ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে।
স্বাস্থ্যঝুঁকিতে প্রসূতি ও নবজাতক:
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক আলোকচিত্রে দেখা যায়, চমেক হাসপাতালের ৬ষ্ঠ তলায় গাইনি ওয়ার্ডের লিফটের ঠিক সামনে মেঝেজুড়ে জমে রয়েছে নোংরা কালচে পানি। তার ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে মেডিকেল বর্জ্য, ব্যবহৃত পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের পচা প্যাকেট ও ময়লা-আবর্জনা।
হাসপাতালের একটি অতি সংবেদনশীল বিভাগ হওয়ায় গাইনি ওয়ার্ডে নবজাতক ও প্রসূতি মায়েদের রাখা হয়, যাদের একটু অসাবধানতায় মারাত্মক ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এমন একটি স্থানে বর্জ্যের ভাগাড় ও ড্রেন উপচে পড়া পানি থেকে বিকট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। সেবা নিতে আসা একাধিক স্বজন আক্ষেপ করে বলেন, “রোগী এখানে সুস্থ হতে এসে এই পরিবেশের বিষাক্ত জীবাণুতে উল্টো আরও মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে যাওয়ার উপক্রম তৈরি হয়েছে।”
প্রশাসনের উদাসীনতা ও জবাবদিহিতার অভাব:
হাসপাতালের মতো জায়গায় ওয়ার্ডের প্রবেশদ্বারে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি মাসের পর মাস চোখের সামনে থাকলেও হাসপাতাল প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো ভূমিকা নেই। অভিযোগ রয়েছে, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের তদারকি না করা, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণে গাফিলতি এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উদাসীনতার কারণেই হাসপাতালটি স্বাস্থ্যবান্ধব পরিবেশ হারাচ্ছে। স্থানীয়রা ও সচেতন নাগরিকরা প্রশ্ন তুলেছেন—প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের যাতায়াতের এই গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো কি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের চোখে পড়ে না? নাকি দেখার পরও কোনো অজানা কারণে তারা নীরব ভূমিকা পালন করছেন?
ওয়ার্ডে সক্রিয় চোর চক্র, নিরাপত্তার চরম ঘাটতি:
পরিবেশগত দূরবস্থার পাশাপাশি হাসপাতালে দেখা দিয়েছে মারাত্মক নিরাপত্তাহীনতা। গাইনি ওয়ার্ড ও লিফট সংলগ্ন এলাকায় সক্রিয় রয়েছে বেপরোয়া মোবাইল চোর চক্র। শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত রোগীর স্বজনরা একটু অস সতর্ক হয়ে কোথাও বসলে কিংবা নির্দিষ্ট স্থানে মোবাইল চার্জে দিয়ে রোগীর সেবা করতে গেলেই খোয়া যাচ্ছে সঙ্গে থাকা ফোন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। প্রতিদিন বহু মানুষ মোবাইল হারানোর কথা জানালেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিংবা আনসার বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর নজরদারি করা হচ্ছে না।
দ্রুত সমাধানের দাবি:
চমেক হাসপাতালের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং অপরাধ দমনে কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছে ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। সচেতন মহল অবিলম্বে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণের জোর দাবি জানাচ্ছে,
১. গাইনি ওয়ার্ডসহ পুরো হাসপাতালের জমা পানি ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার স্থায়ী সমাধান করা এবং নিয়মিত জীবাণুনাশক প্রয়োগ করে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা।
২. গাফিলতিতে জড়িত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা।
৩. প্রতিটি তলার লিফট, করিডোর ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে আনসার ও সিকিউরিটি গার্ডদের নিরাপত্তা টহল জোরদার করা।
৪. রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ গ্রহণের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণকারী বিশেষ বুথ চালু করা।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা টিকিয়ে রাখতে সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দ্রুত দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন ভুক্তভোগীরা।
খালেদ / পোস্টকার্ড;









