
"সন্দ্বীপবাসীর দাবি একটাই, মীরসরাই-সন্দ্বীপ সেতু চাই"— বছরের পর বছর ধরে এই স্লোগানই উচ্চারিত হচ্ছে বঙ্গোপসাগরের বুকে অবস্থিত বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের মানুষের কণ্ঠে।
দ্বীপটির লাখো বাসিন্দা, দেশ-বিদেশে অবস্থানরত অসংখ্য প্রবাসী এবং উন্নয়নকামী নাগরিক সমাজের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে নির্মিত হোক সন্দ্বীপ-মীরসরাই বহুমুখী সেতু।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সেতু বাস্তবায়িত হলে এটি কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প হবে না; বরং দেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতি, শিল্পায়ন, পর্যটন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে।
বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটানোর স্বপ্ন
প্রায় চার লাখ মানুষের বসবাস সন্দ্বীপে। অথচ এখনো দ্বীপটির সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ নির্ভর করে নৌযানের ওপর। বৈরী আবহাওয়া, ঘূর্ণিঝড়, জোয়ার-ভাটা এবং নৌযান সংকটের কারণে প্রতিদিন হাজারো মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি সেতু নির্মিত হলে সন্দ্বীপ সরাসরি মীরসরাই হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হবে। এতে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।
অর্থনীতিতে যুক্ত হবে নতুন শক্তি
কৃষি, মৎস্য ও লবণ উৎপাদনের জন্য সুপরিচিত সন্দ্বীপ। দ্বীপের উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ মাছ, শাক-সবজি, ফলমূল ও অন্যান্য পণ্য পরিবহন জটিলতার কারণে অনেক সময় সঠিক বাজারমূল্য পায় না।সেতু নির্মাণ হলে এসব পণ্য দ্রুত ও কম খরচে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছানো সম্ভব হবে। পরিবহন ব্যয় কমবে, উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
রেমিট্যান্স অর্থনীতির নতুন দিগন্ত
সন্দ্বীপের অসংখ্য মানুষ মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কর্মরত রয়েছেন। তাঁদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে প্রবাসীদের বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পর্যটন এবং শিল্প খাতে নতুন নতুন প্রকল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ
চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে গড়ে উঠেছে দেশের বৃহত্তম শিল্পনগরী— বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর। এই বিশাল অর্থনৈতিক অঞ্চলের খুব কাছেই অবস্থান সন্দ্বীপের। সেতু নির্মিত হলে শিল্পাঞ্চল ও দ্বীপের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। ফলে শিল্পকারখানা, গুদাম, লজিস্টিক সাপোর্ট সেন্টার এবং বন্দরভিত্তিক ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং সন্দ্বীপে শিল্পায়নের নতুন ভিত্তি গড়ে উঠবে।
পর্যটনের অপার সম্ভাবনা
অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, দীর্ঘ উপকূল, নদী-খাল, ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং বৈচিত্র্যময় জীবনধারা নিয়ে সন্দ্বীপ একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন গন্তব্য। কিন্তু সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় পর্যটন খাত এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। সেতু নির্মিত হলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের যাতায়াত সহজ হবে এবং সন্দ্বীপ নতুন পর্যটন অর্থনীতির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় ইতিবাচক পরিবর্তন
উন্নত চিকিৎসা কিংবা উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতিনিয়ত মূল ভূখণ্ডে যাতায়াত করতে হয় সন্দ্বীপবাসীকে। জরুরি রোগী পরিবহনের ক্ষেত্রেও সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
সেতু নির্মাণ হলে চট্টগ্রামের হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হবে। এতে স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা
উপকূলীয় অঞ্চল হওয়ায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি সবসময়ই রয়েছে সন্দ্বীপে। দুর্যোগের সময় উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনায় একটি স্থায়ী সড়ক সংযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সেতুটি বাস্তবায়িত হলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সরকারের সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে এবং ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত গুরুত্ব
বাংলাদেশের সামুদ্রিক অর্থনীতি, উপকূলীয় নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক তৎপরতার ক্ষেত্রেও সেতুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।
এ কারণে অনেকেই প্রকল্পটিকে শুধু আঞ্চলিক উন্নয়ন নয়, বরং জাতীয় কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন একটি অবকাঠামো উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
সন্দ্বীপবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, সরকার দ্রুত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে। তাদের বিশ্বাস, মীরসরাই-সন্দ্বীপ বহুমুখী সেতু বাস্তবায়িত হলে দ্বীপাঞ্চলের উন্নয়নের নতুন অধ্যায় শুরু হবে এবং উপকূলীয় অর্থনীতিতে সৃষ্টি হবে এক নতুন জাগরণ।
স্থানীয়রা মনে করেন, সন্দ্বীপ-মীরসরাই সেতু শুধু একটি সেতু নয়; এটি একটি অঞ্চলের স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও উন্নয়নের প্রতীক। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সন্দ্বীপের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের দূরত্ব কমবে, বাড়বে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। একই সঙ্গে শক্তিশালী হবে দেশের উপকূলীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা।
তাছাড়া সন্দ্বীপের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সংযোগ মানেই একটি নতুন অর্থনৈতিক দিগন্তের সূচনা— এমনটাই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;