
একসময় যে আনোয়ারা ছিল মূলত কৃষি, মৎস্য ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল একটি জনপদ, সেই আনোয়ারাই এখন দেশের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার পথে। কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে গড়ে উঠছে একের পর এক মেগা প্রকল্প। বঙ্গবন্ধু টানেল, কেইপিজেড, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, পিএবি-টোইটং মহাসড়ক এবং বহুল আলোচিত চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড)—সব মিলিয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা।
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অনিশ্চয়তায় আটকে থাকা চায়না ইকোনমিক জোন প্রকল্পের একনেক অনুমোদন সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শুধু আনোয়ারা নয়, পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলে যেতে পারে।
২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে চায়না ইকোনমিক জোন প্রকল্প। তখন এটিকে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতার অন্যতম বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হয়েছিল।
আনোয়ারার বেলচূড়া এলাকায় প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। কর্ণফুলী টানেল সড়কের কালাবিবির দীঘি মোড় থেকে মাত্র কয়েকশ গজ দূরত্বে অবস্থিত প্রকল্প এলাকা দ্রুতই বিনিয়োগকারীদের নজর কাড়ে।
প্রথম পর্যায়ে প্রায় ২০০ একর পাহাড়ি টিলা সমতল করা হয়। নির্মাণ করা হয় চার লেনের সংযোগ সড়ক, প্রশাসনিক ভবন ও সীমানা প্রাচীর। কিন্তু এরপরই থমকে যায় অগ্রযাত্রা।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিপিপি অনুমোদনে বিলম্ব, অর্থায়ন জটিলতা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তহীনতা এবং ডেভেলপার নির্বাচন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রায় এক দশক ধরে কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে প্রকল্পটি।
যে শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে হাজার হাজার কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, তা দীর্ঘদিন ধরে পরিণত হয় একটি অসমাপ্ত উন্নয়ন প্রকল্পে।
স্থানীয়দের ভাষায়, “প্রকল্পের গেট ছিল, রাস্তা ছিল, অফিস ছিল; কিন্তু শিল্প ছিল না।”
গত ১৬ জুন অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটির অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনা অনুমোদন পাওয়ার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ অচলাবস্থার অবসান ঘটেছে।
৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকার এ প্রকল্পে সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি চীনের প্রেফারেন্সিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট (পিবিসি) ঋণ যুক্ত হওয়ায় বাস্তবায়নের সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে।
বেজা সূত্র বলছে, ডেভেলপার চুক্তি স্বাক্ষরের পরই পূর্ণমাত্রায় অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চায়না ইকোনমিক জোনকে শুধু একটি শিল্পাঞ্চল হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
এখানে জেটি, চার লেন সড়ক, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, গ্যাস সংযোগ, বর্জ্য শোধনাগার, ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক এবং পানি সরবরাহ ব্যবস্থাসহ আন্তর্জাতিক মানের শিল্প অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।
ফলে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প-অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেমে পরিণত হবে, যেখানে উৎপাদন, রপ্তানি, পরিবহন এবং লজিস্টিকস সুবিধা একই প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল চালুর আগে কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড় ছিল অনেকটাই বিচ্ছিন্ন।
আজ সেই টানেল দক্ষিণ চট্টগ্রামকে সরাসরি জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, টানেলই মূলত চায়না ইকোনমিক জোনের সম্ভাবনাকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ চট্টগ্রাম বন্দর, নগরীর ব্যবসা কেন্দ্র এবং বিমানবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ এখন অনেক সহজ।
আনোয়ারার কেইপিজেড ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে যে দক্ষিণ চট্টগ্রাম শিল্পায়নের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়।
হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান এবং কোটি কোটি ডলারের রপ্তানি কার্যক্রম এই অঞ্চলের সক্ষমতা তুলে ধরেছে।
সেই অভিজ্ঞতাকে আরও বড় পরিসরে কাজে লাগাতে পারে চায়না ইকোনমিক জোন।
চায়না ইকোনমিক জোনের সম্ভাবনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে একনেক অনুমোদিত পিএবি-টোইটং আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রকল্প।
১ হাজার ১৮৩ কোটি টাকার এই সড়ক বাস্তবায়িত হলে কর্ণফুলী টানেল হয়ে কক্সবাজার, মহেশখালী ও মাতারবাড়ীর সঙ্গে একটি নতুন অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে উঠবে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এই করিডোর ভবিষ্যতে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক রুটে পরিণত হতে পারে।
শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে আবাসন খাতেও শুরু হয়েছে বড় ধরনের পরিবর্তন।
সিডিএ ও সিপিডিএলের উদ্যোগে ‘ওয়ান সিটি, টু টাউন’ ধারণা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা আনোয়ারাকে একটি আধুনিক স্যাটেলাইট সিটিতে রূপান্তরের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আগামী এক দশকে দক্ষিণ চট্টগ্রামে নতুন আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পর্যটন ও সেবাখাতের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুমোদন পাওয়া যত গুরুত্বপূর্ণ, বাস্তবায়ন তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।
অতীতের মতো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অর্থায়ন বিলম্ব বা নীতিগত অনিশ্চয়তা দেখা দিলে প্রকল্পটি আবারও পিছিয়ে যেতে পারে।
তাই সময়মতো অবকাঠামো নির্মাণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শিল্প স্থাপনের বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে।
একসময় চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মূলত নগরকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরে একের পর এক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে সেই চিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে।
চায়না ইকোনমিক জোন, কেইপিজেড, মাতারবাড়ী, কর্ণফুলী টানেল এবং নতুন মহাসড়ক—সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আনোয়ারা আগামী দশকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বিনিয়োগ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
আর তখন হয়তো চট্টগ্রামের শিল্প মানচিত্রে নতুন কেন্দ্র হিসেবে উচ্চারিত হবে একটি নাম—আনোয়ারা।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;