
নেইমার জুনিয়র মানেই শুধু ফুটবল নয়; বারবার চোটের আঘাতে পড়ে গিয়েও আবার উঠে দাঁড়ানোর গল্প, সমালোচনার মুখে নিজেকে প্রমাণ করার জেদ এবং অসম্ভবকে সম্ভব করে ফের আলোয় ফিরে আসার নাম। প্রায় ৯৮১ দিন পর ব্রাজিলের জার্সিতে মাঠে নেমে আবেগঘন এক প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখলেন দেশের ইতিহাসের এই সর্বোচ্চ গোলদাতা।
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের আগে নেইমারের বাবা (নেইমার সিনিয়র) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরোনো একটি প্রেরণাদায়ী ভিডিও শেয়ার করেছিলেন, যা ছিল ছেলের প্রতি এক নীরব বার্তা। বাবার সেই বার্তার মান রেখেই মায়ামির মাঠে ৩৪ বছর বয়সি এই তারকা বুঝিয়ে দিলেন—তিনি ফুরিয়ে যাননি।
মাঠে সেই পুরোনো ঝলক
বিশ্বকাপের মঞ্চে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের ৭৬তম মিনিটে যখন বদলি খেলোয়াড় হিসেবে ১০ নম্বর জার্সিধারী নেইমার মাঠে নামেন, তখন পুরো স্টেডিয়ামে এক অন্যরকম আবহ তৈরি হয়। গোল করা মাতেউস কুনিয়া মাঠ ছাড়ার আগে শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরেন নেইমারকে।
মাত্র ২০ মিনিটের কিছু বেশি সময় মাঠে খেলেই নিজের উপস্থিতি জানান দেন নেইমার। কয়েকটি নিখুঁত আক্রমণ গড়ে তোলা, কর্নার থেকে সুযোগ তৈরি করা এবং বল পায়ে সেই পুরোনো আত্মবিশ্বাসের ঝলক দেখিয়ে মুগ্ধ করেছেন ফুটবলবিশ্বকে। ম্যাচ শেষে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগভরে লেখেন, "আমাদের আইডলের প্রত্যাবর্তন।"
ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরি নেইমারের এই ফেরায় মুগ্ধ হয়ে বলেন, "নেইমারের মাঠে নামার মুহূর্তেই ম্যাচটা বদলে গেল। বিশ্বসেরা খেলোয়াড়রা এমনই। ম্যাচে নিজের প্রভাব রাখতে তাদের পুরো ৯০ মিনিট মাঠে থাকার প্রয়োজন হয় না।”
চোট ও সমালোচনার কঠিন পর্বত পেরিয়ে
২০১৪ বিশ্বকাপে হুয়ান জুনিগার ভয়ংকর ট্যাকল থেকে শুরু করে ক্যারিয়ারে মোট ছয়বার বড় ধরনের ইনজুরির ধাক্কা সামলাতে হয়েছে তাকে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে গুরুতর চোটে পড়ার পর দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে ছিলেন। অনেকেই ভেবেছিলেন তার ক্যারিয়ার শেষ এবং ৩৪ বছর বয়সে আর ব্রাজিলের জার্সিতে ফেরা সম্ভব নয়। পুরোপুরি ফিট না হওয়া সত্ত্বেও তাকে কেন বিশ্বকাপ দলে নেওয়া হলো—তা নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি।
তবে ব্রাজিলের বর্তমান ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি তার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেছিলেন। আনচেলত্তির ভাষায়, "তার বয়স ৩৪ ছুঁয়েছে, অথচ ফুটবল খেলার প্রতি তার তাড়না ও ভালোবাসা এখনও যেকোনো কিশোরের মতো।"
গ্যালারিতে তারকার মেলা ও আবেগঘন কান্না
মায়ামির এই ম্যাচে গ্যালারিতে একদিকে যেমন উপস্থিত ছিলেন নেইমারের মেয়ে মাভি ও সঙ্গী ব্রুনা বিয়ানকার্দি, অন্যদিকে তেমনি বসেছিলেন ব্রাজিলের একঝাঁক কিংবদন্তি—রোনালদো নাজারিও, রোনালদিনহো, কাফু এবং রবার্তো কার্লোস।
সবার সামনে নিজের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন শেষে রেফারির শেষ বাঁশি বাজার পর আর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি নেইমার। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু যেন বলে দিচ্ছিল, এই ৯৮১ দিনের পথটা মোটেও সহজ ছিল না।
ম্যাচ শেষে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে নেইমার বলেন, "বিশ্বকাপে খেলা আর জাতীয় দলে ফিরে এই জার্সি গায়ে জড়ানোই ছিল আমার একমাত্র লক্ষ্য। ব্রাজিলের জার্সিটা পরতে আমি মনেপ্রাণে ভালোবাসি।"
খালেদ / পোস্টকার্ড ;