
মেহেরুন শান্তা ।।
জীবন সংগ্রাম, গভীর দেশপ্রেম, নিরলস জ্ঞানচর্চা এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত এক অনন্য ব্যক্তিত্বের নাম প্রকৌশলী এ. জে. এস. এম. খালেদ। সীতাকুণ্ডের অন্তর্গত বাঁশবাড়িয়ার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৫৩ সালের ১ জানুয়ারিতে জন্মগ্রহণ করেন এই গুণী মানুষটি। গ্রামীণ নিভৃত পরিবেশে বেড়ে ওঠা সেই মেধাবী কিশোরটি কঠোর পরিশ্রম ও মেধার জোরে পরবর্তী সময়ে হাজারো মানুষের অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে উঠেছিলেন।
শিক্ষা ও কর্মজীবনে তাঁর অবদান ছিল বহুমুখী। ১৯৬৯ সালে কুমিরার মছজিদ্দা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি পাস করার পর তাঁর সামনে উচ্চশিক্ষার দারুণ সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়। তবে ইতিহাসের এক মহান আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালে বই-খাতা রেখে অস্ত্র হাতে তুলে নেন তিনি। দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখে ভারতের আসামের ‘লোয়ার হাফলং’ ক্যাম্প থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং বীরদর্পে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি আবারও চেনা শিক্ষাজীবনে ফিরে আসেন। ১৯৭২ সালে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন দেশের শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট)। মেধার স্বাক্ষর রেখে পরবর্তীতে সরকারি বৃত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে পাড়ি জমান। প্রবাসের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক নানা চ্যালেঞ্জ জয় করে তিনি প্রকৌশলবিদ্যায় মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন এবং বিদেশের মাটিতে ক্যারিয়ার গড়ার লোভ সামলে দেশের টানে স্বদেশে ফিরে আসেন।
দেশে ফিরে চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমান চুয়েট) শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শুরু হয়। একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে তিনি শিক্ষার্থীদের কেবল পাঠদানই করেননি, বরং সততা, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। পরবর্তীতে তিনি দেশের উদীয়মান তৈরি পোশাক শিল্পে (আরএমজি) যুক্ত হন। ইয়ং ওয়ান গ্রুপের বিভিন্ন নামী প্রতিষ্ঠানসহ টিটাস স্পোর্টসওয়্যার লিমিটেড ও কর্ণফুলি স্পোর্টসওয়্যার লিমিটেডে জেনারেল ম্যানেজার এবং প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা বিভাগের প্রধান হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। পোশাক খাতের বিকাশের ওই প্রাথমিক সময়ে তাঁর হাত ধরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য দক্ষ প্রকৌশলী, মার্চেন্ডাইজার ও শীর্ষ ব্যবস্থাপক।
প্রকৌশলী, শিক্ষক, গবেষক, লেখক ও প্রশিক্ষক—বহুমাত্রিক পরিচয়ে ভাস্বর এই স্বপ্নদ্রষ্টা ২০১২ সালে ইন্তেকাল করেন। তাঁর অবর্তমানে শিক্ষা অঙ্গন, মুক্তিযোদ্ধা সমাজ এবং তৈরি পোশাক শিল্প এক মহান অভিভাবক ও মানবিক নেতাকে হারিয়েছে। নিজের সাফল্যের চেয়ে অন্যের সাফল্যে আনন্দ খুঁজে নেওয়া এবং জ্ঞান বিতরণকে জীবনের শ্রেষ্ঠ ইবাদত মনে করা এই মানুষটি আজ আমাদের মাঝে নেই। তবে তাঁর রেখে যাওয়া বই, প্রশিক্ষণ মডিউল, আদর্শ ও সততার গল্প আজও অগণিত পেশাজীবী ও শিক্ষার্থীর হৃদয়ে পথপ্রদর্শক হিসেবে চিরকাল জীবন্ত থাকবে।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;