
প্রকৃতি ও শিল্পের এক অপূর্ব অথচ বৈপরীত্যময় মেলবন্ধনের নাম সীতাকুণ্ড। একপাশে আকাশছোঁয়া সবুজ পাহাড়, অন্যপাশে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলরাশি—এমন ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেশের খুব কম জনপদেই দেখা যায়। এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সহজ যোগাযোগ সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে সীতাকুণ্ড পরিণত হয়েছে দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলে। কিন্তু এই বাহ্যিক চোখধাঁধানো উন্নয়নের উল্টো পিঠেই জমাট বাঁধছে এক দীর্ঘশ্বাসের ইতিহাস। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, পরিবেশের চরম বিপর্যয়, নাগরিক সুবিধার অভাব এবং স্থানীয়দের অবহেলা আজ এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের জীবনকে এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সীতাকুণ্ডের এই বহুমুখী সংকট এবং তা থেকে উত্তরণের উপায়গুলো বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে।
পরিবেশ বিপর্যয় এবং সুপেয় পানির তীব্র হাহাকার
সীতাকুণ্ডের বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় এবং আশু উদ্বেগের কারণ হলো সুপেয় পানির তীব্র সংকট। শিল্পকারখানা সমৃদ্ধ এই অঞ্চলে শত শত ভারী ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এই বিশাল শিল্প খাতের দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন ভূ-গর্ভস্থ পানি মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে তোলা হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে, ভূ-গর্ভের পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে। পরিস্থিতি এখন এতটাই ভয়াবহ যে, সাধারণ মানুষের বসতবাড়ির গভীর ও অগভীর নলকূপগুলোতে আর পানি মিলছে না।
এই পানির সংকটের সমান্তরালে চলছে মারাত্মক পরিবেশ দূষণ। মহাসড়কের দুই পাশে গড়ে ওঠা কারখানাগুলোর বিষাক্ত তরল বর্জ্য কোনো ধরনের শোধন ছাড়াই সরাসরি স্থানীয় খাল, নালা এবং জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে। এমনকি সীতাকুণ্ড পৌরসভার ঐতিহ্যবাহী বড় দুটি দীঘিও আজ বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়ে সাধারণের ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যকর ও কঠোর নজরদারির অভাবে অধিকাংশ কারখানায় ইটিপি (Effluent Treatment Plant) চালু রাখা হচ্ছে না, যা স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র এবং মাটির উর্বরতাকে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করছে।
মহাসড়কের যানজট ও অপরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থাপনা
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কারণে সীতাকুণ্ডের মানুষ যোগাযোগের ক্ষেত্রে সুফল পেলেও, উপজেলার ভেতরের ৩৬ কিলোমিটার অংশ এখন যাতায়াতের জন্য এক অসহনীয় ভোগান্তির পথ। অপরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থাপনা, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং এবং ফিটনেসবিহীন ভারী যানবাহনের আধিক্যের কারণে এই অংশে নিত্যদিন দীর্ঘ যানজট লেগে থাকে।
যোগাযোগের এই অব্যবস্থাপনার কারণে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী সাধারণ যাত্রী ও পথচারীরা। মহাসড়কের পাশে পর্যাপ্ত যাত্রীছাউনি নেই, পথচারী পারাপারের জন্য ফুটওভার ব্রিজের তীব্র সংকট রয়েছে এবং দূরপাল্লার যাত্রী ও স্থানীয়দের জন্য ন্যূনতম গণশৌচাগারের ব্যবস্থা নেই। ফলে মহাসড়কটি একদিকে যেমন অর্থনৈতিক লাইফলাইন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জন্য এক চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিল্পের সমাহার, কিন্তু স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের অভাব
সীতাকুণ্ডকে দেশের অন্যতম ব্যবসায়িক প্রাণকেন্দ্র বলা হলেও, এখানকার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়নে তা পুরোপুরি ভূমিকা রাখতে পারছে না। সীতাকুণ্ডের শত শত শিল্পকারখানায় বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হলেও স্থানীয় বেকার যুবকেরা সেখানে চাকরি পাচ্ছে না। মেধার সঠিক মূল্যায়ন এবং স্থানীয়দের অগ্রাধিকার না দেওয়ার কারণে এই অঞ্চলের বিপুল তরুণ সমাজ কর্মহীন ও হতাশায় ভুগছে।
এর পেছনে একটি বড় কারণ হলো কারিগরি শিক্ষার অভাব। সাধারণ স্কুল-কলেজ থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা সরাসরি কারখানার আধুনিক ও প্রযুক্তিগত কাজের উপযোগী হয়ে উঠতে পারছে না। অথচ সীতাকুণ্ডে চাহিদা অনুযায়ী কোনো মানসম্মত কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি, যা স্থানীয় যুবকদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে পারতো।
পর্যটন ও কৃষির বিপুল সম্ভাবনা বনাম চরম অবহেলা
সীতাকুণ্ডের উর্বর ভূমি এবং বিশেষ জলবায়ুর কারণে এখানে প্রচুর পরিমাণে উন্নতমানের কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়, যা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় শহরেও সরবরাহ করা হয়। কিন্তু এই বিপুল সম্ভাবনাময় কৃষি খাত আজ সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে ধুঁকছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ কৃষকেরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলিয়েও ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এর সাথে যোগ হয়েছে আধুনিক হিমাগার (Cold Storage) এবং সুনির্দিষ্ট পণ্য বাজারজাতকরণ সুবিধার অভাব, যার ফলে প্রতি বছর টন টন কৃষিপণ্য পচে নষ্ট হয়ে যায়।
একইভাবে অবহেলিত সীতাকুণ্ডের পর্যটন শিল্প। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের মতো ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় পর্যটন কেন্দ্র এবং গুলিয়াখালী সৈকতের মতো অনন্য সুন্দর সবুজ ঘাসের গালিচাবৃত উপকূলীয় অঞ্চল এ উপজেলাতেই অবস্থিত। প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক এখানে আসলেও তাদের জন্য কোনো নিরাপদ ও উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। সরকারি বা বেসরকারি কোনো বড় উদ্যোগ না থাকায় এই বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় খাতটি এখনও অবিকশিত রয়ে গেছে।
