
অর্থনৈতিক নানা টানাপোড়েনের মধ্যেও সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জাহাজ ভাঙা (শিপ রিসাইক্লিং) খাতে বড় ধরনের চমক দেখিয়েছে সীতাকুণ্ডের তরুণ উদ্যোক্তা তসলিম উদ্দিনের মালিকানাধীন ‘এনবি স্টিল’। গত কয়েক বছর ধরে এই খাতের শীর্ষস্থান ধরে রাখা বড় বড় শিল্প গ্রুপকে পেছনে ফেলে এবার একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সবচেয়ে বেশি স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানির কৃতিত্ব দেখিয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ দিয়ে দেশের ২২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মোট ৮৩টি পুরোনো জাহাজ দেশে এনেছে। এই স্ক্র্যাপ জাহাজগুলো আমদানিতে দেশের ব্যবসায়ীদের মোট খরচ হয়েছে ৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে তসলিম উদ্দিনের ‘কেআর গ্রুপ’র দুই সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘এনবি স্টিল’ ও ‘কেআর শিপ রি-সাইক্লিং ইয়ার্ড’ যৌথভাবে ১৩টি জাহাজ আমদানি করে। তবে এককভাবে বাজিমাত করেছে ‘এনবি স্টিল’। প্রতিষ্ঠানটি একাই নিয়ে এসেছে ১১টি বড় জাহাজ, যার মোট লাইট ডিসপ্লে ওয়েট (এলডিটি) ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৯০ মেট্রিক টন। ৮০৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকা মূল্যের এই জাহাজগুলো থেকে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ২৬ কোটি ১৭ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেছে।
আমদানির এই প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সেকান্দর হোসেনের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। তাঁর ‘কিং স্টিল’ ও ‘কেআর স্টিল’ যৌথভাবে মোট ১৮টি জাহাজ (১ লাখ ৩৫ হাজার ২৬১ এলডিটি) এনেছে, যার আমদানি মূল্য ছিল ৭১৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এছাড়া ৫টি জাহাজ এনে তৃতীয় স্থানে রয়েছে জিরি সুবেদার গ্রুপ, ৩টি জাহাজ নিয়ে চতুর্থ স্থানে এসএন করপোরেশন এবং ৫টি জাহাজ আমদানি করে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে পিএইচপি শিপ ব্রেকিং। তবে কাস্টমসের তথ্য বিশ্লেষণে সবচেয়ে বড় চমক ছিল—বিগত বছরগুলোতে এই খাতের একচ্ছত্র অধিপতি মোস্তফা হাকিম গ্রুপ এবং কবির গ্রুপের কোনো প্রতিষ্ঠানই এবার আমদানির শীর্ষ তালিকায় জায়গা পায়নি।
ব্যবসায়ীরা জানান, সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট থেকে বারো আউলিয়া উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত এই শিল্পটি দেশের রড ও ইস্পাত তৈরির রি-রোলিং মিলগুলোর কাঁচামালের প্রায় ৮০ শতাংশ জোগান দেয়। একসময় এখানে দেড় শতাধিক ইয়ার্ড চালু থাকলেও আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে 'গ্রিন ইয়ার্ড' করার বিপুল খরচ ও ব্যাংক সুবিধার অভাবে বর্তমানে সচল ইয়ার্ডের সংখ্যা ৩০টিরও নিচে নেমে এসেছে।
পয়েন্ট তালিকায় এক নম্বরে উঠে আসা এনবি স্টিলের স্বত্বাধিকারী তসলিম উদ্দিন তাঁর প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে এই খাতের নানা সংকটের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "শীর্ষে আসার পেছনে অনেক প্রতিকূলতা পার করতে হয়েছে। আমাদের এই সম্ভাবনাময় খাতটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অবহেলিত। একটি জাহাজ আমদানির পর তা কাটার অনুমতির জন্য ঢাকার পরিবেশ অধিদপ্তরে দেড় মাস ফাইল আটকে থাকে। এই দীর্ঘ অপেক্ষায় ব্যাংকের সুদের বোঝা দিন দিন বাড়ে।"
অবকাঠামোগত অবহেলার কথা উল্লেখ করে এই তরুণ শিল্পপতি আরও বলেন, "ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকা খরচ করে নিজেদের ইয়ার্ড আন্তর্জাতিক মানের (গ্রিন) করলেও সরকারি যাতায়াতের রাস্তাগুলো এখনো কাঁচা ও খানাখন্দে ভরা। ফলে বিদেশি ক্রেতা বা রাষ্ট্রদূতরা পরিদর্শনে এলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এমনকি কোনো শ্রমিক দুর্ঘটনার শিকার হলে ভাঙা রাস্তার কারণে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা সরকারের কাছে কোনো নগদ অনুদান চাই না, শুধু কাজের গতি বাড়াতে দ্রুত ছাড়পত্রের মতো নীতিগত সহায়তা (পলিসি সাপোর্ট) চাই।"
প্রসঙ্গতঃ ২০০৯ সালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের উপকূলীয় এলাকায় অত্যন্ত সীমিত পরিসরে ও ছোট আকারে জাহাজ ভাঙা (শিপ ব্রেকিং) ব্যবসা দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন তরুণ উদ্যোক্তা তসলিম উদ্দিন। তৎকালীন সময়ে নানা প্রতিকূলতা আর সীমিত পুঁজি নিয়ে শুরু হওয়া সেই ব্যবসা আজ দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকের ব্যবধানে দেশের অন্যতম একটি বৃহৎ ও অগ্রগামী শিল্প পরিবারে রূপ নিয়েছে, যা এখন 'কেআর গ্রুপ' নামে সমধিক পরিচিত।
ব্যবসায়িক সততা, সঠিক পরিকল্পনা আর কঠোর পরিশ্রমের ওপর ভর করে তসলিম উদ্দিন তাঁর এই গ্রুপটিকে বহুমুখী শিল্পে সম্প্রসারিত করেছেন। ভারী শিল্প থেকে শুরু করে লজিস্টিকস ও সেবা খাতেও গ্রুপটি সফলতার স্বাক্ষর রাখছে। বর্তমানে এই বৃহৎ শিল্প পরিবারের অধীনে একে একে গড়ে উঠেছে এনবি স্টিল, কেআর শিপ রি-সাইক্লিং ইয়ার্ড, কেআর স্টিল স্ট্রাকচার লিমিটেড, কেআর ফ্লেক্সি প্যাক লিমিটেড, কেআর গ্রিন শিপ রি-সাইক্লিং, কেআর লজিস্টিকস লিমিটেড এবং লিফটগার্ড সলিউশনসহ আরও বেশ কিছু নামী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে তাদের শিপ রিসাইক্লিং ও স্টিল খাতটি দেশের সামগ্রিক অবকাঠামোগত উন্নয়নে রড ও ইস্পাত শিল্পের প্রধান কাঁচামাল জোগান দিয়ে অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
একটি ছোট ইয়ার্ড থেকে শুরু হওয়া এই করপোরেট যাত্রার সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান তৈরি করা। বর্তমানে কেআর গ্রুপের এই সবকটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিকের এক বিশাল কর্মীবাহিনী কাজ করছে। সীতাকুণ্ডসহ চট্টগ্রামের হাজারো বেকার যুবকের স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি তাদের পরিবারের জীবিকার প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে তসলিম উদ্দিনের এই শিল্প গ্রুপ। দেশের শিল্পায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং বিপুল মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে কেআর গ্রুপ এখন জাতীয় অর্থনীতিতে এক বড় চালিকাশক্তি হিসেবে অবদান রেখে চলেছে।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;