
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি।।
চট্টগ্রামের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত স্টেন্ট (হার্টের রিং) ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে গড়ে ওঠা একটি অবৈধ বাণিজ্য চক্রের অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ভারত থেকে অবৈধ পথে আনা স্টেন্ট, বেলুন ক্যাথেটার, গাইড ওয়্যারসহ বিভিন্ন চিকিৎসা উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন রোগীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।
অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, এই চক্রের সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামের কয়েকটি নামিদামি হাসপাতালের একশ্রেণির চিকিৎসক, নার্স ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহকারীদের যোগসাজশ রয়েছে। রোগীদের প্রয়োজনীয় তথ্য গোপন রেখে নিম্নমানের বা অনিবন্ধিত পণ্য ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে।
অবৈধ পথে সরঞ্জাম আনা ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, ভারত থেকে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অবৈধ পথে আনা হচ্ছে স্টেন্ট, বেলুন ক্যাথেটার, গাইড ক্যাথেটার, গাইড ওয়্যার, ম্যানিফোল্ড, শিথ টাইগার ক্যাথেটারসহ বিভিন্ন হৃদরোগ চিকিৎসা সরঞ্জাম।
অনুসন্ধানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ চট্টগ্রামের কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালেও এই চক্রের প্রভাব থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পার্কভিউ হাসপাতাল, সিএসসিআর, মেট্রোপলিটন হাসপাতাল, এভারকেয়ার, ম্যাক্স হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল সেন্টার, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল এবং অ্যাপোলো ইমপেরিয়ালের নাম উঠে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে মাসুদুর রহমানের নাম আলোচনায় এসেছে। তিনি বোস্টন সাইন্টিফিকের সাব-ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি একাধিক প্রতিষ্ঠান খুলে চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবসা পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি স্টেন্ট ব্যবহারের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী রোগী বা স্বজনদের স্টেন্টের প্যাকেট, ব্র্যান্ড, মান ও অন্যান্য তথ্য দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা গোপন রাখা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
চমেক হাসপাতাল ঘিরে নানা অভিযোগ
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগ নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, হৃদরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম চৌধুরীর ভাতিজা ফায়েজ চৌধুরীর প্রতিষ্ঠান ‘কার্ডিওকিট’-এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হতো।
এছাড়া চমেক হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ইকবাল মাহমুদের বিরুদ্ধেও একটি লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অবৈধভাবে আনা স্টেন্ট ও অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ক্যাথল্যাব নিয়ন্ত্রণ ও নার্স সিন্ডিকেটের অভিযোগ
সরকারি একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে চমেক হাসপাতালের ক্যাথল্যাব ব্যবস্থাপনা নিয়েও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে বলে জানা গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চমেক হাসপাতালে তিনটি ক্যাথল্যাব থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে দুটি বন্ধ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ক্যাথল্যাবের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন কয়েকজন সিনিয়র স্টাফ নার্স।
আরও অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানির পণ্য ব্যবহারের জন্য চাপ দেওয়া হয় এবং প্রতিটি কোম্পানির কাছ থেকে ওটি চার্জ বাবদ ৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়।
রোগীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে শঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের মতে, হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত স্টেন্ট ও অন্যান্য মেডিকেল ডিভাইস নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার মধ্যে রাখতে হয়। অবৈধ পথে আনা হলে এসব পণ্যের মান ও কার্যকারিতা নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাদের মতে, কোল্ড চেইন বা নির্ধারিত সংরক্ষণ ব্যবস্থা ঠিক না থাকলে ডিভাইসের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে, যা রোগীর জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অভিযোগের পর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন
হার্টের রিং ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে ওঠা অভিযোগের পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে স্বাস্থ্য প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, কোনো অসাধু চক্রকে রোগীদের জিম্মি করে অনিয়ম করার সুযোগ দেওয়া হবে না। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে পার্কভিউ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এটিএম রেজাউল করিম জানান, প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করা হয়েছে এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হবে এবং প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এদিকে এভারকেয়ার হাসপাতালের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. আকতার হোসেন বলেন, নিবন্ধনহীন কোনো প্রতিষ্ঠান হৃদরোগ চিকিৎসা উপকরণ বাজারজাত বা সরবরাহ করতে পারবে না।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহা. আলমগীর হোসেন জানান, নিবন্ধন ছাড়া কোনো মেডিকেল ডিভাইস আমদানি বা ব্যবহার করার সুযোগ নেই। অবৈধভাবে আনা চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে হাসপাতালগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে জানান তিনি ।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;