স্বাস্থ্য খাতের ভঙ্গুর দশা ও সামাজিক অবক্ষয়
সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং বিভিন্ন ইউনিয়নের উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মীর তীব্র শূন্য পদের কারণে সাধারণ মানুষ ন্যূনতম চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
অন্যদিকে, সামাজিক ক্ষেত্রেও এক ধরনের নীরব অবক্ষয় চলছে। এলাকায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনের সঠিক সমন্বয়ের অভাবে মাদক ব্যবসা ডালপালা মেলছে। তরুণদের সুস্থ বিনোদন ও খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত মাঠের অভাব এবং স্থানীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলোর স্থবিরতার কারণে যুবসমাজ মাদকের অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের ওপর চেপে বসা নীরব চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসবাদ, যা পুরো অঞ্চলের শান্তি ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশকে বিঘ্নিত করছে।
সংকট উত্তরণে সমন্বিত মহাপরিকল্পনা ও করণীয়
সীতাকুণ্ডের এই বহুমুখী সমস্যা কিন্তু স্থায়ী কোনো নিয়তি নয়। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং সমন্বিত টেকসই উদ্যোগের মাধ্যমে একে একটি আদর্শ ও স্বনির্ভর মডেল উপজেলায় রূপান্তর করা সম্ভব। এর জন্য নিচের পদক্ষেপগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন:
টেকসই পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা:
ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে অবিলম্বে চট্টগ্রাম ওয়াসার পানির পাইপলাইন সীতাকুণ্ড পর্যন্ত সম্প্রসারণ করতে হবে এবং শিল্পকারখানায় ভূপৃষ্ঠের পানি বা সমুদ্রের পানি শোধন করে ব্যবহারের নিয়ম করতে হবে। এছাড়া, পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের যৌথ কঠোর নজরদারির মাধ্যমে প্রতিটি কারখানায় শতভাগ ইটিপি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। দূষিত জলাশয় ও দীঘিগুলো সরকারি উদ্যোগে খনন ও পুনরুদ্ধার করতে হবে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন:
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানজট স্থায়ীভাবে দূর করতে চট্টগ্রাম শহর থেকে ফৌজদারহাট এবং ফেনী থেকে মিরসরাই পর্যন্ত নির্মিত মেরিন ড্রাইভের মধ্যবর্তী ২৩ কিলোমিটার অংশের কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে। একই সাথে, বেড়িবাঁধ সড়ক সংস্কার এবং নগরীর সিটি গেট থেকে সীতাকুণ্ড দারোগাহাট পর্যন্ত একটি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। মহাসড়কের পাশে পর্যাপ্ত যাত্রীছাউনি, ফুটওভার ব্রিজ ও আধুনিক গণশৌচাগার স্থাপন করতে হবে।
স্থানীয়দের অধিকার ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার:
স্থানীয় শিল্পকারখানাগুলোতে মেধার ভিত্তিতে অন্তত ৫০% কর্মসংস্থান স্থানীয় যুবকদের জন্য আইনিভাবে নিশ্চিত করতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে সীতাকুণ্ডে একাধিক আধুনিক কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (Polytechnic and Vocational Institutes) গড়ে তুলতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা সরাসরি কারখানার চাহিদা অনুযায়ী বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ পেয়ে দক্ষ হয়ে উঠতে পারে।
কৃষি ও পর্যটনের আধুনিকায়ন:
বাজার থেকে মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে কৃষকের সরাসরি বিক্রয় কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। সীতাকুণ্ডে সরকারি উদ্যোগে আধুনিক হিমাগার স্থাপন করতে হবে যাতে কৃষকেরা তাদের পণ্য দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করতে পারেন। চন্দ্রনাথ পাহাড় ও গুলিয়াখালী সৈকতকে ঘিরে ইকো-ট্যুরিজম ও ধর্মীয় পর্যটনের টেকসই পরিকাঠামো, নিরাপদ যাতায়াত পথ এবং পর্যটক নিরাপত্তা জোন গড়ে তুলতে হবে।
স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ:
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ সবকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের শূন্য পদে দ্রুত চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ দিয়ে চিকিৎসাসেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হবে। সন্ত্রাস, মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রশাসনকে 'জিরো টলারেন্স' নীতি গ্রহণ করতে হবে। তরুণদের সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে উপজেলার ক্রীড়া সংস্থাকে ঢেলে সাজানো, নতুন স্পোর্টস একাডেমি তৈরি এবং প্রতিটি স্কুল-কলেজে নিয়মিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
সীতাকুণ্ডের অন্যতম প্রধান শিল্প ‘শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রি’ যেভাবে গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে ‘গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং’-এর দিকে ধাবিত হচ্ছে, তা প্রমাণ করে যে সীতাকুণ্ডে ইতিবাচক পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। আগামী এক দশকে বিশ্ববাজারে ১৫ হাজার জাহাজ স্ক্র্যাপ হওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, যা বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল অর্থনৈতিক সুযোগ। এই ইতিবাচক ধারাকে পুরো সীতাকুণ্ডের সব খাতে ছড়িয়ে দিতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর ও সমন্বিত ভূমিকার মাধ্যমেই কেবল পরিবেশকে অক্ষুণ্ণ রেখে সীতাকুণ্ডকে একটি সত্যিকারের সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর জনপদে রূপান্তর করা সম্ভব।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;